আমাদের জিজ্ঞাসা, মহাদেবের বরের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে দ্রুপদমহিষীর বুদ্ধিমত্তা এবং দ্রুপদের এত চাপাচাপি-কোনওটারই প্রশ্ন আসে কি না সন্দেহরক্ষণঞ্চৈব মন্ত্রস্য। নগরের প্রত্যেকটি লোকের কাছে কন্যার স্বরূপ লুকিয়ে প্রচার করা হল-দ্রুপদ পুত্র লাভ করেছেন– ছায়ামাস তাং কন্যাং পুমানিতি চ সো’ব্রবীৎ। অন্যদিকে ভীষ্ম বলেছেন–আমি কিন্তু গুপ্তচরের বাক্য, নারদের সংবাদ এবং অম্বার তপস্যার কথা জেনে দ্রুপদের বাড়ির মেয়েটিকে মেয়ে বলেই জানতাম–অহমেকন্তু চারেণ বচনান্নারদস্য চ। জ্ঞাতবান…।
আমাদের দ্বিতীয় ভাবনা হল–দ্রুপদ রাজা তাঁর মেয়েটির লোকশিক্ষা, শিল্পশিক্ষার ব্যবস্থা শেষ করে ধনুর্বেদ শেখার জন্য দ্রোণাচার্যের কাছে পাঠিয়ে দেন-ইস্ত্রে চৈব রাজেন্দ্র দ্রোণশিয্যো বভূব হ।
তাহলে দেখুন, দ্রুপদ-দম্পতি একটি মেয়েকে ছেলে বলে প্রচার করেছিলেন এবং দ্রোণাচার্যও একটি ছেলে-সাজা মেয়েকে অস্ত্র শিক্ষা দিচ্ছিলেন। এমনকি মেয়েকে ছেলে বলে প্রচারের শেষ সীমায় দাঁড়িয়ে দ্রুপদ দশার্ণ-রাজার মেয়েকে নিয়ে এসে বিয়েও দিয়েছেন শিখণ্ডীর সঙ্গে। এই বিয়ের ঘটনার পর থেকেই শিখণ্ডীর কাহিনীতে যত গণ্ডগোলের শুরু। দশার্ণ রাজার মেয়ে শিখণ্ডীকে পুরুষ না ভেবে শিখণ্ডিনী বলেই চিনল–হিরণ্যবর্মণঃ কন্যা জ্ঞাত্ব তাং তু শিখণ্ডিনীম্। দশার্ণপতি হিরণ্যবর্মা দ্রুপদের বিরুদ্ধে প্রবঞ্চনার অভিযোগ আনলেন এবং ক্রুদ্ধ হয়ে তার রাজ্য আক্রমণ করবেন বলে ঠিক করলেন। দ্রুপদ রাজা বিপন্ন হয়ে আপন মহিষীকেও খানিকটা ভর্ৎসনা করলেন।
মহাভারতের কাহিনীতে দশর্ণরাজ হিরণ্যবর্মার আক্রমণ পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের ওপর নেমে আসবে এবং এই ভাবী আক্রমণের জন্য দ্রুপদ এবং তাঁর মহিষী দুঃখিত হয়ে আছেন–এই অবস্থায় শিখণ্ডিনী গৃহত্যাগ করে নিবিড় বনে উপস্থিত হলেন। বনের মধ্যে যক্ষ স্থূণাকর্ণের সঙ্গে শিখণ্ডিনীর দেখা হয়। চিন্তায় জর্জর, শুষ্ক-শীর্ণ শিখণ্ডিনীকে দেখে যক্ষ স্কুণাকর্শ করুণায় বিগলিত হয়। সে প্রস্তাব করে–আমি তোমাকে কিছুকালের জন্য আমার পুংচিহ্ন দান করব, পরিবর্তে তোমার স্ত্রীচিহ্নও আমি সাময়িকভাবে ধারণ করব–কিঞ্চিৎ কালান্তরং দাস্যে পুংলিঙ্গং স্বমিদং তব।
মহাভারতের কালে লিঙ্গ পরিবর্তন করে লিঙ্গ প্রতিস্থাপনের কোনও শৈলী জানা ছিল–ঠিক এই রকম একটা দাবি অথবা অতীতের মাহাত্ম্য-খ্যাপন শুধুমাত্র মহাকাব্যের ভিত্তিতে করা উচিত হবে না হয়তো। আমাদের মতে মহাদেবের বর থেকে আরম্ভ করে দশার্ণ রাজার মেয়ের সঙ্গে শিখণ্ডিনীর বিবাহ এবং যক্ষ স্কুণাকর্ণের সঙ্গে লিঙ্গ-বিনিময় করে শিখণ্ডীর পুরুষ হয়ে যাওয়ার মধ্যে যে অলৌকিকতা আছে, সেই অলৌকিকতা ছাড়াও লৌকিক এবং রাজনৈতিকভাবেই শিখণ্ডীর নিজস্ব সত্তা ব্যাখ্যা করা যায়।
আমরা আগে বলেছি–অম্বার সেই কথাটি বড়ই গুরুত্বপূর্ণ যেখানে তিনি বলেছেন–আমি যেন কেমন হয়ে গেছি। আমি যেন স্ত্রীও নই, পুরুষও নই–ন স্ত্রী ন পুমান্ ইহ। বস্তুত এই ভাবটুকুর মধ্যেই অম্বা কিংবা শিখণ্ডীর নপুংসকত্ব লুকিয়ে আছে। দ্বিতীয়ত মনে রাখা দরকার–পাঞ্চাল হোত্রবাহন, যাকে আমরা অম্বার মাতামহের পরিচয়ে দেখেছি, তিনি এক সময় অম্বাকে কথা দিয়ে বলেছিলেন-তোমার কোনও চিন্তা নেই, তুমি আমার কাছেই থাকবে, আমি তোমার দুঃখ দূর করব-দুঃখং ছিলাম্যহং তে বৈ ময়ি বর্তস্ব পুত্রিকে। আমাদের ধারণা-পরশুরামের যুদ্ধ বিফল হয়ে যাবার পর সৃঞ্জয় হোত্ৰবাহন তাকে পাঞ্চালে নিয়ে গেছেন এবং তাকে পাঞ্চাল দ্রুপদের হাতে তুলে দিয়েছেন। কারণ হোত্ৰবাহন নিজে পাঞ্চলের লোক এবং যে সৃঞ্জয় বংশে দ্রুপদের জন্ম সেই সৃঞ্জয়ের বংশে অম্বার মাতামহ হোত্রবাহনেরও জন্ম।
যদি বলেন তাহলে অম্বার এত তপস্যা ভী-বধের বর লাভ সবই কি মিথ্যা? আমরা এগুলিকে মিথ্যা বলছি না, তবে তর্কের বুদ্ধিতে জানাই অম্বার পুরুষত্ব লাভের ইচ্ছা অন্যভাবেও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। আসলে অম্বার পুরুষত্বের পর্যবসান পুংলিঙ্গলাভে নয়, পুরুষের যোগ্য বিদ্যা লাভে। যে রমণী ‘পুরুষের বিদ্যা করেছিনু শিক্ষা’র গান করে পরবর্তী সময়ে অর্জুনের মন ভোলাবেন, সেই চিত্রাঙ্গদার উদাহরণে যথেষ্টই ধারণা করা যেতে পারে-অম্বার তপস্যা পুরুষ-সুলভ অসুশিক্ষা ছাড়া আর কিছুই নয়।
কোনও সন্দেহ নেই–অপুত্রক দ্রুপদ যখন অশ্বকে লাভ করলেন তখন তিনি তার অস্ত্রশিক্ষার তপস্যা সুচরিতার্থ করবার জন্য তাকে পুরুষ বলেই প্রচার করেছেন। মহাভারতের বচনে জেনেছি–অম্বা তপস্যার অন্তে মহাদেবের বর লাভ করে নিজে আগুন জ্বেলে তাতে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। তারপর নাকি তিনি দ্রুপদের ছেলে হয়ে জন্মান। আমাদের বিশ্বসে–এই আত্মাহুতি অম্বার স্ত্রী স্বভাবের অন্ত সূচনা করে। এরপর থেকেই তিনি পুরুষ-সুলভ আচরণ করতে থাকেন এবং পূর্বকথিত হোত্ৰবাহনের চেষ্টায় পাঞ্চালে দ্রুপদের কাছে পুরুষের মতোই মানুষ হতে থাকেন। ভীষ্মও আপ্তপুরুষের মাধ্যমে খবর পেয়েছেন শিখণ্ডী আসলে কন্যা। মাঝখানে দশার্ণ রাজার কাহিনী এবং স্কুণাকর্ণের সঙ্গে শিখণ্ডিনী অম্বার লিঙ্গ-বিনিময়ের প্রস্তাব মহাকাব্যের এক চরিত্রের বৈচিত্র্য বাড়িয়েছে মাত্র।
