পরশুরাম যখন অম্বাকে এই কথাগুলি বলছিলেন, তখন ভীষ্ম তার সামনেই দাঁড়িয়েছিলেন। পরশুরামের মতো বীর যখন যুদ্ধভূমিতে ভীষ্মকে কিছুই করতে পারলেন না এবং অম্বা তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন, তখন তার পক্ষে ভীষ্মের প্রশংসা করা ছাড়া আর কোনও গত্যন্তর থাকে না। অতএব অম্বাও ভীষ্মকে দেব-দানবের অজেয় বলে আখ্যা দিলেন বটে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও বললেন যে, আমি কোনওভাবেই তাই বলে ভীষ্মের কাছে ফিরে যেতে পারি না–ন চাহমেনং যাস্যামি পুনভীষ্মং কথঞ্চন। আমি বরং সেই চেষ্টা করব যাতে আমি নিজেই তাকে বধ করতে পারি। কী আর বলব, রমণীর প্রতিহত প্রেমের সংজ্ঞাই বোধহয় অম্বা। শাল্বরাজের থেকেও ভীষ্মের ব্যাপারে তার মুগ্ধতা বেশি। এমন বিরাট এক চরিত্র তিনি পূর্বে কল্পনাও করতে পারেননি।
পরশুরাম যুদ্ধ শেষ করে নিজের জায়গা মহেন্দ্র-পর্বতে চলে গেলেন। অম্বা নিজের প্রতিজ্ঞা পূরণের জন্য গভীর বনে চলে গেলেন তপস্যায় আত্মনিয়োগ করবেন বলে। ভীষ্ম ব্রাহ্মণদের সুতিগীত আর জয়কার শুনতে শুনতে হস্তিনায় ফিরে এলেন। সমস্ত ঘটনা জানালেন জননী সত্যবতীকে। সত্যবতী ভীষ্মের যুদ্ধজয়ে পরম আনন্দ লাভ করলেন। সবই হল। সবই ভালয় ভালয় শেষ হল। কিন্তু সেই যে রমণীটি ভীষ্ম-বধের প্রতিজ্ঞা নিয়ে বনে চলে গেল, তার জন্য ভীষ্মের চিন্তা রয়ে গেল। হস্তিনাপুরের কতগুলি বিশ্ব গুপ্তচরকে তিনি সদা-সর্বদা নিযুক্ত করে রাখলেন সেই রমণীর গতিবিধি এবং মনোভাব প্রতিনিয়ত ভীষ্মের কাছে জানানোর জন্য পুরুষাংস্টাদিশং প্রাজ্ঞ কন্যাবৃত্তান্তকর্মণি। দিবসে দিবসে হ্যস্যা গতি-জলিত-চেষ্টিত। প্রত্যাহরংশ্চ মে যুক্তাঃ স্থিতা প্রিয়হিতে সদা।
.
৬২.
হস্তিনাপুরের রাজা কুমার বিচিত্রবীর্য ভালই রাজ্যশাসন করছিলেন। অবশ্য সে শাসনের মধ্যে তার নিজের অবদান সামান্যই ছিল। শাসন সংক্রান্ত সমস্ত সিদ্ধান্ত যেহেতু ভীষ্মই নিতেন, তাই বিচিত্রবীর্য খানিকটা অপরিপকই থেকে গিয়েছিলেন। এই অল্পবয়স্ক ভ্রাতাটির ওপরে ভীষ্মের স্নেহ-ভালবাসাও এতটাই গভীর ছিল যে, এত বড় একটি রাজ্যের বিভিন্ন বিপদ-আপদ–বিপর্যয়ে তিনি নিজেই ঝাঁপিয়ে পড়তেন, ভাইটির গায়ে কোনও ঝামেলার ছোঁয়াটিও লাগতে দিতেন না। নইলে দেখুন, বিবাহের মতো একটি বিষয়, যা সেকালের রাজাদের নিতান্তই ব্যক্তিগত পছন্দ এবং কন্যা নির্ধারণের ব্যাপার ছিল, সেখানেও কোনও যুদ্ধ বা কোনও অস্বস্তি হবে ভেবে ভীষ্ম তার ছোট ভাইটিকে এগোতে দেননি। তিনি নিজে যুদ্ধ-বিগ্রহ শেষ করে কাশীরাজের দুই মেয়ে অম্বিকা এবং অম্বালিকাকে তুলে দিলেন ভাইয়ের হাতে।
এর মধ্যে অম্বাকে নিয়ে যে সমস্ত সমস্যার সূচনা হল, তার মধ্যে একবারের তরেও কুমার বিচিত্রবীর্যের অনুপ্রবেশ ঘটেনি। ভীষ্মের অপার স্নেহ, মমতা আর আদর পেয়ে পেয়ে বিচিত্রবীর্যের এমনই পাওয়ার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল যে, সংসার এবং রাজনীতির বৃহত্তর ক্ষেত্রে তার যে কোনও কৃত্য আছে, কোনও কিছুতে তাকে যে আগ বাড়িয়ে এগিয়ে যেতে হবে–এসব তিনি বুঝতেই পারতেন না। আর এ ব্যাপারে পিতাপ্রতিম ভীষ্ম এবং জননী সত্যবতীর প্রশ্রয়ও কিছু কম নয়। পিতা শান্তনুর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত প্রথম পুত্র চিত্রাঙ্গদ মারা যাবার পর থেকে ভীষ্মও বুঝি যথেষ্ট আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
এই আতঙ্ক ছিল অনেকটাই এক পুত্রনিষ্ঠ আধুনিক পিতামাতার মতোই। এখনকার দিনে বহুত্র যেমন দেখতে পাই–পিতামাতা সন্তানের গায়ে সামান্য আঁচড়টি পর্যন্ত লাগতে দেন না, সংসারের যাবতীয় সাধারণ–অসাধারণ কর্মে নবযুবক পুত্রটিকেও যেমন করে পিতামাতা বাঁচিয়ে চলেন, ভীষ্মও সেইভাবেই একান্তভাবেই বিচিত্রবীর্যকে লালন করেছেন। নইলে, যে স্বয়ম্বর সভায় একান্তভাবেই বিচিত্রবীর্যের গমন প্রার্থনীয় ছিল, যেখানে হস্তিনাপুরের নবযৌবনোদ্ধত রাজা আপন শক্তির প্রথম পরিমাপটুকু করতে পারতেন। সেখানে ভীষ্ম নিজে গিয়ে নিজের বিপদ যেমন ঘটালেন, তেমনই কুমার বিচিত্রবীর্যকেও কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ না দিয়ে অন্য এক ধরনের বিপত্তি ঘটালেন বলে আমরা মনে করি।
এখনকার দিনের সংসারে একেকটি স্নেহাস্পদ পুত্রকে দেখলে যেমন মনে হয়–এ কিছুই করতে পারবে না, এ বড় নরম, বড় লাজুক’, সংসারের সবচেয়ে ভাল জিনিসটি শুধু এরই প্রাপ্য, হস্তিনাপুরের রাজা বিচিত্রবীর্যকে দেখলেও আমাদের সেইরকম মনে হয়। মহাভারতের কবি একবার মাত্র হস্তিনাপুরের রাজবংশের মাহাত্ম্য খ্যাপন করে বলেছিলেন-বিচিত্রবীর্যের পিতা শান্তনু যেভাবে রাজ্য শাসন করতেন, কুমার বিচিত্রবীর্যের শাসন সেরকম তো ছিলই, বরং বলা উচিত, বিচিত্রবীর্য আপন গুণে পিতাকেও অতিক্রম করেছিলেন–অচিরেণৈব। কালেন সো’ত্যক্রামরাধিপঃ।
মহাকাব্যের কবির কাছে বিচিত্রবীর্যের এই খ্যাতি ‘রুটিন’ মাত্র। আমরা জানি–মহাকাব্যের কবির এই অতিবাদ মহাকাব্যের পরিমণ্ডলে নিতান্তই বর্ণনা। কারণ একটি শ্লোকেই বিচিত্রবীর্যের স্বতিরচনা সেরে কবি কিন্তু ভীষ্মের প্রসঙ্গে চলে গেছেন। বাস্তব ক্ষেত্রে পিতা শান্তনুকে গুণে যদি কেউ অতিক্রম করে থাকেন, তিনি গাঙ্গেয় ভীষ্ম শান্তনুর ক্ষেত্রেও রাজ্য শাসনের বা রাজধর্মের যত না গুণ ছিল, তার চেয়েও বেশি ছিল সাংসারিক ভোগ-লালসা। একে কামুকতা বলার সমস্যা আছে, কারণ মাতৃসম্বন্ধে শান্তনু মহাভারতের কবির পিতা। কিন্তু পিতার কামুকতা পুত্রের মধ্যে কীভাবে সঞ্চারিত হয়েছিল মহাভারতের কবি পিতার কামুকতার কথা স্পষ্টত না বললেও-ওই একটিমাত্র শ্লোকে বিচিত্রবীর্যের স্তুতি রচনা সাঙ্গ করার পর কবি বেশ খানিকক্ষণ শুধু ভীষ্মের অনন্ত কর্মরাশি বর্ণনা করে গেলেন; আর তার পরেই বিচিত্রবীর্য অম্বিকা আর অম্বালিকার পাণিগ্রহণ করা মাত্রই–তয়োঃ পাণী গৃহীত্ব তু–ভয়ঙ্করভাবে কামাসক্ত হয়ে পড়লেন-কামাত্মা সমপদ্যত।
