পরীক্ষিত রাজার ক্রোধাবেশ দেখে কলি ভয়ে কাঁপতে থাকল বটে, তবে হাল ছাড়ল না। বলল, আপনি আমাদের সার্বভৌম রাজা বটে। আমাকে তাড়িয়ে দিলে তো হবে না, থাকার জন্য আমাকেও একটা জায়গা দিতে হবে। তা আপনিই বলে দিন–কোথায় আমি থাকব স্থানং নির্দেন্ধুমহসি। পরীক্ষিত বললেন, ঠিক আছে, ঠিক আছে। তবে কোনও ভাল জায়গায় তুমি থাকতে পাবে না। তোমার আবাস হোক-তাস-পাশার জুয়োচুরিতে, অঁড়িখানায়, স্ত্রীলোকের সুখসঙ্গে, আর থাক প্ৰাণীহত্যা, খুন, রাহাজানির মতো কুকর্মের মধ্যে। এই চার জায়গায় যত অধর্ম। তুমি থাকো এই অধর্মের মধ্যে, কিন্তু খবরদার! এই সব সৎ-সাধনের জায়গায় তোমায় যেন না দেখি।
কলি বলল, এই চার জায়গায় মাত্র স্থান দিলেন, মহারাজ? আর একটু কৃপা হবে না? রাজা বললেন, যাও, যাও সোনা-চাদির জায়গাটাও না হয় তোমায় ছেড়ে দিলাম–পুনশ্চ যামানায় জাতরূপমদাৎ প্রভু। কলিকে পরীক্ষিত যেভাবে স্বীকৃতি দিলেন–তার ফলটা কী দাঁড়াল? জুয়েচুরির মধ্যে যে মিথ্যার বেসাতি আছে, পানশালায় যে হাম-বড়া ভাব আসে মনে, স্ত্রী-সঙ্গের মধ্যে যে কামনার প্রশ্রয় আছে, অকারণ প্রাণীহত্যার মধ্যে যে ক্রুরতা আছে, আর টাকা-পয়সা নিয়ে যে শক্রতা তৈরি হয়-এইসব জায়গাতে কলির স্থান একেবারে পাকা হয়ে গেল।
পুরাণ থেকে এই উপাখ্যানটুকু যে স্মরণ করতে হল, তার কারণ আছে। পরীক্ষিত মহারাজের আমলে কলি ঢুকে পড়ল–এই ধৰ্মীয় তথ্যের মধ্যে প্রধান ইঙ্গিত হল–তার আমলে আর সেই সুখ-শান্তি, সেই সত্য এবং ধর্মবোধ আর রইল না, যা তার পিতা পিতামহের আমলে ছিল। নীতি এবং ধর্মবোধ যে কতটা চলে গেছে পরীক্ষিত মহারাজের আপন উদাহরণই তার জন্য যথেষ্ট। সরস্বতীর তীরে দণ্ডপাণি কলির পদাঘাতে ক্লিষ্ট গোমিথুনকে দেখে কলির ওপরে তার যতই রাগ হোক, মহারাজ যুধিষ্ঠিরের অধস্তন পুরুষ হয়ে তিনি নিজে যে কাণ্ড করে বসলেন, তাতে বোঝা যায়-অন্যায় এবং অভব্যতা কী চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। আসলে তার রাজত্বকালে কলি-প্রবেশের প্রধান তাৎপর্যই হল–লোভ, হিংসা, দ্বেষ, অসত্য এবং দম্ভ সর্বত্র এমনভাবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল যে, পরীক্ষিতের পক্ষে তা রোধ করা সম্ভব হয়নি। বরং অন্যায়ের প্রতিরূপ কলি তার কাছে যা প্রার্থনা করেছে, তিনি তা মঞ্জুর করেছেন। যেখানেই হোক, যে পর্যায়েই হোক অন্যায়-অনীতি এবং অভব্যতাকে পরীক্ষিত মহারাজ প্রায় সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়েছেন–কলিকে তিনি স্যাংশন’ দিয়েছেন।
এই যে স্বীকৃতি, কলির প্রতি পরীক্ষিতের এই যে বিবশ আচরণ–এর কারণ দু’ধরনের সমাজিক পরিস্থিতি থেকে তৈরি হয়ে থাকতে পারে। এক, তিনি সব জেনে বুঝে অন্যায্য কলিকে মেনে নিয়েছেন এবং তার নিজের মানসিকতাও খানিকটা ওইরকমই ছিল। দুই, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর যেহেতু কোনও অসামান্য ব্যক্তিত্বই আর জীবিত ছিলেন না এবং পরীক্ষিত–যাঁকে মহাভারতের কবিই ক্ষীয়মাণ কুরুবংশের শেষ অঙ্কুর বলে চিহ্নিত করেছেন –সেই পরীক্ষিতের দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই তার রাজত্বে অন্যায়-অসভ্যতা, হিংসা-দ্বেষ এমন চরম পর্যায়ে এসে পৌঁছেছিল যে, পরীক্ষিতের পক্ষে কলিকে স্বীকৃতি না দিয়ে উপায় ছিল না।
আমরা দ্বিতীয় কল্পটাকেই মেনে নিতে চাই, কারণ পরীক্ষিত তার স্বীকৃতিতে কলির আবাস নির্দিষ্ট কতগুলি স্থানে বেঁধে দিতে চাইছেন। তাঁর রাজত্বে কলি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে, অতএব তাকে সর্বত্র ছড়াতে না দিয়ে খানিকটা নিয়ন্ত্রিত করতে চাইছেন তিনি। কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে পৌরাণিকেরা যে শক্তিমত্তার আভাসটুকু দেখেছেন, সেটা যে তেমন কোনও সত্য নয়–সেটাও পৌরাণিকেরা জানেন এবং জানেন বলেই পরীক্ষিতের পরবর্তী ব্যবহার তারা উল্লেখ করতে ভোলেননি। অর্থাৎ পরীক্ষিত অন্যায়-অসত্যকে যতই নিয়ন্ত্রিত করুন, সেগুলি তার সময়ে সহজ হয়ে উঠেছিল, এবং সহজ বলেই দেশের রাজা হওয়া সত্ত্বেও, জনগণের ভাগ্য-নিয়ন্তা হওয়া সত্ত্বেও অন্যায় আচরণ করতে তারও বাধেনি। ঘটনাটা পরিষ্কার করে জানাই।
মহারাজ পরীক্ষিতের মধ্যে তার প্রপিতামহ পাণ্ডুর কিছু গুণ ছিল। মহারাজ পাণু শিকার করতে বড় ভালবাসতেন। এটাকে যদি আজকের ভাষায় হবি’ বলা যায়, তবে সেকালের ভাষায় এই হবির নাম হল মৃগয়া। মৃগয়াতে অকারণে পশুবধ করা হয় বলে পুরাতনেরা ব্যাপারটা বড় পছন্দ করতেন না। আরও পছন্দ করতেন না–মৃগয়া যখন হবি’র পর্যায়ে চলে যেত। পুরাতনেরা বলতেন, মৃগয়া হল এক ধরনের ব্যসন, কামজ ব্যসন, যা রাজাদের চারিত্রিক দোষ তৈরি করে। রাজারা পশুবধ করতে করতে প্রমত্ত হয়ে ওঠেন, তাদের আর সময়-অসময়, কাণ্ডাকাণ্ড-জ্ঞান থাকে না। পুরাতনেরা এই প্রমত্ততার জন্যই মৃগয়াকে কামজ-ব্যসনের মধ্যে গণ্য করেছেন এবং তারা রাজাদের সব সময় সাবধান করেছেন যেন এই প্রমত্ততা তাদের গ্রাস না করে।
পুরাতনেরা যাই ভাবুন, রাজারা রাজার মতোই চলেন। প্রপিতামহের দৃষ্টান্তে পরীক্ষিত মহারাজেরও মৃগয়ায় যাওয়াটা বেশ অভ্যাসে দাঁড়িয়েছিল। তিনি মৃগয়ায় বেরিয়ে বন্য শূকর, মহিষ, বাঘ মারতে মারতে চলেছেন। এমন সময় একটি সুন্দর হরিণ পরীক্ষিতের চোখে পড়ল। রাজা বাণ ছুড়লেন ঠিকই, কিন্তু বাণটি ভাল করে তার গায়ে বিদ্ধ হল না। বাণের আগায় বক্র ফলক ছিল, ফলে বাণটি হরিণের শরীরে লেগে ঝুলে রইল এবং বাণবিদ্ধ অবস্থাতেই হরিণ দ্রুত ছুটতে আরম্ভ করল। পরীক্ষিত হরিণের পিছনে ধাওয়া করলেন। গভীর বনের মধ্যে ধাবমান হরিণ এক সময় রাজার দৃষ্টির অগোচরে চলে গেল। পরীক্ষিত তার পেছনে ছুটতে ছুটতে বনরাজির প্রান্তে এক মুক্ত তৃণভূমির মধ্যে এসে পৌঁছলেন।
