পরশুরামের শিষ্য অকৃতব্রণ অম্বার মুখে ভীষ্মের নির্দোষ আচরণের কথা এই মুহূর্তে শুনলেও তিনি পূর্বাহ্নেই হোত্ৰবাহনের কথায় প্রভাবিত হয়েই রয়েছেন। হোত্ৰবাহন তাকে বলেছিলেন–আমার এই নাতনিটি এখন নিজের দুঃখের জন্য ভীষ্মকেই দায়ী করছে। কিন্তু অম্বা যে অকৃতব্রণকে তা বলেননি। ভীষ্ম না শা, অথবা দুজনেই শাস্তি পাবার যোগ–এই বিচারের ভার যখন অকৃতব্রণের ওপর পড়ল, তখন তিনি কিন্তু মত দিলেন হোত্ৰবাহনের কথা অনুসারেই। তিনি যুক্তি দিয়ে বললেন-বৎসে! ন্যায় এবং ধর্মের প্রতি দৃষ্টি রেখে তুমি যা বলেছ, বেশ বলেছ–উপপন্নমিদং ভদ্রে। কিন্তু আমার কথা যদি শোন তবে আমি বলব–ভীষ্মই এখানে মূল দোষী। তিনি যদি তোমাকে হস্তিনায় নিয়ে না যেতেন,–যদি ত্বামাপগেয়ো বৈ ন নয়ে গজসাহয়–তাহলে পূর্ব রামের আদেশে শাল্বরাজ এখনই তোমাকে মাথায় করে নিয়ে যেতেন–শাশ্বত্ত্বাং শিবৗ ভীরু গৃহীয়াদ্রামচোদিত।
আমরা বলি–এই ‘যদি’র যুক্তিটা নিতান্তই ভুল। ভীষ্ম যদি অম্বাকে হস্তিনায় না নিয়ে যেতেন, তাহলে শাল্বরাজ এমনিই তাঁকে মাথায় নিয়ে নাচতেন, তার জন্য পরশুরামের আদেশের কোনও প্রয়োজন হত না। ভীষ্ম অম্বাকে রথে চড়িয়ে নিয়ে গেছেন সমস্ত রাজাদের পরাজিত করে, অতএব শাল্বরাজের সন্দেহ হয়েছে অম্বার ওপরেই-সংশয়ঃ শাহুরাজস্য তেন ইয়ি সুমধ্যমে।
কারণ যদি শুধু এইটুকুই হত তাহলেও বুঝতাম অকৃতব্রণর ন্যায়ের যুক্তিতে সরলতা আছে। কিন্তু এর পরে তিনি যা বললেন, সেটা শুধু অন্যায়ই নয়, তার পিছনে রীতিমতো উদ্দেশ্য খুঁজে বার করা যায়। অকৃতব্রণ বললেন–সবচেয়ে বড় কথা, ভীষ্ম নিজের পৌরুষ এবং বীরত্ব সম্বন্ধে বড় বেশি আত্মসচেতন এবং সে যে সমস্ত রাজাদের যুদ্ধে জয় করেছে–এই নিয়েও তার গর্ব আছে যথেষ্ট–ভীষ্ম পুরুষমানী চ জিতকাশী তথৈব চ।
এক সুন্দরী রমণীর বীরপূজার বিস্ময়কে ক্রোধে রূপান্তরিত করার জন্য এই যথেষ্ট। ভীষ্মের যুদ্ধ-নৈপুণ্য দেখে যে রমণী শাল্বরাজের ভাষায় প্রীতিমতী’ হয়েছিলেন, অকৃতব্রণর কথা শুনে সেই রমণীই এখন বোধহয় পুরনো কথা ভাবতে বসলেন। সত্যিই তো, ভীষ্ম ভীষণ অহংকারী মানুষ। স্বয়ম্বর-সভায় উপস্থিত সমস্ত রাজাকে তিনি যুদ্ধাহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন–আমি এই মেয়েদের নিয়ে যাচ্ছি, ক্ষমতা থাকে তো আটকান। সত্যিই তো, এ যে ভীষণ অহংকারের কথা। তারপর শাল্বরাজকে যুদ্ধে হারিয়ে দিয়ে তিনি হস্তিনায় ফিরলেন। একবার ফিরেও তাকালেন না পরাজিত শত্রু সৌভপতি শান্তের দিকে, তার প্রিয়তম বীরের দিকে। আর শাল্বরাজও পষ্টাপষ্টি স্বীকার করেছেন যে, তিনি শুধু ভীষ্মের ভয়েই অম্বাকে ফিরিয়ে নিতে পারছেন না। সত্যিই তো এত ক্ষমতা, এত অহংকার এই লোকটার যে, শুধু একবার তাকে রথে তুলে নিয়েছিলেন বলে তাঁর প্রিয়তম ব্যক্তিটি পর্যন্ত তাকে অস্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। অতএব এ দোষ তো তার নয়, দোষ ভীষ্মেরই। রাজর্ষি হোত্ৰবাহনের প্ররোচনায় এবং অকৃতব্রণের সমর্থনে অম্বা ভীষ্মকে তাঁর দুরবস্থার জন্য সম্পূর্ণ দায়ী করার যুক্তি খুঁজে পেলেন।
অম্বা অকৃতব্রণকে বললেন–মনে মনে আমারও এইরকমই অভিলাষ-হৃদি কামোভিবর্ততে–ইচ্ছে হয়, ওই ভীষ্মটাকে যদি যুদ্ধে বধ করা যেত কোনওভাবে–ঘাতয়েয়ং যদি রণে ভীষ্মমত্যেব নিত্যদা! এইরকম সম্পূর্ণ নিশ্চিত সিদ্ধান্তের পরেও কিন্তু অম্বার মনে সংশয় থেকে গেছে। বারবার মনে হয়েছে লোটার সত্যিই তো দোষ নেই কোনও। তিনি তো কিচ্ছুটি জানতেন না। শাল্বরাজের কথা শোনামাত্র তাকে ছেড়ে দিয়েছেন। আর যুদ্ধজয়! তার শক্তি যে সকলের চাইতে বেশি, এও কি কোনও দোষ হতে পারে? অতএব অকৃতব্রণর প্ররোচনায় সম্পূর্ণ আপ্লুত হয়েও অম্বা কিন্তু শেষবারের মতো বললেন–আমি যে যে লোকের। জন্য এই সঙ্কটে পড়েছি, সে তিনি ভীষ্মই হোন অথবা শা–ভীষ্মং বা শারাজং বা–যাঁকে আপনি দোষী মনে করেন, এমনকি দুজনকেই যদি দোষী মনে করেন, তবে তাদের শাসন করার ব্যবস্থা করুন। অর্থাৎ নির্দোষ ভীষ্ম পড়ে পড়ে মার খাবেন, আর শাল্বরাজ তাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা সত্ত্বেও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখবেন–সেটা অম্বার খুব একটা পছন্দ হল না। মার খাওয়াতে হলে তিনি দুজনকেই মার খাওয়াতে চান–ভীষ্মং বা শাল্বরাজং বা।
কিন্তু তিনি যা চান, তা হল না। কারণ সেই রাতটুকু কাটল, তারপর দিনটুকু কাটতেই স্বয়ং পরশুরাম এসে গেলেন শৈখাবত্যের আশ্রমে। আগুনের মতো পরশুরামের তেজ-প্রজুলম্নিব তেজসা। মাথায় মুনিসুলভ জটাভার, কাঁধে ধনুক। এক হাতে বঙ্গ, আরেক হাতে পরশু। দেখলে বেশ ভয় করে। পরশুরাম এসেই সঞ্জয় হোত্ৰবাহনের কাছে গেলেন। আশ্রমের সমস্ত মুনি, হোত্রবাহন স্বয়ং এবং অম্বা–সকলে মিলে সাদর অভিনন্দন জানালেন পরশুরামকে। হোত্ৰবাহনের সঙ্গে পরশুরামের অনেক কথা হল–অনেক পুরনো কথা, সুখ-দুঃখের কথা, পরিচিত পুরাতন দ্বৈত অভিজ্ঞতার কথা। সব কথার শেষে পরশুরাম এবং হোত্রবাহনের বন্ধুত্ব যখন নতুন সরসতায় ভরে উঠল তখনই হোত্ৰবাহন নিজের কথাটা আস্তে আস্তে পাড়লেন।
হোত্ৰবাহন অম্বাকে দেখিয়ে পরশুরামকে বললেন–এইটি আমার বড় আদরের নাতনি। কাশীরাজের মেয়ে গো। তা আমার এই নাতনিটির একটা আর্জি আছে তোমার কাছে। তুমি তার কথা শুনে যা হয় একটা ব্যবস্থা করো–অস্যাঃ শৃণু যথাতত্ত্বং কাৰ্যং কার্যবিশারদ। পরশুরাম শুনেই অম্বার দিকে তাকিয়ে বললেন–বলল, কী তোমার বক্তব্য? অম্বা প্রথমেই কিছু বললেন না। ভীষ্ম কিংবা শা-এই দুজনের ওপর তার যে গভীর ক্রোধ হয়েছে, তা বেরিয়ে এল ক্রন্দনের রূপ ধরে। তিনি তার পদ্মদলসস্নিভ হস্ত দুটি দিয়ে পরশুরামের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন–রুরোদ সা শোকবতী বাস্পব্যাকুললোচনা।
