অকৃতব্রণ পরশুরামকে নানা কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ভীষ্মের সঙ্গে পরশুরামের যুদ্ধের সম্ভাবনাটাই চেতিয়ে তুললেন। কিন্তু ব্যাপারটা এঁরা যত সহজ ভাবছেন, তত সহজ যে নয়, সেটা পরশুরাম ভাল করেই জানেন। নিজে প্রখ্যাত অস্ত্রবিদ বলেই ভীষ্মের সঙ্গে লড়াইটা কী রকম হবে, সেটা পরশুরাম ভাল করেই জানেন। সেই কারণেই অকৃতন্ত্রণের চেতিয়ে ভোলা ভাষায় উদৃপ্ত হয়ে পরশুরাম একটা প্রতিজ্ঞা উচ্চারণ করে বললেন-কথা না শুনলে আমি ভীষ্মকে মৃত্যুদণ্ড দেব ঠিকই কিন্তু তবু আমায় দেখতে হবে যাতে ভাল কথায় কাজ হয়–তথৈব চ করিষ্যামি যথা সামৈব ল্যতে। অর্থাৎ ভাল কথায় কাজ করাটাই পরশুরামের প্রথম ইচ্ছে।
শৈখাবত্যের আশ্রমে থাকা ব্রহ্মর্ষি মুনিদের নিয়ে এবং স্বয়ং অম্বাকে নিয়ে পরশুরাম কুরুক্ষেত্রে এসে উপস্থিত হলেন–কুরুক্ষেত্ৰং মহারাজ কন্যয়া সহ ভারত। পরশুরাম প্রথমে ভীষ্মের কাছে একটি দূত পাঠালেন। খবর দিলেন-আমি এসেছি–প্রাপ্তোস্মি। খবর শুনে। ভীষ্ম হস্তিনাপুরের ব্রাহ্মণ-পুরোহিত এবং একটি দুধেল গাই নিয়ে পরশুরামের সামনে উপস্থিত হলেন। ভীষ্ম প্রণাম করে দাঁড়াতেই পরশুরাম বললেন–ভীষ্ম! এ তোমার কেমন ব্যবহার? তুমি নিজে যখন বিয়ে করবে না, তখন কেনই বা এই মেয়েটিকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলে, আর কেনই বা তাকে ত্যাগ করলে? তুমি জান–তুমি কী করেছ? মেয়েটার কোনও দুর্নাম ছিল না, অথচ তুমি তার সর্বনাশ, ধর্মনাশ–সবই করেছ–বিভ্রংশিতা ত্বয়া হীয়ং ধর্মাদাস্তে যশস্বিনী। তুমি একে স্পর্শ করেছিলে বলে এখন শারাজা একে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
পরশুরাম একেবারে ঠিক ‘পয়েন্টে’ আঘাত করেছেন। ভীষ্মের দিক থেকে ওই একটাই ছেলেমানুষি হয়েছে। তিনি নিজে বিয়ে করবেন না, অথচ কন্যা হরণ করেছেন। পরশুরাম তাই সেই যুক্তিতেই তাকে বললেন-তুমি এক্ষুনি আমার আদেশে এই কন্যাকে গ্রহণ করো, যাতে এই রাজপুত্রী নারী-জীবনের সমস্ত সম্ভাবনা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে–তস্মাদিমাং মন্নিয়োগাৎ প্রতিগৃহ্নীষ ভারত। ভীষ্ম সরলভাবে বললেন–আমি এই রমণীকে আর আমার ভাইয়ের হাতে তুলে দিতে পারব না। ভীষ্ম নিজের যুক্তি দেখিয়ে বললেন–শারাজার কথা বলতেই আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছি। এখন সব জেনেশুনে কীভাবে এক পরানুরক্তা রমণীকে আমাদের ঘরে নিয়ে তুলতে পারি?
পরশুরাম যুদ্ধের ভয় দেখালেন, হত্যার ভয় দেখালেন, কিন্তু ভীষ্ম নিজের যুক্তি থেকে একটুও সরলেন না। পরশুরামও নরমে-গরমে ভীষ্মকে বোঝনোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু কোনও ফল হল না। আস্তে আস্তে গুরু-শিষ্যের যুদ্ধের সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠল। পরশুরাম যুদ্ধের ভয় দেখালে ভীষ্ম একটু রেগেই গেলেন। বললেন–আপনাকে এতকাল আমি শুরু বলে মেনেছি, কিন্তু এখন আর আপনি আমার সঙ্গে গুরুর মতো ব্যবহার করছেন না, অতএব আপনার সঙ্গেই যুদ্ধ করব–গুরুবৃত্তিং ন জানীযে তস্মাদ যোৎস্যামি বৈ ত্বয়া।
পরশুরাম জন্মগতভাবে ব্রাহ্মণ অথচ তিনি ক্ষত্রিয়ের বৃত্তি, যুদ্ধকার্য করেন। যুদ্ধ যে তাকে ব্রাহ্মণত্ব থেকে চ্যুত করেছে–এই কথাও বলতে দ্বিধা বোধ করলেন না ভীষ্ম। পরিশেষে বেশ একটু মেজাজ নিয়েই ভীষ্ম বললেন–আপনি বহু বছর ধরে যত্রতত্র বলে বেড়াচ্ছেন যে, আপনি সমস্ত ক্ষত্রিয়কে জয় করেছেন। আপনি মনে রাখবেন আপনার ওই ক্ষত্রিয়-নিধন কালে ভীষ্মের মতো ক্ষত্রিয় পুরুষ জন্মায়নি-ন তদা জাতবান ভীষ্মঃ ক্ষত্রিয়ো বাপি মদ্বিধঃ-ফলে ঘাসের ওপর যেমন আগুন জ্বলে, তেমনই তৃণোপম ক্ষত্রিয়দের ওপরে আপনি আপনার তেজ দেখিয়েছেন। কিন্তু আজকে আপনি বুঝবেন ক্ষত্রিয়ের সঙ্গে যুদ্ধ কাকে বলে। আপনার সারা জীবনের যুদ্ধের অভিলাষ আমি আজকেই ঘুচিয়ে দেব-ব্যপনেষ্যামি তে দর্পং যুদ্ধে রাম ন সংশয়ঃ। আপনি কুরুক্ষেত্রের সমন্তপঞ্চকে গিয়ে দাঁড়ান। আমি সেখানেই আসছি–তত্ৰৈষ্যামি মহাবাহো যুদ্ধায় ত্বং তপোধন।
যুদ্ধের আগে আত্মশ্লাঘা করাটা যুদ্ধেরই অঙ্গ। এতে পরপক্ষের মানসিক চাপ বাড়ে। ভীষ্মও তাই করলেন। পরশুরামের সঙ্গে ভীষ্মের এই যুদ্ধ চলেছিল বহুদিন ধরে। মহাভারতে অন্তত আট অধ্যায় জুড়ে এই যুদ্ধের বিশদ বর্ণনা আছে। ভীষ্ম নিজমুখে এই যুদ্ধের বর্ণনা দিয়েছেন এবং বর্ণনা অত্যন্ত নিরপেক্ষ। সেখানে কখনও ভীষ্মের দেহ পরশুরামের অস্ত্রাঘাতে ক্ষতবিক্ষত, কখনও বা পরশুরাম ভীষ্মের মারণাস্ত্রে প্রায় ধরাশায়ী। শুভার্থী মানুষেরা শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ বন্ধ করেছিলেন এবং দুজনকেই যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধটা শেষ হয়েছিল এমন একটা করুণ সুরে, যার অর্থ ছিল একটাই–পরশুরাম যুদ্ধে হেরে যাচ্ছেন।
সেকালের অত বড় বীর, পৃথিবী নিঃক্ষত্রিয় করেছিলেন একুশবার, সেই পরশুরামও নিজের এলেম বোঝেন যথেষ্ট। যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত হয়ে ভীষ্ম সবিনয়ে গুরু পরশুরামের চরণ বন্দনা করলেন। পরশুরাম আপন শিষ্যের মাহাত্মে পরম গর্বিত হয়ে বললেন–পৃথিবীতে তোমার মতো ক্ষত্রিয় বীর আর দ্বিতীয়টি নেই–বৎসমো নাস্তি লোকেস্মিন ক্ষত্রিয়ঃ পৃথিবীচরঃ। তুমি এখন ফিরে যেতে পার। আমি পরম সন্তুষ্ট হয়েছি। ভীষ্মকে একথা বলেই পরশুরাম অম্বাকে জানালেন–আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে যুদ্ধ করেও আমি কী করতে পেরেছি, তা সকলেই এখানে দেখেছেন–প্রত্যক্ষমত-লোকানাং–আমি ভীষ্মকে জয় করতে পারিনি। শক্তি বল, ক্ষমতা বল, আমার সামর্থ্য এইটুকুই। আমার আর কিছুই করার নেই, ভদ্রে। পরশুরাম সম্পূর্ণ স্বীকারোক্তি করে নিজের অক্ষমতা জ্ঞাপন করলেন এবং শেষ পরামর্শ হিসেবে অম্বাকে বললেন–আমার কথা যদি শোন, তবে তুমি ভীষ্মেরই শরণাপন্ন হও, তিনিই তোমার পরমা গতি–ভীষ্মমেব প্রপদ্যস্ব ন তে’ন্যা বিদ্যতে গতিঃ।
