যাই হোক দেবকীর সঙ্গে বসুদেবের বিয়ে হলে কংস মোটামুটি খুশিই হলেন। পিতৃব্যের এই কন্যাটিকে তিনি যথেষ্ট ভালবাসতেন। অপিচ তার খুশির কারণ আরও একটা ছিল। বসুদেব কংসের মন্ত্রিসভার অন্যতম মন্ত্রী। কংসের কাজকর্মে তিনি মোটেই সন্তুষ্ট নন। অতএব এই বিক্ষুব্ধ তরুণ মন্ত্রীর সঙ্গে যদি কংসের ঘরের মেয়ের বিয়ে হয়, তবে রাজনৈতিক দিক দিয়ে তার সুবিধে হবে–এই ছিল কংসের ধারণা।
বসুদেব-দেবকীর বিবাহ-প্রসঙ্গে অবতরণ করার আগেই জানাই–অষ্টাদশ পর্ব মহাভারতের মধ্যে এই বিবাহ-প্ৰসঙ্গ কোথাও নেই। মহাভারতের মধ্যে শত-শতবার কৃষ্ণকে ‘বাসুদেব’, ‘বসুদেবপুত্র’ বা ‘দেবকীনন্দন’ বলে ডাকা হলেও তার জন্ম-কাহিনী বা বাল্য-বয়সের কথা মোটেই উল্লিখিত হয়নি। আরও আশ্চর্য হল–এ বিষয়ে মহা-মহাপণ্ডিতদের তর্ক-যুক্তির ধারা মাঝে মাঝে এতই অযৌক্তিক রকমের বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে যে, আমরাও খানিকটা বিল হয়ে পড়ি। মহাভারতের মধ্যে রাজনীতি-ধুরন্ধর এক পাকাপোক্ত কৃষ্ণকে দেখে, অনেক পণ্ডিত ব্যক্তিই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে বৃন্দাবনের রাখাল কৃষ্ণ এবং মহাভারতের কৃষ্ণ এক ব্যক্তি নন। সুযোগ বুঝে আরও পাণ্ডিত্য দেখিয়ে অন্য পণ্ডিতেরা আবার বৃন্দাবনের কৃষ্ণ, মথুরার কৃষ্ণ এবং দ্বারকার কৃষ্ণ নামক তিনটি শ্রেণীর উল্লেখ করেছেন। বলা বাহুল্য, এঁদের পাণ্ডিত্যপ্রকর্ষ মূলচ্ছেদী এবং অনেকাংশেই সাহেবদের উচ্ছিষ্ট-শেষমাত্র।
কৃষ্ণের কথায় পরে আসব। আপাতত শুধু এইটুকু জানিয়ে রাখি যে, মহাভারতে যেহেতু পাণ্ডব-কৌরবদের জ্ঞাতিবিরোধের ঘটনাই প্রধানত স্থান পেয়েছে, তাই কৃষ্ণের জন্ম বা বাল্য-বয়সের কথা সেখানে অপ্রাসঙ্গিক। মহাভারতের কবি যেহেতু মহাকাব্যের কবি তাই। কথ্যমান বিষয়ে অনেক অপরিচিত উপাখ্যানই প্রাসঙ্গিকভাবে এসেছে, কিন্তু কৃষ্ণের বাল্য-পৌগও সেখানে কোনওভাবেই প্রাসঙ্গিক ছিল না। অতএব তিনি তা লেখেননি। কিন্তু পণ্ডিতদের বোঝা উচিত–মহাভারতের মধ্যে যে মানুষটির সার্বত্রিক উপস্থিতি তাকে ভগবত্তায় উপনীত করেছে, তার জন্ম, বাল্য, পৌগণ্ড এবং প্রথম যৌবনও যে যথেষ্ট রোমাঞ্চকর হবে সে কথা সহজেই অনুমেয়। কৃষ্ণের প্রসঙ্গে যাবার আগে আমরা তাই পরিষ্কার জানিয়ে দিতে চাই যে, কৃষ্ণের পূর্বজীবন আমাদের খুঁজে বার করতে হবে আমাদের পুরাণগুলি থেকেই। কারণ পুরাণগুলিই ভারতবর্ষের ইতিহাস-প্রতিম।
এই প্রসঙ্গে স্মরণীয়–সাহেব-সুবোদের নানা ঢক্কা-নিনাদ এবং তদুচ্ছিষ্টভোগী ঢাকের কাঠি স্বরূপ কতগুলি বাঙালি-সাহেবের একতান করতাল-ধ্বনি শুনে খুব একটা বিচলিত হবার যুক্তি নেই। এর কারণ এই নয় যে, তারা জ্ঞানী-গুণী নন। বরঞ্চ কারণ এই যে তারা জ্ঞানী-গুণী হওয়া সত্ত্বেও জাতীয় ইতিহাসের একান্ত সহজ ধারা পরিহার করে বৈদেশিক বিচার-বিশ্লেষণের বিচিত্র পদ্ধতি প্রয়োগ করে সহজ বস্তুকে অনর্থক জটিল করে তোলেন। যেহেতু ভারতবর্ষের একান্ত আপন শাস্ত্রীয় ইতিহাসের পরম্পরা মোহমুক্তভাবেই বোঝবার চেষ্টা করা যায়, তাই কৃষ্ণের জীবন তথা চরিত্র ব্যাখ্যায় দেশজ বিচারশৈলী প্রযুক্ত হওয়া উচিত।
কোনও সন্দেহ নেই–আমাদের পৌরাণিকেরা গল্প করতেন বেশি, তথ্য দিতেন কম। কিন্তু তাতে আমাদের অসুবিধে কী? কারণ, সে গল্প তো আমাদের ঠাকুরদাদা-ঠাকুমার মতোই। আমার জন্ম-সনের খবর দিতে গেলে তারা আগে বলবেন–সেবারে ছিল অতি বৃষ্টির বছর, লোকজন বন্যায় মারা যাচ্ছে, ঠাকুর-দালানের পিছনের আম গাছটা সেইবার ভাঙল, যদু গোস্বামীর মেজ মেয়ে সেইবার জন্মাল, আর ঠিক তার পরের সনের ওই তারিখেই তোর জন্ম। হল। তাহলে দেখুন–আমার জন্মের খবর জানতে হলে আমার ঠাকুমার মুখে যদু গোস্বামীর মেয়ে থেকে আরম্ভ করে আষ বৃক্ষের পতন পর্যন্ত–তাও এক বছর আগের ঘটনা–সব আপনাকে জানতে হবে। মহাভারতের কৃষ্ণের আদ্যিকাল জানতে হলেও, আপনাকে তাই পুরাণ, হরিবংশ, সংস্কৃত নাটক, দর্শন, উপনিষদ–সব জানতে হবে; আর এই জানাটা ঠিক হলে মহাভারতের সূত্রধার রাজনীতির ধুরন্ধর ব্যক্তিটিকেও আপনি সঠিক বুঝতে পারবেন। মহাভারতের কৃষ্ণের জন্য কোনও উর্বর মস্তিষ্ক প্লেকে বাল্য-পৌগণ্ডহীন এক নতুন কৃষ্ণের উৎপাদন করতে হবে না।
যাঁরা বলেন ‘গ্রন্থরূপে ভাগবত কৃষ্ণ-অবতার’–তাদের সঙ্গে এই মুহূর্তে আমরা খুব সহৃদয়তা বোধ করছি না, কারণ ভাগবত পুরাণে বসুদেব-দেবকীর বিবাহের মধ্যে অতিকথন কিছু আছে, অলৌকিকতাও কিছু আছে। তা ছাড়া পণ্ডিতদের মতে পুরাণগুলির মধ্যে ভাগবত পুরাণের বয়স বড় অল্প। ভাগবত-পুরাণে বসুদেব-দেবকী এবং কৃষ্ণের কথাতেও তাই অল্পবয়সী রোম্যান্টিকের হৃদয়স্পর্শ আছে। সে অতি মধুর, তাতে সন্দেহ নেই।
কিন্তু অতি-মধুরতা অনেক সময় অন্যান্য বস্তুর বৈশিষ্ট্য প্রতিহত করে, ভাগবত পুরাণেও তাই ঘটেছে। সুমধুর পায়সান্নর প্রকৃত আস্বাদ পেতে গেলে যেরকম ঘনীভূত দুগ্ধের আস্বাদও প্রয়োজন, শর্করার আস্বাদও প্রয়োজন এবং ক্ষুদ্র এলাচী-চূর্ণের আস্বাদও প্রয়োজন, তেমনই কৃষ্ণ জীবনের প্রকৃত আস্বাদ পেতে হলে হরিবংশ, বিষ্ণুপুরাণ, মহাভারত এবং অবশ্যই এলাচী-চুর্ণের সুবাসের মতো ভাগবত পুরাণেরও প্রয়োজন। সব কিছু মিলিয়েই আমাদের কৃষ্ণ-জীবনের আস্বাদ-যোগ্যতা উপভোগ করতে হবে। একটা ঘটনা বলি।
