নারদ এইসব কটু-তিক্ত কাহিনী শুনিয়ে চলে যেতেই কংস বসুদেবের কাছ থেকে তার প্রথমজন্মা পুত্রটিকে চেয়ে নিলেন নির্মম শত্রুতায়। পাষাণে আঘাত করে মেরে ফেললেন। বসুদেবের পুত্রটিকে। বিষ্ণু-পুরাণে এবং হরিবংশে অবশ্য নারদ বসুদেবের কোনও পুত্র হওয়ার আগেই কংসকে বসুদেবের পুত্রগুলি থেকে সাবধানে থাকতে বলেছেন। ওই পুত্রদের ভগবত্তা খ্যাপনও বাদ যায়নি। নারদের কাছ থেকে বসুদেবের পুত্রদের অলৌকিক শক্তি সম্বন্ধে অবহিত হওয়ার পরেই নাকি দেবকী-বসুদেবকে লোহার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হয় এবং ভাগবতের পৌরাণিক এইরকমই বর্ণনা দিতে পছন্দ করেছেন– দেবকীং বসুদেবঞ্চ নিগৃহ্য নিগড়ৈর্গহে। বিষ্ণুপুরাণে অবশ্য বসুদেবকে একটি গুপ্ত গৃহের মধ্যে অন্তরীণ রাখা হয়েছে এবং বসুদেবের ব্যক্তিত্বের নিরিখে আমরাও বসুদেবের এই নজরবন্দী অবস্থাটুকুই বিশ্বাস করতে ভালবাসি। তার কারণ পরে বলব–দেবকীং বসুদেবঞ্চ গৃহে গুপ্তাবধারয়ৎ।
একটি করে দেবকীর পুত্র জন্মায়, আর বসুদেব তাকে দিয়ে আসেন কংসের হাতে। কংস তাকে পাষাণে আছড়ে মারেন, বসুদেব দেখেন, অথবা শব্দ পান, অথবা উপলব্ধি করেন এই নৃশংস হত্যা। সামগ্রিকভাবেই কংসের অত্যাচার আরও বেড়ে গেল, কারণ তার নির্ধারিত সময় ঘনিয়ে আসছে। দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তান তাকে হত্যা করবে–এই দৈববাণী মিথ্যে করে দেবার জন্য বদ্ধপরিকর হলেন কংস।
দেবকীর সপ্তম গর্ভের সন্তানটির সম্বন্ধে সমস্ত পুরাণেই প্রচুর অলৌকিকতা আছে। সপ্তম গর্ভের সম্ভাবনা-মাত্রই পরম ঈশ্বর বিষ্ণু যোগমায়া দেবীকে আদেশ করেন–দেবকীর সপ্তম গর্ভটি আকর্ষণ করে বসুদেবের জ্যেষ্ঠা পত্নী পুরু-ভরত বংশের মেয়ে রোহিণীর গর্ভে স্থাপন করতে–তৎ সন্নিকৃষ্য রোহিণ্যা উদরে সন্নিবেশয়। ভগবান স্বয়ং যোগমায়াকেও নির্দেশ দিলেন বসুদেবের পরম বন্ধু নন্দপত্নী যশোমতীর উদরে প্রবেশ করতে।
যোগমায়া মহাবিষ্ণুর আদেশমতো দেবকীর সপ্তম গর্ভ আকর্ষণ করে পৌরবী রোহিণীর গর্ভে স্থাপন করলেন। কংসের অনুচরেরা, যারা বসুদেব-দেবকীকে পাহারা দিচ্ছিল, তারা দেবকীর পূর্বদৃষ্ট গর্ভলক্ষণ নিশ্চিহ্ন হতে দেখে কংসের কাছে গিয়ে খবর দিল–দেবকীর গর্ভ নষ্ট হয়ে গেছে–অহহা বিংসিততা গর্ভ ইতি পৌরা বিচুকু। গর্ভ আকর্ষণ করে রোহিণীর গর্ভে স্থাপন করা হয়েছিল বলে রোহিণীর পুত্রের অন্য নাম সঙ্কৰ্ষণ। বৃন্দাবনে অবশ্য তার ডাক নাম চালু হল বলদেব, বলভদ্র ইত্যাদি সংজ্ঞায়।
.
৬৪.
হস্তিনাপুরে প্রতিষ্ঠিত পুরু-ভরত-কুরু-বংশের অঙ্কুর রীতিমতো বড় হয়ে ফুল-ফল না ফলিয়েই অকালে ঝড়ে পড়ল। কুমার বিচিত্রবীর্য যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন। এই মৃত্যুতে যিনি সবচেয়ে বেশি সঙ্কটে পড়লেন, তিনি হলেন মহামতি ভীষ্ম। স্বামীর মৃত্যুতে আরও যে দুইজন বিপন্না মহিলার নাম এখানে করতেই হবে, সেই অম্বিকা ও অম্বালিকা ছাড়াও তৃতীয় যে প্রৌঢ়া রমণীটি মনে মনে বিপর্যস্ত হলেন, তিনি মনস্বিনী সত্যবতী। তবে যেহেতু তিনি অন্য কোনও সাধারণ রমণী নন, তিনি যেহেতু সত্যবতী, তার যৌবনস্থিত পুত্রের। অকালমৃত্যুতেও তিনি একটুও ভেঙে পড়লেন না।
আসলে ছোটবেলা থেকে সত্যবতী যে সব ঘটনা-পরম্পরার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন সেই কৈবর্তপল্লীতে মানুষ হওয়া থেকে আরম্ভ করে মহামুনি পরাশরের সঙ্গে তার অনৈসর্গিক মিলন, শান্তনুর সঙ্গে তার বিবাহ, প্রথম পুত্রের মৃত্যু, দ্বিতীয় পুত্রের মৃত্যু–এই সমস্ত সুখ-দুঃখের ঘটনা-পরম্পরা এবং ঘটনার বৈচিত্র্য সত্যবতীর স্নায়ুশক্তি বাড়িয়ে দিয়েছিল। এর ওপরে ছিল মহামতি ভীষ্মের মতো এক বিশাল ব্যক্তিত্বের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন ‘ইনটার্যাকশন’, যা তাকে হস্তিনাপুরের রাজনীতিতে এক লৌহময়ী প্রতিমার মতো দৃঢ়ভাবে স্থাপন করেছে। মহাভারতের বিভিন্ন ঘটনায় অন্তদৃষ্টি দিলে বোঝা যাবে যে, বহিরঙ্গ রাজ্য-শাসনের সমস্ত ব্যাপারে ভীষ্ম তার সর্বাঙ্গীণ প্রয়াস চালালেও হস্তিনাপুরের রাজবাড়ির মধ্যে সত্যবতীই ছিলেন সর্বেসর্বা। বিশেষত রাজবাড়ির সঙ্কটগুলিতে সত্যবতীর ভূমিকা ছিল যে কোনও রাজনীতি-সচেতন প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রনেতার মতোই।
শুধু নিজের ক্ষমতা জাহির করা নয়, হস্তিনাপুরের জনসাধারণের প্রয়োজনে এই রাজবংশের পূর্বাবদান স্মরণ করেই সত্যবতী চিন্তিত হলেন। রাজতন্ত্রের অনুশাসনে যে প্রজাদের দিন চলে, তারা বংশজ শাসনেই বিশ্বাস করেন। বিশেষত যে রাজা প্রজারঞ্জনের ক্ষেত্রে যশের অধিকারী হন, প্রজারা আশা করেন, সেই রাজার বংশধরেরাই তাদের আশাপূরণে সফল হবেন, অন্য কেউ নয়। রাজতন্ত্রীয় শাসনের এই মনস্তত্ত্ব গণতন্ত্রের পরিবর্তনশীল নেতাদের অনুশাসনে থাকা নাগরিক-হৃদয় দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। কিন্তু এই মানসিকতা বা জনগণের আশা বস্তুটি এই বাবদে কী রকম হয়, সেটা গণতন্ত্রে বসেও বুঝতে পারবেন–যদি ভারতবর্ষে নেহেরু-পরিবারের বংশজ শাসনের জনপ্রিয়তা আপনারা সাধারণভাবেও খেয়াল করেন।
রাষ্ট্রপ্রধানের মৃত্যুতে যেমনটি হয়–শোক-তাপ-প্রেতকার্য-শ্রাদ্ধাদি, সবই হল এবং তা হল সত্যবতী এবং ভীষ্মের পারস্পরিক আলোচনার পথ ধরেই। সত্যবতী বড় বংশের মেয়ে বলে পরিচিত ছিলেন না, কিন্তু তার বুদ্ধিটা ছিল যে কোনও বিশাল বংশের কুলজা রমণীর মতো। তার ওপরে যে ঘরে তিনি বউ হয়ে এসেছিলেন, সেই হস্তিনাপুরের রাজবংশের মর্যাদা সম্পর্কে সত্যবতী ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। তার নিজের দুটি পুত্রই এক-এক করে মারা গেল, অথচ তাদের কোনও সন্তান রইল না যে, ভরত-কুরুদের রাজমর্যাদা জনমনে অঞ্জ রাখতে পারে। চিত্রাঙ্গদ অথবা বিচিত্রবীর্য-শান্তনুর এই দুই পুত্রের একটি পুত্রও নেই, অর্থাৎ সত্যবতীর শ্বশুরকুল এবং পিতৃকুল-দুইই লুপ্ত হয়ে গেল–এই বংশবিলুপ্তির জন্য সত্যবতী বোধহয় নিজেকেই দায়ী করলেন–ধর্মঞ্চ পতিবংশঞ্চ মাতৃবংশঞ্চ ভাবিনী।
