চৈতন্য-পার্ষদ রূপ গোস্বামী ললিতমাধব নামে কৃষ্ণলীলা সংক্রান্ত একটি নাটক লিখেছিলেন। নাটকের আরম্ভে দ্বিতীয় শ্লোকে রূপ গোস্বামী চৈতন্য-মহাপ্রভুর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন এবং তার আশীর্বাদ যাচনা করে একটি শ্লোক রচনা করেন। ঘটনা হল–কৃষ্ণলীলাময় এই নাটকখানি কেমন হয়েছে সেটা শোনানোর জন্য রূপ পুরীতে আসেন মহাপ্রভুর কাছে। মহাপ্রভুর সামনে নাটক পড়বার সময় মহাপ্রভুর অন্যতম জীবন-সঙ্গী রায় রামানন্দও উপস্থিত ছিলেন। তিনি নিজে কবি এবং অত্যন্ত রসিক ভক্ত। ললিতমাধব নাটকের আরম্ভশ্লোক নান্দী-পাঠ সেরেই রূপ গোস্বামী শ্রীচৈতন্যের প্রশংসাসূচক শ্লোকখানি পড়লেন। মহাপ্রভু রূপের ভক্তিতে খুশি হলেও তৃণাদপি সুনীচের নম্রতায় খানিকটা লজ্জিতও হলেন। সামান্য কপট কোপ প্রকাশ করে রূপের উদ্দেশে তিনি বললেন–
কঁহা তোমার কৃষ্ণ-রস-বার্কসুধাসিন্ধু
তার মধ্যে মিথ্যা কেনে স্তুতি-ক্ষার-বিন্দু।
রায় রামানন্দ প্রভুর এই রোষাভাস মেনে নিলেন না। বরঞ্চ রূপের প্রশংসা করে তার শ্লোকের যৌক্তিকতা মেনে নিলেন। কবিরাজের ভাষায়–
রায় কহেলিপের কাব্য অমৃতের পর।
তার মধ্যে এক বিন্দু দিয়াছে কর্পূর।
ভাগবতপুরাণে কৃষ্ণ-জীবন এবং চরিত্র-বর্ণনায় সর্বত্র এই কর্পূরের সুবাস ছড়ানো আছে। অমৃতপুর বর্ণনার মধ্যে এই কর্পূরের সুবাস নিঃসন্দেহে এই পুরাণের পাঠ এবং শ্রবণযোগ্যতা অনেকাংশে বাড়িয়ে তুলেছে, কিন্তু তাতে নিরপেক্ষ ঐতিহাসিকের বড় জ্বালা হয়েছে। সে এই মহাপুরাণের অপূর্ব আস্বাদকে নিছক কাব্য-ভ্রমি বলে উড়িয়েও দিতে পারে না, আবার তথ্য-বর্ণনার সময় একে একেবারে বাদ দিতেও পারে না। বাদ দিতে পারে না, কারণ প্রাচীন পুরাণগুলির মূল তথ্যের সঙ্গে ভাগবত পুরাণের তথ্যের মিল আছে, তবে হ্যাঁ, তার সঙ্গে কর্পূরের সুবাসটুকু আমাদের উপরি পাওনা।
ভাগবত পুরাণের সূত্র ধরেই যদি আরম্ভ করি, তাহলে দেখব–আরম্ভটা বড়ই নাটকীয়। বসুদেবের সঙ্গে দেবকীর বিয়ে হয়েছে এবং আদরের বোন খুশি হবেন বলেই মথুরাধিপতি কংস স্বয়ং দেবকীকে রথে করে শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে দেবেন বলে ঠিক করেছেন-উগ্রসেনসুতঃ কংসঃ স্বঃ প্রিয়চিকীর্ষয়া। ঘোড়ার লাগাম কংসের হাতে, আর মথুরার রাজা স্বয়ং আজ বসুদেব-দেবকীর রথের সারথি হয়েছেন বলে তাঁর অনুগামী সমস্ত রাজারা, অভিজাত ব্যক্তিরা রথে চড়ে, হাতি-ঘোড়া-পালকির পংক্তি সাজিয়ে কংসের পিছন পিছন চললেন–রৌক্সৈ রথদশতৈবৃতঃ। বাড়ির মেয়ে-বউরা শঙ্খ বাজিয়ে যাত্রা-মঙ্গল সূচনা করলেন, বাদ্যিকরেরা বাদ্যি বাজাতে লাগল। কংস চললেন বসুদেব-দেবকীকে নিয়ে–প্রয়াণপ্রক্রমে তস্য বরবধ্বঃ সূমঙ্গলম। এমন সময় সেই বঙ্কথিত, বহুশ্রুত দৈববাণী হল–ওরে বোকা! তুই যাকে এই রথ সাজিয়ে আদর করে নিয়ে যাচ্ছিস, এই রমণীর অষ্টম গর্ভের সন্তান তোকে হত্যা করবে।
ভাগবত পুরাণের এই বর্ণনার সঙ্গে প্রাচীন বিষ্ণুপুরাণের বর্ণনার কোনও তফাৎ নেই। দৈববাণীর কথা সেখানেও আছে। যারা দৈববাণী, বরদান এবং অভিশাপের তাৎপর্যে বিশ্বাস করেন, তারা নিশ্চয়ই মানবেন যে কংসের কাল ঘনিয়ে আসছে। কিন্তু দৈববাণী, আকাশবাণীতে যাদের বিশ্বাস নেই, তারা মনে করেন–ঘটনা ঘটার পর কবি–পৌরাণিকে দৈববাণী, অভিশাপ অথবা বরদানকে যথাস্থানে সন্নিবেশিত করে বিশিষ্ট বর্ণনায় নতুন মাত্রা যোগ করেন। আমরা অবশ্য কংসের নিদারুণ অত্যাচারের নিরিখে দৈববাণীর চেয়ে সাধারণ মানুষের অপ্রীতি বা জনরোষকেই প্রধান বলে গণ্য করি। মথুরার জনগণ বসুদেবকে কংসের বিরুদ্ধ গোষ্ঠীর সবচেয়ে সসাচ্চার নেতা হিসেবে জানত এবং বিশ্বাসও করত যে, কোনও না কোনও দিন এই মানুষটির তরফ থেকেই কংসের বিপন্নতা তৈরি হবে। সেই নেতৃস্বরূপ বসুদেবকে কংস নিজে রথে বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন দেখে প্রেক্ষক জনগণ স্থির থাকতে পারেনি। তারাই হয়তো কেউ চেঁচিয়ে বলেছে–ব্যাটা বোকা পাঠা! যাকে তুই বয়ে নিয়ে যাচ্ছিস, ওর ছেলেই তোর সর্বনাশ করবে একদিন-সংস্কৃতে এই পংক্তির পৌরাণিক চেহারা দাঁড়াবে এইরকম–
যামেতাং বহসে মৃঢ় সহ ভর্তা: রথে স্থিতাম্।
অস্যান্তে চাষ্টমো গর্ভঃ প্রাণানপরিষ্যতি।
দেববাণীই হোক অথবা জনবাণীই হোক, কথাটা শোনামাত্রই মধুরাধিপতি কংসের সম্মানে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দেবকীর চুলের মুঠিটি চেপে ধরলেন বাঁ হাতে। ডান হাতে খড়গ। তাঁর ইচ্ছে দেবককে এই মুহূর্তে মেরে ফেলবেন তিনি– ভগিনীং হমারব্ধঃ খড়গপাণিঃ কচে’গ্রহী।
স্বাভাবিকভাবেই দেবকী খানিকটা হতচকিত হয়ে গেলেন। এই তিনি প্রথম শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছেন। স্বামীর সঙ্গে এখনও তাঁর ভাল করে পরিচয়ই হয়নি। সেই অবস্থায় স্বামীর সামনে তার ভাই তাকে চুলের মুঠি ধরে হত্যার উদ্যোগ নিয়েছেন-এ হেন অবস্থায় তার বাক্য রুদ্ধ হয়ে গেল। বসুদেব কিন্তু একটুও ভেঙে পড়লেন না। কংসকে তিনি চেনেন। বিভিন্ন বিষয়ে মতানৈক্য যখন হয়, তখন বিরোধী নেতা হিসেবে অনেকবারই কংসের সঙ্গে তার তর্কাতর্কি হয়েছে। কিন্তু এই সদ্য-বিবাহের পর একটি রমণী যখন তার ভাগ্যের অভাগিনী হয়ে আছেন, তখন বসুদেবের পক্ষে গলা চড়িয়ে কোনও কথা বলা সম্ভব ছিল না। তাছাড়া কৌশল হিসেবে নিকৃষ্ট লোকের সঙ্গে কথাবার্তায় প্রথমে মধুর ভাষণই শ্রেয় মনে করেন বসুদেব।
