এতদিনে বুঝি তার পূর্বস্মৃতিগুলি একে একে ফিরে এল, মনে পড়ল সেই অন্যায়ের ইতিহাস, যা তার বিবাহের সময়েই কলঙ্কিত হয়ে গেছে। কোনও সন্দেহই নেই যে, ধর্ম, বংশমর্যাদা এবং রাজধর্মের কথা বলেই সত্যবতী একান্তভাবে দায়মুক্ত হতে পারেন না। এর সঙ্গে অবশ্যই যুক্ত আছে সেই রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চেতনা যাতে সত্যবতীর মতো প্রাজ্ঞা রমণী বিচলিত হয়ে পড়েন। শুধুমাত্র একটি পুত্র-সন্তানের অভাবে আজ হস্তিনাপুরের রাজ-ঐশ্বর্য ভোগ করার মতো কেউ রইল না–এই মানসিক পীড়নের কারণের সঙ্গে যে সত্যবতীর স্বার্থই সবচেয়ে বেশি জড়িত ছিল, সে কথা সত্যবতীর মতো বুদ্ধিমতী রমণী অনুভব করতে পারছেন না, তা হতেই পারে না। বংশবিলুপ্তির জন্য ভাগ্যের পরিহাসের চেয়েও তিনি যে বেশি দায়ী, সে কথা সত্যবতী বোঝেন বলেই এতদিনে তারও যেন বোধধাদয় হল।
সত্যবতী জানেন–শান্তনুর সঙ্গে বিয়ে হবার সময় তাঁর পিতা যেশর্তে তাকে বিবাহ দিয়েছিলেন, তার মধ্যেই হস্তিনাপুরের প্রথম সুযোগ্য বংশধরের প্রতি এক গভীর বঞ্চনা ছিল। সে সময় পালক পিতা কৈবর্তরাজের ব্যক্তিত্বে তার পক্ষে কোনও কথাও বলা সম্ভব ছিল না। ভীষ্ম বিবাহ করবেন না, ভীষ্ম রাজা হবেন না-এই সমস্ত প্রতিজ্ঞাত সত্য হস্তিনাপুরের একদা যুবরাজকে একভাবে বঞ্চিত করেছিল নিশ্চয়ই। কিন্তু এই বঞ্চনার কথা সত্যবতী মনে মনে অনুভব করতেন বলেই তিনি তার এই সমবয়সী অথবা বেশি-বয়সী পুত্রটিকে অসীম মমতায় যথাসাধ্য গুরুত্ব দিয়ে চলতেন।
সত্যবতীর দুই পুত্র মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভীষ্মের প্রতিজ্ঞাগুলি কী বিপরীত পরিহাস নিয়েই না ফিরে এল সত্যবতীর কাছে। সত্যবতীর যে পুত্রদের হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসানোর জন্য ভীষ্মকে আগে থেকেই প্রতিজ্ঞা করে রাজ্য-শাসনের প্রত্যক্ষ পরিধি থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল, আজকে ভাগ্যের পরিহাসে সত্যবতীকে তারই সামনে এসে দাঁড়াতে হচ্ছে।
বিচিত্রবীর্যের শ্রাদ্ধক্রিয়া শেষ হয়ে গেলে পুত্রবধূ অম্বিকা অম্বালিকাকে যথাসাধ্য সান্ত্বনা দিয়ে মনস্বিনী সত্যবতী ভীষ্মের কাছে এলেন এবং সামান্য ভণিতা করেই বললেন–ভীষ্ম! তোমার পিতা মহারাজ শান্তনু ধার্মিক এবং যশস্বী–দুইই ছিলেন। কিন্তু আজ যে অবস্থা হল, তাতে তার পিণ্ড, বংশ এবং যশ-সবই তোমার ওপর নির্ভর করছে–ত্বয়ি পিণ্ডশ্চ কীর্তিশ্চ সন্তান প্রতিষ্ঠিতঃ। সত্যবতী ভীষ্মকে যথেষ্ট মর্যাদা দিয়ে তার ধর্মজ্ঞান, কৌলিক আচারের বোধ, এবং বিপৎকালে তার রাজনৈতিক চেতনার প্রতিপত্তিশ্চ কৃচ্ছ্রেষু শুক্রাঙ্গিরসয়োরিব– ভূয়সী প্রশংসা করলেন।
প্রশংসায় মানুষ খানিকটা দ্রবীভূত হয় এবং এই দ্রবীভবনের মধ্যে সত্যবতী নিজের ব্যক্তিত্ব আরোপ করলে কাজ হবে, এই কথা ভেবেই সত্যবতী বললেন–ভীষ্ম! আমি তোমার ওপর ভরসা করে–তস্মাৎ সুভূশমাখস্য ত্বয়ি–একটা কাজ করতে বলেছি তোমাকে। তুমি মন দিয়ে শোনো। সত্যবতী বললেন–আমার পুত্র ছিল তোমার ভাই। তাকে তুমি যথেষ্ট ভালওবাসতে। তা সে তো অল্প বয়সেই মারা গেল। একটা ছেলেপিলেও রইল না যে বংশে বাতি দেবে–বাল এব গতঃ স্বর্গ অপুত্রঃ পুরুষভঃ। আমি বলি কী–আমার ছেলের বউ দুটি তো রয়েছে ইমে মহিষ্যৌ ভ্রাতুস্তে কাশীরাজসুতে শুভে।
সত্যবতী নিজের বক্তব্যে আসার সঙ্গে সঙ্গে তার পুত্রবধূদের রমণীয়তা এবং তাদের উপাদেয়তাও বর্ণনা করেছেন। ভীষ্ম নিজে পছন্দ করে কাশীরাজের মেয়ে দুটিকে ভাইয়ের। বিয়ের জন্য হরণ করে নিয়ে এসেছিলেন বলেই সত্যবতীর কথা বলবার যুক্তি হল-ওরা তো দেখতে শুনতে খারাপ নয়। যথেষ্ট রূপবতী এবং যৌবনবতী। তাছাড়া বেচারাদের দুঃখ দেখ-স্বামীটি মারা গেল, যাক। বেচারারা কোল-আলো করা ছেলে পেল না একটিও রূপযৌবনসম্পন্নে পুত্ৰকামে চ ভার
সম্বোধনটা দেখুন কেমন তেল-মাখানো-ভারত। অর্থাৎ ভরতবংশের মর্যাদা সম্বন্ধে যিনি সদা-সচেতন। পুত্রসম্বন্ধী ভীষ্মের সামনে আপন পুত্রবধূদের রূপযৌবনের থেকেও পুত্রকামনাটাই বড় করে দেখিয়ে সত্যবতী বললেন–তা আমি বলি এই মহান কুলের স্বার্থেই তুমি আমার পুত্রবধূদের গর্ভে পুত্র উৎপাদন করো। সত্যবতী মাতৃসুলভ আদেশ দিয়ে বললেন–মনে কোরো না এতে কোনও অধর্ম হবে। তুমি আমার আদেশে–মন্নিয়োগাৎ মহাবাহো-এই পুত্রবধুদের গর্ভে পুত্র উৎপাদন করে। এটাই এখন ধর্ম–ধর্মংকর্তুমিহাহসি।
এমন যুক্তি ভীষ্মের মনে আসতেই পারে যে, পুত্ৰই যদি চাইব, তবে তো নিজেই বিয়ে-থা করতে পারি। অনুজের রতোচ্ছিষ্ট ভ্রাতৃবধুদের সঙ্গে আমার কিসের প্রয়োজন? হ্যাঁ, এই যুক্তি আসতেই পারে এমনটি ভেবে মনস্বিনী সত্যবতী ভীষ্মকে বিকল্প-ব্যবস্থাও অনুমোদন করে বলছেন–আর না হয় তুমি বিধিসম্মতভাবে নিজেই একটা বিয়ে করো পুত্র!–দারাংশ্চ কুরু ধর্মেণ। আর পিতৃরাজ্যও তোমাকেই গ্রহণ করতে হবে। ভরত বংশের প্রজাদের তো আর ফেলে দেওয়া যাবে না-রাজ্যে চৈবাভিষিচ্যস্ব ভারতা অনুশাধি চ। তুমি তোমার পুত্রবধুদের গর্ভেও পুত্র উৎপাদন করতে পার, আবার নিজেও বিয়ে করতে পার। কিন্তু যা হোক একটা কিছু করতে হবে। এইভাবে বংশলুপ্তির প্রসঙ্গ যেখানে এসে পড়েছে, সেখানে তুমি নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পার না। তুমি তোমার বাপ-ঠাকুরদার পিণ্ডলোপ করে তাদের নরকে ডোবাতে পার না কিছুতেই–মা নিমজ্জীঃ পিতামহান্।
