আরও একটা কথা–দ্রুপদ যখন শিখণ্ডীকে লাভ করেন, তখন দ্রোণাচার্যের সঙ্গে তার রাজ্যভাগ নিয়ে গণ্ডগোল সম্পূর্ণ মেটেনি। কিন্তু দ্ৰোণাচার্য যে দ্রুপদের ওপর প্রতিশোধ নেবার জন্যই কুরুরাজ্যে গিয়ে পৌঁছেছেন, সে কথা তিনি অবশ্যই জানতেন। পাণ্ডব-কৌরবদের অস্ত্রশিক্ষা দিয়ে দ্রোণাচার্য অর্জুনের মাধ্যমে দ্রুপদকে উচিত শিক্ষা দেন। প্রতিশোধ-স্পৃহায় দ্রুপদ ধৃষ্টদ্যুম্নকে লাভ করেন দ্রোণ বধের জন্য। কিন্তু দ্রোণ বধের জন্য ধৃষ্টদ্যুম্নের জন্ম হয়েছে জেনেও দ্রোণ তাকে অশিক্ষা দিতে কুণ্ঠিত হননি। ভীষ্ম নিজে বলেছেন–ধৃষ্টদ্যুম্ন এবং পাণ্ডব-কৌরবদের সঙ্গে শিখণ্ডী দ্রোণের কাছে অস্ত্রশিক্ষা লাভ করেছিলেন এবং এই শিখণ্ডী পূর্বে ছিল স্ত্রী–শিখণ্ডিনং মহারাজ পুত্রং স্ত্রীপনিং তথা।
দ্রোণাচার্যের ওপর দ্রুপদের যে রাগ ছিল, সেই রাগ ভীষ্মের ওপরেও গিয়ে পড়েছিল দ্রোণাচার্যের কারণেই। কারণ একটাই। দ্রুপদের কাছে দ্রোণাচার্য প্রত্যাখ্যাত হবার পর ভীষ্ম পরম গৌরবে দ্রোণাচার্যকে আশ্রয় দিয়েছিলেন হস্তিনাপুরে। কাজেই দ্রুপদ যখন দেখলেন একটি রমণী পুরুষের যোগ্য অস্ত্রবিদ্যা আয়ত্ত করে ভীষ্মবধের প্রতিজ্ঞা করেছেন, তখন সেই রমণীর ইচ্ছামতো তাকে পুরুষ হিসেবে প্রচার করতে তিনি কুণ্ঠিত হননি। ভীষ্ম যে। ক্ষত্রিয়বীরের ধর্ম অতিক্রম করে স্ত্রীলোকের গায়ে হাত তুলবেন না বা অস্ত্রসন্ধান করবেন না–এটা দ্রুপদের ভালই জানা ছিল এবং জানা ছিল বলেই শিখণ্ডীকে পুরুষ হিসেবে তিনি যতই প্রচার করুন, তিনি যে আদতে স্ত্রীলোক–এই খবরটাও তিনি পরে কখনও লুকাননি। দ্রুপদ চেয়েছিলেন অস্ত্রের সুশিক্ষায় পুরুষের সুবিধে শিখণ্ডী যতটুকু পাচ্ছে পাক, উপরন্তু ভীষ্মবধের সময় স্ত্রীত্বের সুবিধেটুকুও সে পাবে।
শিখণ্ডী যে আদতে স্ত্রী–সে কথা ভীষ্ম যেমন তার নিযুক্ত বিশ্বস্ত চরদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ জানতেন–মম ত্বেতচ্চারা স্তাত…যে মুক্তা দ্রুপদে ময়া–তেমনই তিনি যে স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও পুরুষ সেজে থাকেন সে কথাও ভীষ্মের মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়।
আমি কোনও স্ত্রীলোক বা নপুংসকের গায়ে অস্ত্র-সন্ধান করি না–এই বীরমানিতাই যেখানে ভীষ্মের পক্ষে যথেষ্ট ছিল সেখানে মহাকাব্যের উপাখ্যান-শৈলী ঠিক রাখার জন্যই যেন ভীষ্মকে প্রতিজ্ঞা উচ্চারণের সময় অন্তত চারটে বিকল্পের কথা বলতে হয়েছে। ভীষ্ম। দুর্যোধনকে উদ্যোগপর্বে বলেছেন–আমার এই নিয়ম আমি কোনও স্ত্রীলোক, কোনও পুরুষ যে আগে স্ত্রী ছিল, যে পুরুষকে কোনও স্ত্রীর নামে ডাকা হয় এবং যে স্ত্রী পুরুষের মতো সাজে, তার প্রতি আমি বাণ নিক্ষেপ করি না–স্ত্রিয়াং স্ত্রীপূর্বকে চৈব স্ত্রীনামি স্ত্রীস্বরূপিণি। এই কারণে আমি শিখণ্ডীকে মারতে পারি না। এই হল ভীষ্মের চতুর্বিকল্প প্রতিজ্ঞা।
লক্ষ্য করে দেখবেন–ভীষ্মের এই চারটে বিকল্পের মধ্যেই অম্বা থেকে শিখণ্ডীর পরিণতি বিধৃত আছে। অম্বা আদতে স্ত্রী–তিনি কাশীরাজের কন্যা-জ্যেষ্ঠা কাশীপতেঃ কন্যা অম্বা নামেতি বিঞতা। তিনি দ্রুপদের ঘরে এসে শিখণ্ডী নামে পরিচিত হলেন–যাঁকে মহাকাব্যের কল্পনায় দ্রুপদের ঘরে জন্মালেন বলা যায়–দ্রুপদস্য কুলে জাতা শিখণ্ডী ভারতভ। এই গেল দ্বিতীয় বিকল্প অর্থাৎ সে আগে স্ত্রী ছিল, এখন পুরুষ হয়েছে–শ্রীপূর্বকে চৈব। তৃতীয়। বিকল্প–ভীষ্ম এমন পুরুষের গায়ে বাণ নিক্ষেপ করেন না, যার একটি স্ত্রী-নাম আছে। স্ত্রী-নামটি অম্বা। এবার চতুর্থ বিকল্প যেটাকে আমরা সবচেয়ে সত্য বলে মনে করি, সেটা হল–স্ত্রীস্বরূপিণি–অর্থাৎ ভীষ্ম এমন কোনও মানুষের প্রতি অস্ত্র-সন্ধান করেন না, যিনি আদতে স্ত্রী কিন্তু পুরুষের মতো সাজেন। ইনিই শিখণ্ডী, যিনি স্বরূপত একটি স্ত্রী, অর্থাৎ অম্বা।
শিখণ্ডী যদি পুরুষের মতো না সাজতেন, তাহলে ভীষ্মকে এত বিকল্পের সন্ধান করতে হত না। শুধুমাত্র স্ত্রীলোক অথবা নপুংসকের প্রতি বাণ নিক্ষেপ করি না, এইটুকু বললেই চলত। কিন্তু শিখণ্ডীই যেহেতু অম্বা তাই ভীষ্মকে স্ত্রী-নাম এবং স্ত্রীস্বরূপ পুরুষের বিকল্প-দুটি জুড়তে হয়েছে। পরবর্তীকালে দেখব–ভীষ্ম অনেক সময়েই শিখণ্ডীকে নপুংসক না বলে, শুধুমাত্র স্ত্রী হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। বস্তুত শিখণ্ডীর নপুংসকত্ব লিঙ্গকেন্দ্রিক নয়, এই নপুংসকত্ব স্ত্রীলিঙ্গ এবং পুরুষ স্বভাবের মিশ্রচারিতা। শিখণ্ডী স্ত্রীলোকই, যিনি ক্ষত্রিয় পুরুষের ব্যবহার অঙ্গীকার করেছেন মাত্র। শিখণ্ডী পুরুষের সাজে অস্ত্র-শস্ত্রে সুশিক্ষিত এক মহিলা।
.
৬৩.
মথুরার রাজা উগ্রসেন যখন কারাগারে বন্দি হয়ে আছেন, কংস যখন আপন অত্যাচারে সমস্ত মথুরাপুরীর প্রজাদের উত্যক্ত করে তুলেছেন, ঠিক এইরকম একটা সময়ে উগ্রসেনের সহোদর দেবক মহামতি বসুদেবের সঙ্গে নিজের সাত মেয়ের বিয়ে দেবেন ঠিক করলেন। সাত মেয়ের মধ্যে দেবকীই জ্যেষ্ঠা না কনিষ্ঠাতা নিয়ে সন্দেহ করার কোনও কারণ নেই। যতদূর মনে হয় তাতে দেবকীই জ্যেষ্ঠা হয়তো, কারণ একসঙ্গে সাতটি মেয়ের বিয়ে হলে বিবাহের বিধিসম্মত স্মার্ত ক্রিয়াকলাপগুলি সাধারণত জ্যেষ্ঠার সঙ্গেই সম্পন্ন হয়। দেবকীর সঙ্গেও তাই হয়েছে। অন্যদের ক্ষেত্রে পাণিগ্রহণ বা সপ্তপদী গমনের মতো সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠান প্রচলিত ছিল। হয়তো অন্যদের সঙ্গে এই অনুষ্ঠানই হয়েছে।
