একে তো বন্ধু হোত্ৰবাহনের নাতনি, তাতে আবার তিনি কাঁদছেন। পরশুরাম বিনা দ্বিধায় কথা দিলেন–তুমি যেমন এই সৃঞ্জয় হোত্রবাহনের নাতনি তেমনই আমারও নাতনি। তুমি বলো–কী করতে হবে তোমার জন্য। যা বলবে তাই করব-ব্রহ যত্তে মনোদুঃখং করিয্যে বচনং তব। অম্বা বললেন–আমি আপনার শরণ নিয়েছি, আপনি যা ভাল মনে হয় করুন। স্নেহের নাতনিটির মতো হলেও অম্বার শরীরের দিকে এবার পরশুরামের নজর পড়ল। দেখলেন–অম্বা অতিশয় সুন্দরী এবং নবযৌবনবতী। এমন রূপ দেখে–তস্যা দৃষ্টা রূপঞ্চ বপুশ্চাভিনবং পুনঃপরশুরাম করুণায় বিগলিত হলেন। ভাবলেন–এই ভরা যৌবনে মেয়েটা কী দুঃখটাই বা না জানি পেয়েছে–রামঃ কৃপয়াভিপরিপ্লুতঃ। পরশুরাম অম্বার জীবনকাহিনী শুনতে চাইলেন তারই মুখে।
এক এক করে সেই স্বয়ম্বরসভা থেকে শাল্বরাজের প্রত্যাখ্যান পর্যন্ত একই কথা আবারও শোনালেন অম্বা। পরশুরাম সমস্ত ব্যাপারটা সহজ করে দিয়ে বললেন–আমি এক্ষুনি কুরুশ্রেষ্ঠ ভীষ্মের কাছে সংবাদ পাঠাচ্ছি। তিনি নিশ্চয় আমার কথা শুনবেন। আর যদি না শোনেন তো আমি নিশ্চয়ই যুদ্ধ করব ভীষ্মের সঙ্গে। আমার অস্ত্রের তেজে তাকে দন্ধ করে ছাড়ব। ভীষ্মের কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে পরশুরাম শাল্বরাজের প্রসঙ্গটাও টেনে আনলেন। বললেন-তোমার। যদি ভীষ্মের ব্যাপারে এই প্রতিশোধস্পৃহা না থাকে, তবে শাশ্বরাজার কথাটাও জানাও। আমি তাকেও তোমার ইচ্ছামতে বাধ্য করতে পারি–যাবচ্ছাপতিং বীরং যোজয়াম্যত্র কর্মণি। অম্বা সত্যি কথাই বললেন আবার। বললেন–শারাজার প্রতি আমার অনুরক্তি জেনেই ভীষ্ম ছেড়ে দিয়েছেন আমাকে। কিন্তু শাল্বকে আমি এমনভাবেই অনুরোধ করেছিলাম, যে অনুরোধ আমার ঘরানার কোনও মেয়ের করার কথা নয়। কিন্তু তিনি আমার চরিত্রের ব্যাপারে আশঙ্কা করেছেন এবং সে আশঙ্কার কারণ ভীষ্ম। তিনি আমাকে জোর করে রথে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং আমি যেন কেমন বশীভূত হয়ে পড়েছিলাম–যেনাহং বশমানীতা সমুৎক্ষিপ বলাত্তদা–তিনি জোর করেই আমাকে নিজের করায়ত্ত করেছিলেন।
‘বশীভূত’ হবার কোনও কারণ বলেননি অম্বা। কেমন করে অথবা কী রকম এই বশীকরণ, তাও তিনি ভাল করে বলেননি। আমরাও তা ভাল করে বুঝি না বলেই অনুমানের জায়গাটা আরও প্রশস্ত হয়ে যায়। ভীষ্ম জোর করে নিজের অধিকারে স্থাপন করেন অম্বাকে–যেনাহং বশমানীত–বশীকরণ শব্দের অর্থ যদি এই দাঁড়ায়, তবে সে অম্বারই ইচ্ছাকৃত-রথে ওঠবার সময়েও তাই, এখনও তাই। পাঞ্চাল হোত্রবাহন, অকৃতব্রণ–সবার যুক্তি মেনে এই মুহূর্তে পরশুরামের সামনে নিজের দুর্ভাগের জন্য ভীষ্মকেই যে শেষ পর্যন্ত এককভাবে দায়ী করলেন অম্বা, তার পিছনে আছে প্রখর বাস্তব। পরশুরামের কাছে অম্বা বললেন–আপনি ভীষ্মকেই মারুন, তিনি আমার সমস্ত দুঃখের মূলভীষ্মং জহি মহাবাহো যকৃতে দুঃখমীদৃশ।
এতক্ষণ কিন্তু ভীষ্মের দোষ দেখতে পাননি অশ্ব। সেই নির্দোষ মানুষটিই এখন তার চোখে সম্পূর্ণ দোষী সাব্যস্ত হলেন। ঘটনাটা নিতান্তই অদ্ভুত। মনে রাখতে হবে–সমস্ত ঘটনার রাশ এখন পরশুরামের হাতে চলে গেছে। তার মতো অস্ত্রযোদ্ধা ভূমণ্ডলে দ্বিতীয় কেউ নেই। অম্বা বুঝলেন–এখন তিনি যার কথা বলবেন তার মৃত্যু অবধারিত। এতক্ষণ তিনি যেভাবে কথা বলেছেন, তাতে ভীষ্মকে কখনই তিনি দোষী সাব্যস্ত করেননি। শাল্বরাজের ওপরেই তার রাগ ছিল বেশি। কিন্তু হোত্ৰবাহন, অকৃতব্রণ–এঁদের প্ররোচনায় অস্থার মত খানিকটা বদলেছে, আর সেই সঙ্গে আছে প্রখর বাস্তব। পরশুরামের হাতে পড়লে যত বড় যুদ্ধবাজই হোন, তিনি মারা যাবেন। অম্বা শাল্বরাজকে ভালবেসেছিলেন। তার শেষের ব্যবহার অম্বার কাছে ভীষণ অপ্রিয় হলেও তিনি পুরাতন প্রেমিককে মেরে ফেলার ইচ্ছে প্রকাশ করতে পারেন না। সেটা ভাল লাগে না, ভাল দেখায়ও না। সৃঞ্জয় হোত্ৰবাহন কিংবা অকৃতব্রণ-এই দুজনেই অম্বার পুরাতন প্রেমের কথা ভেবেই ভীষ্মকে দায়ী করেছেন। অম্বাও শেষ পর্যন্ত তাই করলেন। পরশুরামকে তিনি শেষ সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন–আপনি আমার দুঃখ দূর করুন, ভগব। মারুন ওই ভীষ্মকে–ত ভীষ্মপ্রসূতং মে তং জহীশ্বর মা চিরম্।
কাশীরাজকন্যার প্রস্তাবটা তার নিজের মুখে এতক্ষণ শোনেননি পরশুরাম। কিন্তু শোনার পর তার একটু দোনামোনাই হল যেন। দেবব্রত ভীষ্ম পরশুরামের পরম প্রিয় অস্ত্রশিষ্য। তার সঙ্গে যুদ্ধ করা বা তাকে বধ করা–কোনওটাই পরশুরামের পরম ঈঙ্গিত ছিল না। পরশুরাম সেইভাবেই একটা ইঙ্গিতও দিলেন। বললেন–রাজকন্যে! আরও একবার ভেবে বলো। ভীষ্ম তোমার পূজনীয় হলেও আমি যদি একবার তাকে বলি, তবে তিনি তোমার পা দুটো মাথায় বয়ে নিয়ে যাবেন-শিরসা বন্দনাৰ্হোপি গ্রহীষ্যতি গিরা মম।
অম্বা মানলেন না। রমণীর প্রতিহত প্রেম এখন ধ্বংসের রূপ ধারণ করেছে। তিনি বললেন–আপনি যদি আমার তুষ্টির কথা চিন্তা করেন, তবে ভীষ্মকে মেরে ফেলতেই হবে–জহি ভীষ্মং রণে রাম মম চেদিচ্ছসি প্রিয়তাছাড়া আপনি না আমাকে কথা দিয়েছিলেন। অতএব এই হচ্ছে সেই সময়। আপনি আপনার প্রতিজ্ঞা পালন করুন। অম্বার কথা শুনে পরশুরামের সহচর অকৃতব্রণ বললেন–মেয়েটা আপনার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে আছে, মুনিবর! ওকে আপনার ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়-কন্যাং ন ত্যমহসি। আপনি ভীষ্মকে মারুন তো। আর তা না হলে, হয় সে আপনার কথা মেনে নিক, নয় তো সে এসে বলুক যে, সে আগেই পরাজয় স্বীকার করে নিচ্ছে আপনার কাছে নির্জিতা’শ্মীতি বা ব্রুয়াৎ কুৰ্য্যাদ বা বচনং তব।
