মহাভারতের বর্ণনানিপুণ কবি বিচিত্রবীর্যের অনন্ত কামনার প্রতিপদ-বৰ্ণনার মধ্যে যাননি। পরিবর্তে তিনি অম্বিকা এবং অম্বালিকার রূপ-বর্ণনা করে দিয়েছেন একটি মাত্র শ্লোকে। বুঝিয়ে দিয়েছেন–কামনার এতাদৃশ আধার পাবার ফলেই বিচিত্রবীর্য সব কিছু বাদ দিয়ে শুধু তাঁর দুটি স্ত্রী নিয়েই দিন-রাত যাপন করতে লাগলেন। অম্বিকা এবং অম্বালিকার অপূর্ব রূপের মধ্যে কুঞ্চিত কেশ, রক্ত-তুজ-নখ অখবা পীনশ্রোণীপয়োধরের সৌন্দর্য আমাদের কাছে খুব বড় কথা নয়। আমাদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ কথা হল–এরা দুই বোনই–অম্বিকা এবং অম্বালিকা–দুজনেই কালো ছিলেন–তে চাপি বৃহতীশ্যামে নীলকুঞ্চিতমূর্ধজে।
লক্ষ্য করে দেখবেন–শান্তনু-পত্নী সত্যবতীর গায়ের রঙও কালো ছিল; এতটাই কালো ছিল যে তার ডাক নামও ছিল কালী। তার উত্তর-বংশে যে দুটি মেয়ে কাশী রাজ্য থেকে এলেন, তাদের গায়ের রঙও কালো। কিন্তু এই কালো রঙের সঙ্গে অম্বিকা এবং অম্বালিকার স্তন-জঘনের সৌন্দর্য কুমার বিচিত্রবীর্যকে পাগল করে তুলল। সুরূপা এবং যৌবনবতী কৃষ্ণা রমণীদের ক্ষমতা এবং স্বভাবই বুঝি এইরকম। শেকস্পীয়রের ব্ল্যাক লেডি’র কথাই বা এখানে অনুল্লিখিত থাকে কেন? যাই হোক বিচিত্রবীর্য নিজেও দেখতে ভাল ছিলেন এবং আপন সৌন্দর্য সম্বন্ধে তার সচেতনতাও ছিল–রূপযৌবনগর্বিতঃ। অন্যদিকে অম্বিকা এবং অম্বালিকাও এমন সুন্দর স্বামী লাভ করে স্বামীর সমস্ত কামনা পূরণ করতে লাগলেন তার চাহিদা মতো।
এই চাহিদা সামান্য ছিল না। আগেই বলেছি–রাজপরিবারের সমস্ত সারভাগ পেতে পেতে বিচিত্রবীর্যের এমনই অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল, যে দুটি রমণীরত্ন লাভ করামাত্রই তিনি উপলব্ধি করলেন–যেন যথাসাধ্য কাম উপভোগ করার জন্যই তাঁর জন্ম এবং জীবন। রাজকার্য নেই, প্রজাপালন নেই, ধর্মাধর্ম নেই, সময়-অসময় নেই, বিচিত্রবীর্য স্ত্রীসম্ভোগ করে যাচ্ছেন। সাত সাতটি বছর এই ক্রমান্বয়ী ভোগেই কাটিয়ে দিলেন বিচিত্রবীর্য-তাভ্যাং সহ সমাঃ সপ্ত বিহর পৃথিবীপতিঃ।
এই সম্ভোগের ফল খুব একটা ভাল হল না। বাড়িতে যদি আশি-নব্বই বছরের বৃদ্ধ সক্ষম অবস্থায় থাকেন, তবে তাদের জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে-এই অতিরিক্ত স্ত্রীসম্ভোগের ফল কী? আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগেও বিবাহিত দম্পতির একতর পুরুষ মানুষটির যদি টিবি হত, তাহলে বয়স্ক জনেরা মনে মনে সন্দেহ করতেন যে, ওই রোগ অতিরিক্ত স্ত্রী-সম্ভোগের ফল।
আজকের দিনের ডাক্তাররা পুরুষের অতিরিক্ত ধাতুক্ষয়কে কোনও বৃহৎ উপসর্গ মনে করেন না, কিন্তু সেকালের কবিরাজ এবং বৈদ্যজনেরা অতিরিক্ত ধাতুক্ষয়কে যক্ষ্মারোগের অন্যতম কারণ বলে মনে করতেন। আমাদের ধারণ<সেকালের দিনের বয়স্কজন এবং কবিরাজ গোষ্ঠীর এই সিদ্ধান্ত প্রধানত বিচিত্রবীর্যের উদাহরণ থেকেই প্রণোদিত হয়েছিল কি না কে জানে।
অবশ্য কেউ মনে করুন আর নাই করুন, মহাভারতের কবির ধারণা–সাত বছর ধরে অতিরিক্ত স্ত্রীসম্ভোগ করার ফলে বিচিত্রবীর্যের তরুণ বয়সেই যক্ষ্মা ধরে গেল বিচিত্রবীর্যস্তরুণো যক্ষ্মণা সমপদ্যত। আমদের পূর্বকালের বৃদ্ধরাও যে অতিরিক্ত স্ত্রীসম্ভোগকেই যক্ষ্মারোগের অন্যতম কারণ মনে করতেন, তার ছায়া পাওয়া যাবে হরিদাসের টীকায়। তিনি বলেছেন–বিচিত্রবীর্যের যক্ষ্মা হল। কেন? কারণ অতিরিক্ত শুক্রক্ষয়–শুক্রক্ষয়নিবন্ধনেন যক্ষ্মারোগেণ। আমরা পূর্বে আরও একবার এই যক্ষ্মারোগের কথা বলেছি–চন্দ্রবংশের মূল পুরুষ চন্দ্রের যক্ষ্মারোগ হওয়ার প্রসঙ্গে।
যাই হোক বিচিত্রবীর্য যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হলেন আর হস্তিনাপুরের যত বৈদ্য-চিকিৎসক, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সকলে তার রোগ উপশমের জন্য চেষ্টা করতে লাগলেন। কিছুতেই কিছু হল না অবশ্য। সূর্য যখন অস্তে যায়, যখন যেমন শত চেষ্টা করলেও তাকে ধরে রাখা যায় না, বিচিত্রবীর্যও তেমনই বৈদ্য-চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা বিফল করে দিয়ে মারা গেলেন–জগামাস্তম্ ইবাদিত্যঃ কৌরবব্যা যমস্যাদন।
বিচিত্রবীর্য মারা গেলেন। কিন্তু মারা যাবার আগের সেই সাতটি বছর, যখন তিনি স্ত্রীসম্ভোগে মত্ত ছিলেন, তখন মহামতি ভীষ্মের কী দশা গেছে? প্রথমে তো সেই অম্বার তাড়নায় পরশুরামের সঙ্গে যুদ্ধ হল। সেই যুদ্ধের আগে পরে এবং যুদ্ধের সময়টুকু ধরে ভীষ্ম যে ঘরে বাইরে কোথাও স্বস্তি পাননি, সে কথা বলাই বাহুল্য। মহাভারতের মধ্যে যাঁরা ভার্গব। প্রক্ষেপের কথা বলেন, তাঁদের মতে পরশুরামের সঙ্গে ভীষ্মের যুদ্ধটা অন্য দিক দিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। মহাভারতের এই অংশ তাদের মতে অবশ্যই প্রক্ষিপ্ত এবং এখানে যেহেতু ভৃগুবংশীয় ভার্গব পরশুরামের সঙ্গে ভীষ্মের যুদ্ধ শেষ হয়েছে ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের মিলনের তাৎপর্য নিয়ে, তাই মহাভারতের এই অংশে ভাগবদের গুরুত্ব একভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েইছে। মহামতি ভীষ্ম যুদ্ধ করার পরে ভার্গব পরশুরামের চরণ বন্দনা করে এই গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে। দিয়েছেন।
তর্কের খাতিরে এখানে প্রক্ষেপের আলোচনা বাদ দিয়ে যদি মহাভারতে যা আছে তাই সত্য বলে ধরে নিই, তাহলে পরশুরামের সঙ্গে যুদ্ধকালীন সময়টুকু ভীষ্মের দিক থেকে খুব আরাম এবং রক্তচাপহীন অবস্থায় যে কাটেনি, তা অনুমান করা যেতে পারে। মনে রাখা দরকার, পরশুরাম ক্ষত্রিয়-শাস্তা এক বীর হিসেবে প্রতীকীভাবেই সর্বত্র ব্যবহৃত হয়েছেন। নইলে রামচন্দ্রের আমলে যে পরশুরাম বেঁচে ছিলেন, সেই পরশুরাম এখনও বেঁচে আছেন, এমন অলৌকিক ভাবনার কোনও লৌকিক ভিত্তি নেই। বরং লৌকিকতার তাৎপর্যে পরশুরামকে একটা ইনস্টিটিউশন হিসেবেই ধরা উচিত। বংশ-পরম্পরাতেই হোক অথবা শিষ্য পরস্পরাতেই হোক, ভার্গব পরশুরামেরা ক্ষত্রিয় বীরদের বিরুদ্ধ-ভূমিতে থাকতেন শাস্তা হিসেবে। অম্বা এমনই কোনও এক পরশুরামের শরণাপন্ন হয়েছিলেন ভীষ্মকে শাস্তি দেবার জন্য। ভীষ্মের শাস্তি হয়নি বটে, কিন্তু তাঁকে যুদ্ধের কষ্ট অবশ্যই ভোগ করতে হয়েছে। শেষে পরশুরাম ভীষ্মের ওপর প্রসন্ন হয়ে চলে গেছেন।
