এটি একটি গো-চারণ ক্ষেত্র। অনেক গরু একসঙ্গে ঘাস খাচ্ছে, গোবৎসেরা রোমস্থায়মান গাভীর দুগ্ধ পান করে মুখে ফেনা উঠিয়ে ফেলেছে। বড় শান্ত, বড় অলস পরিবেশ। রাজা দেখলেন-এই মুক্ত তৃণভূমির বিজন প্রান্তে এক মুনি পদ্মাসনে বসে আছেন–ধ্যানমগ্ন মহাশান্তি। ভাবগত পুরাণ পরীক্ষিতকে যথাসম্ভব বাঁচানোর জন্য তাকে অতিশয় ক্লান্ত এবং পিপাসার্ত বলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু বাস্তবে পরীক্ষিত যত না ক্লান্ত ছিলেন, কারণ মহাভারতেও তার ক্লান্তি এবং পিপাসার কথা বলা আছে, কিন্তু সেই পিপাসার চেয়েও পরীক্ষিত বেশি ছিলেন মৃগয়া-ব্যসনী। ভাগবতে পরীক্ষিত মুনির কাছে বার বার পিপাসার জল চেয়ে সদুত্তর পাননি। কিন্তু মহাভারতে পরীক্ষিত-মহারাজ ধ্যানরত মুনিকে জিজ্ঞাসা করেছেন, আমি অভিমন্যর পুত্র পরীক্ষিত। আমি একটি হরিণকে বাণ-বিদ্ধ করেছি। কিন্তু হরিণটা কোনওরকমে পালিয়েছে। আপনি কি হরিণটাকে দেখেছেন–ময়া বিদ্ধো মৃগো নষ্টঃ কচ্চিত্তং দৃষ্টবানসি?
পরীক্ষিতের ভাব-ভঙ্গি ভাল ছিল না। তপস্যারত একটি মুনিকে দেখা মাত্রই ধনুক-বাণ নামিয়ে রেখে জুতো খুলে অতি বিনীতবেশে তার সামনে উপস্থিত হওয়ার কথা বিনীতবেশেন প্রবেষ্টব্যানি তপোবনানি নাম–তার পূর্বজরাও চিরকাল তাই করেছেন। কিন্তু রাজা ধনুবাণ তো ত্যাগ করেনইনি, বরং সেগুলি উদ্যত ছিল–লক্ষ্যের সন্ধান পাওয়া মাত্রই যাতে লক্ষ্য ভেদ করা যায়। এইভাবে ধনুক উঁচিয়ে একজন অহিংস ব্যক্তির সামনে প্রায় সহিংস আচরণ এবং পুনরায় তার প্রশ্ন-জিজ্ঞাসার মধ্যেও এমন কোনও ভণিতা ছিল না–যা তখনকার দিনের প্রচলিত শিষ্টাচারের সঙ্গে মেলে–অপৃচ্ছদ্ধনুরুদ্যম্য তং মুনিং ক্ষুণ্ডুমান্বিতঃ।
ধ্যানরত মুনির সঙ্গে দেখা হলে তার সঙ্গে কথা বলার শিষ্টাচার ছিল এইরকম–আপনার তপস্যার কুশল তো–অপি তপো বর্ধতে! অথবা তাকে যদি বিরক্ত করছি বলে মনে হয় তাহলে ভাষাটা হওয়া উচিত–আপনার তপস্যার বিঘ্ন সৃষ্টি করছি না তো? মুনিবর প্রণাম। কিন্তু পরীক্ষিতকে দেখতে পাচ্ছি–তিনি মুনি দেখামাত্রই প্রশ্ন করলেন, এই যে ঠাকুর! আমি অভিমন্যর ছেলে রাজা পরীক্ষিত…. আমার বাণ-বিদ্ধ মৃগটিকে দেখেছেন– ভো ভো ব্ৰহ্মণ অহং রাজা পরীক্ষিদভিমন্যজঃ। শান্ত আশ্রমপদে-এই যে ঠাকুর! অহং রাজা–এই ভাবটুকু কোনও বিনীত শিষ্টাচারের পরিচয় দেয় না–যা অডিম, অর্জুন বা তার প্রপিতামহ পাণ্ডুরও পরিচয় বহন করে।
মুনি মৌনব্রত অবলম্বন করেছিলেন। পরীক্ষিতের কথার কোনও উত্তর তিনি দিলেন না। হয়তো উত্তর দিতে ভালও লাগেনি। হয়তো মৌনতাও সেইজন্যই। রাজা পরীক্ষিত অপেক্ষা করেননি, সামান্য শিষ্টাচারে প্রণাম পর্যন্ত করলেন না। উপরন্তু ক্রুদ্ধ হয়ে কাছে পড়ে থাকা একটা মরা সাপ তার গলায় ঝুলিয়ে দিলেন। তাও হাত দিয়ে নয়, ধনুকের প্রান্তভাগ দিয়ে সাপটি মুনির গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে তিনি তাচ্ছিল্যভরে চলে গেলেন-সমুৎক্ষিপ্য ধনুষ্কোটা স চৈনং সমুপৈক্ষত। পরিষ্কার বোঝা যায়–মরা যে সাপটি তিনি নিজের হাতে তুলতে ঘৃণাবোধ করেছেন, সেই সাপটি মুনির গলায় ঝুলিয়ে দিতে তার কোনও দ্বিধা হল না। ঘটনাটা ঘটানোর পর পরীক্ষিতের ক্রোধ শান্ত হল বটে, গলায় সাপ ঝুলানো মুনিকে দেখে তার একটু খারাপও লাগল বটে, কিন্তু সাপটি গলা থেকে নামিয়ে দেওয়ারও কোনও প্রয়াস তিনি নিলেন না। তিনি চলে গেলেন নিজের নগরে। বিস্তীর্ণ আরণ্যক পরিবেশে উন্মুক্ত গোচারণ-ভূমিতে মৃত সাপ গলায় নিয়ে মুনি বসে রইলেন তেমনই–নিরপেক্ষ, উদাসীন।
এবারে সেই প্রশ্নটা আবার তুলি। পরীক্ষিতের রাজত্বকালে কলি-প্রবেশের তাৎপর্য এইখানেই। দেশের রাজা নিজেই যেখানে সদাচার-বিরোধী ভূমিকায় দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি অসদাচার প্রতিরোধ করবেন কী করে? মহাভারতের কবি ওজর দিয়ে বলেছেন–পরীক্ষিত মুনিকে ততখানি ধার্মিক বলে বুঝতে পারেননিন হি তং রাজশাদূর্লস্তথা ধর্ম পরায়ণ–অতএব সেইজন্যই তিনি এই অশালীন আচরণ করে ফেলেছেন। আমরা বলি–তপস্বী যদি ভণ্ডও হতেন, তবু দেশের রাজা, যিনি প্রখ্যাত যাদব-বৃষ্ণিকুল এবং কৌরব-কুলের পবিত্র শোণিত বহন করছেন আপন শরীরে, তার এই ব্যবহার কি শোভা পায়?
এই ক্রুর আচরণের প্রত্যুত্তরে মুনি কিন্তু কোনও শাপ দিলেন না। মহারাজ পরীক্ষিত রাজশ্রেষ্ঠ পাণ্ডব-বংশের ধুরন্ধর পুরুষ। হরিণ হারিয়ে কিছু ক্রোধাবেশ হয়ে থাকবে তার অথবা লক্ষ্যবস্তুতে যে কোনও রাজার এই আবেশই থাকা দরকার–এইরকম ভেবে রাজার দোষটুকুও গুণপক্ষে আরোপ করে মুনি তাঁকে মনে মনে মুক্তি দিলেন। যেমন তিনি বসে ছিলেন, তেমনই বসে রইলেন-ঋষিস্তু অসীৎ তথৈব সঃ। রাজার ক্রোধ অথবা মৃত সর্পের ঘৃণা শরীরে বহন করেও মুনির মনের প্রশান্তি নষ্ট হবে কেন–হয়তো এইরকম কোনও আধ্যাত্মিক তর্কেই মুনি যেমন ছিলেন, তেমনই বসে রইলেন। রাজা তখন হস্তিনানগরে।
.
০৭.
যে মুনির গলায় মহারাজ পরীক্ষিত মরা সাপ ঝুলিয়ে দিয়ে এলেন, এখনও আমরা তার নাম জানি না। মুনির নাম শমীক। শান্ত সমাহিত চিত্ত। পরীক্ষিত তাকে যে এত বড় অপমান করে গেলেন–তা তিনি মনেও রাখলেন না। কিন্তু শমীক মুনির একটি অল্পবয়স্ক পুত্র ছিল। তার নাম শৃঙ্গী। যেমন তিনি তেজস্বী তেমনই তার তপোবল। এই অল্প বয়স্ক মুনি বালক আপন সংযম এবং তপস্যার বলে ইতোমধ্যেই প্রজাপতি ব্রহ্মাকে তুষ্ট করেছেন। কিন্তু তপোবল বা ইন্দ্রিয়-সংযম তার যথেষ্ট থাকলেও বালকের স্বভাবে কিছু ক্রোধ ছিল। সে ক্রোধ এতটাই যে, তিনি একবার ক্রুদ্ধ হলে তাকে প্রসন্ন করা খুব কঠিন হতশৃঙ্গী নাম মহাক্রোধ দুম্প্রসাদো মহাব্রতঃ!
