বসুদেব কংসকে একটু তৈলসিক্ত করে বললেন–আপনি হলেন ভোজ-বংশের অলঙ্কার। পৃথিবীর সমস্ত বীরপুরুষ আপনার গুণের প্রশংসা করেন সব সময়। আর সেই আপনি এত গুণী মানুষ হয়েও, এত বড় বীর হওয়া সত্ত্বেও আপনি কিনা এক অবলা রমণীকে বধ করার জন্য উদ্যত হয়েছেন? আর সবচেয়ে বড় কথা, এই অবলা রমণী আপনার বোন। তার ওপরে আজই তার বিয়ে হয়েছে, স কথং ভগিনীং হন্যাৎ স্ত্রিয়মুদ্বাহপর্বনি?
ভাগবত-পুরাণে বসুদেবের মুখে এই প্রশংসা-বাক্যের পরে অনেক দার্শনিক কথাবার্তা শোনা যায়। বাস্তব ক্ষেত্রে কংসের প্রতি এই দার্শনিক উপদেশ খুব যুক্তিযুক্ত নয় বোধহয়। আমাদের যুক্তিতে ওইটুকু সেই কর্পূরের সুবাস এবং এই সুবাসে কংসের মনও সুবাসিত হয়নি ন নিবৰ্তত কৌরব্য পুরুষাদাননুব্রতঃ। বিষ্ণু পুরাণে বসুদেব কিন্তু অত্যন্ত বাস্তব ভাবেই কোনও দার্শনিকতার মধ্যে যাননি। কংস খড়গ তোলার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বলেছেন–এইভাবে দেবকীকে মেরো না কংস। এর গর্ভে যত পুত্র জন্মাবে, তাদের জন্মলগ্নেই আমি তোমার হাতে তুলে দেব-সমর্পয়িষ্যে সকান্ গর্ভানস্যোদরোত্তবান।
ভাগবত-পুরাণে এই শেষ কথাটা বলার আগে বসুদেবের মনে সামান্য যুক্তি-তর্ক আছে। বসুদেব সেখানে ভাবছেন–ছেলেপিলে তো পরের ভাবনা। মাথায় যতক্ষণ বুদ্ধি আছে ততক্ষণ ওই বুদ্ধি দিয়েই দেবকীর মৃত্যুটা আগে ঠেকাতে হবে–মৃত্যু-বুদ্ধিমতাহ্য যাব বুদ্ধিবলোদয়। অতএব পুত্রের মৃত্যু মৌখিকভাবে স্বীকার করে নিয়েই আগে এই বেচারা দেবকীকে বাঁচাতে হবে-প্রদায় মৃত্যবে পুত্রা মোচয়ে কৃপণামিমা। তাছাড়া-বসুদেব আরও ভাবলেন–ছেলে যদি আমার হয়ই এবং কংসও যদি তার মধ্যে মা মরে যায়, তবে সে কি কংসের কিছুই করতে পারবে না? আর অদৃষ্টের ফের, ভবিষ্যতে কীই বা না হতে পারে–বিপর্যয়ে বা কিং ন স্যাদ গতি ধাতুরত্যয়া?
আমরা জানি, ভাগবত-পুরাণে বসুদেবের এই ভাবনাগুলি মিথ্যা নয়। কিন্তু বিপন্ন মুহূর্তে এই ভাবনাগুলি এক লহমার মধ্যে মস্তিষ্কের কোষে ক্রিয়া করে যায় এবং সিদ্ধান্তটাও নিঃসৃত হয় এক লহমার মধ্যেই–তোমার কিছু ভয় নেই কংসন হ্যস্যাস্তে’ভয়ং সৌম্য–আকাশবাণী থেকে তোমার কোনও ভয় নেই। আমার যে ছেলেদের কাছ থেকে তোমার এত ভয়, সেই ছেলেদের তোমার হাতেই তুলে দেব, ভাই–পুত্ৰান্ সমর্পয়িয্যে’স্যা যতস্তে ভয়মুতিম্।
বসুদেবের কথার একটা অন্য মূল্য ছিল–সেটা এক কথা। আর বসুদেবের কথায় যুক্তি ছিল–সেটা আরেক কথা। ভাগবত-পুরাণ বসুদেবের ভাবনা-চিন্তা, যুক্তি-তর্কের বিবরণ। দিয়েছে। অতএব কংস সেখানে তার বাক্যের যৌক্তিকতা মেনে নিলেন– কংসস্তবাক্যসারবিৎ। আর আমরা যেহেতু বসুদেবকে বিরোধী গোষ্ঠীর অন্যতম নেতা মনে করি এবং অপেক্ষাকৃত প্রাচীন পুরাণগুলিতে যেহেতু এই নেতৃত্বের ব্যাপারে স্পষ্ট প্রমাণ পাব, তাই বিষ্ণু পুরাণের বক্তব্য মেনে নিয়ে বলিবসুদেবের মতো এক বিশিষ্ট ব্যক্তি এই কথা দিলেন বলেই কংস তাঁর কথা মেনে নিলেন। কংস দেবকীকে মারলেন নান ঘাতয়ামাস চ তাং দেবীং তস্য গৌরবাৎ।
ভগবত-পুরাণ, বিষ্ণুপুরাণ এবং হরিবংশ–সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে-কৃষ্ণ জন্মাবার আগে কংসের অত্যাচার-পীড়িতা ধরণী বিষ্ণুর কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন। ব্রহ্মা এবং অন্যান্য দেবতাদের সনির্বন্ধ অনুরোধে ভগবান নিজে মানুষরূপে অবতার গ্রহণ করবেন বলে কথা দিয়েছেন। বসুদেব এবং দেবকীর পুর্ব-তপস্যা ছিল এবং তারা পরম ঈশ্বরকে পুত্ররূপে পেতে চেয়েছিলেন। ভগবানের দিক থেকেও এবার সুযোগ এল দেবকীর গর্ভে জন্ম নিয়ে মনুষ্য-লীলার অভিলাষ পূরণ করার।
তবে এ সবই ধর্মের কথা। কৃষ্ণের ভাগবত্তায় যারা বিশ্বাসী, তারা এইরকম একটা বিশ্বাস হৃদয়ে ধারণ করতেই পারেন, তাতে কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু কৃষ্ণের জীবনকে যদি লৌকিক দৃষ্টিতেও দেখা যায়, তবেও কিন্তু কোনও সন্দেহের কারণই নেই, যে কৃষ্ণের জন্ম হবে দেবকীর গর্ভেই, কারণ তার জন্মের পরেই আমরা সঠিক জেনেছি যে, কৃষ্ণ দেবকীরই পুত্র। যাইহোক সে জন্মের কথা পরে আসবে, আগে দেখতে হবে বসুদেব-দেবকী এখন কী অবস্থায় আছেন।
দেবকীর পক্ষে শ্বশুরবাড়ি যাওয়া আর সম্ভব হয়নি। তবে কারাগারের মধ্যে তাদের দুজনকেই কঠিন শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায় বেঁধে রাখা হয়েছিল কিনা, সে সম্বন্ধে সন্দেহ করা যেতেই পারে। ভাগবত-পুরাণে দেখা যায়–দেবকীর প্রথম পুত্রটি জন্মাবার সঙ্গে সঙ্গেই বসুদেব তার প্রতিজ্ঞাত বাক্য স্মরণ করে সেই শিশু সন্তানকে কংসের হাতে তুলে দেন। তাঁর মনে কষ্ট ছিল–অর্পয়ামাস কৃচ্ছ্রেণ-তবুও বসুদেব আপন সত্যে প্রতিষ্ঠিত রইলেন। কংসও তার এই ব্যবহার দেখে খুশি হয়ে বললেন-তোমার এই ছেলেটাকে ফিরিয়েই নিয়ে যাও, বসুদেব! এর থেকে আমার ভয় নেই কোনও-প্রতিযাতু কুমারোয়ং ন হ্যম্মাদস্তি মে ভয়। তোমার সেই অষ্টম সন্তানটি ভূমিষ্ঠ হোক, তখন দেখা যাবে। ভাগবত-পুরাণে এই ঘটনার পরেই কংসের সভায় দেবর্ষি নারদের আগমন হচ্ছে। নারদ কংসকে বোঝালেন–বসুদেব-দেবকী, তাঁর আত্মীয়-স্বজন, বৃন্দাবনে বসুদেবের বন্ধুবর্গ–এঁরা সবাই প্রায় দেবতা–সর্বে বৈ দেবতায়াঃ। কাজেই সাবধানে থেকো। স্বয়ং ভগবান যে কংসের মৃত্যু ঘটিয়ে পৃথিবীকে ভারমুক্ত করবেন–এই চরম কথাটাও বলতে নারদ ভুললেন না।
