.
৬১.
ওদিকে শাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী অম্বিকা এবং অম্বালিকার সঙ্গে কুমার বিচিত্রবীর্যের বিয়ে হয়ে গেল। রাজবাড়ির বিয়ে বলে কথা। ধুমধাম যথেষ্ট হল। কিন্তু বিয়ে মিটে যাবার পর দুই স্ত্রীর সঙ্গে বিচিত্রবীর্যের সম্বন্ধ ঘনিষ্ঠ হবার আগেই বোধহয় মহামতি ভীষ্মকে বাড়ি ছেড়ে যুদ্ধ করবার জন্য যেতে হল। কারণ সেই অম্বা। শান্বরাজের কাছে প্রত্যাখ্যাত হবার পর এক মুনির আশ্রমে বসেই তিনি যেভাবে সেকালের রাজনীতি ঘেঁটে তুললেন তা রীতিমতো আশ্চর্যের।
আগেই বলেছি–অম্বার মাতামহ ছিলেন মহাবীর পরশুরামের প্রিয় সখা। মুনি-ঋষিদেরও তিনি নমস্য–রাজর্ষি হোত্ৰবাহন। পরশুরামের অনুচর অকৃতব্রণ, যিনি এই একটু আগেই শৈখাবত্যের আশ্রমে এসে উপস্থিত হয়েছেন। প্রথমে তার কাছেই অম্বার করুণ কাহিনীর সমস্ত বিবরণ দিলেন স্বয়ং সৃঞ্জয় হোত্ৰবাহন। সেই তিনকন্যার স্বয়ম্বর থেকে আরম্ভ করে অম্বার হস্তিনাপুর থেকে চলে যাওয়া এবং শাল্বরাজের প্রত্যাখ্যান পর্যন্ত–সব কাহিনী পাঞ্চাল হোত্ৰবাহনের মুখে শুনলেন অকৃতব্রণ। শেষে খুব ভালমানুষের মতো তিনি জানালেন–এখন তো আর কোনও উপায় নেই। এখন এই আমার দুঃখিনী নাতনিটি তপস্যা করবে বলে এই আশ্রমে এসেছে–সেয়ং তপোবনং প্রাপ্তা তাপস্যেভিরতা ভৃশম্।
হোত্ৰবাহন নাকি অম্বাকে আগে ভাল করে চিনতে পারেননি। কিন্তু পরিচয়ের সময় পিতৃকুল-মাতৃকুলের বংশধারার কথা শুনে হোত্ৰবাহন বুঝেছেন–এটি তারই নাতনিময়া চ প্রত্যভিজ্ঞতা বংশস্য পরিকীর্তনাৎ। মহাকাব্যের সহজ-সরল মনোভূমি থেকে এই বর্ণনাই স্বাভাবিক বটে, তবে আমরা কলিকালের কুটিলতায় ঘটনাগুলিকে এত সরলভাবে বিশ্বাস করিনি। ঘটনা যে তত সরল নয়, তা সবচেয়ে বেশি বোঝা যাবে পরশুরামের অনুচর অকৃতব্রণের উত্তরে অথবা প্রশ্নে। হোত্ৰবাহন এতক্ষণ অম্বার করুণ অবস্থা বর্ণনা করেছেন অকৃতব্রণের কাছে, অম্বাও তাঁর মাতামহকে সমর্থন করে নিজের বিবৃতি দিয়েছেন। কিন্তু হোত্ৰবাহন কিংবা অম্বা কেউই কিন্তু ভীষ্মকে শাস্তি দেবার কথা তেমন করে বলেননি। হোত্ৰবাহন সবার শেষে শুধু একবার বলেছিলেন-আমার এই নাতনিটি এখন ভীষ্মকেই তার কষ্টের জন্য দায়ী মনে করছে–অস্য দুঃখস্য চোৎপত্তিং ভীষ্মমেবেহ মন্যতে।
অকৃতব্রণ পরশুরামের সার্থক শিষ্য। পরশুরাম ভয়ঙ্কর ব্যস্ত মানুষ। তিনি পরের দিন সকালে শৈখাবত্যের আশ্রমে এসে পৌঁছবেন–এই সংবাদ আগাম দেবার জন্যই অকৃতব্রণ আগের দিনই এসে পৌঁছেছেন আশ্রমে। সৃঞ্জয় হোত্ৰবাহনের মর্যাদা থেকে অকৃতব্রণ বুঝেছেন-হোত্ৰবাহন খুব কম লোক নন। তিনি তার গুরুর সাহায্য চান। অতএব কীভাবে অথবা কতটুকু সাহায্য এঁরা চান, সেটা অকৃতব্রণের জেনে রাখা দরকার। কারণ কাল সকালেই এ ব্যাপারে তার গুরুকে ‘ব্রিফ’ করবেন তিনি।
অকৃতব্রণ উত্তর দেবার সময় প্রথম প্রশ্ন যেটা করলেন অম্বাকে, সেটা হল–বংসে! তুমি। কী চাও? শাল্ব এবং ভীষ্ম–এই দুজনের মধ্যে কাকে বেশি ঝামেলায় ফেলতে চাও তুমি–দুঃখং দ্বয়োরিদং ভদ্রে কতরস্য চিকীর্ষসি? তুমি যদি মনে ক–যাতে শাল্বরাজ তোমাকে বিয়ে করেন, সে ব্যাপারে তাকে বুঝিয়ে বলতে হবে, বা তাকে জোর করতে হবে, তবে মহাত্মা পরশুরাম তাই করবেন। তোমার যাতে ভাল হয়, তাই তিনি করবেন-নিযোক্ষ্যতি মহাত্মা স রামশুদ্ধিতকাম্যয়া। অকৃণ এবার বললেন–আর যদি তুমি মনে কর যুদ্ধে জয় করে ভীষ্মকে। একটা উচিত শিক্ষা দিতে হবে, তুমি যদি এতেই খুশি হও, তবে পরশুরাম তাই করবেন–রণে বিনির্জিতং দ্রং কুৰ্য্যাত্তদপি ভার্গবঃ।
এই মুহূর্তে কী কঠিন সংকটে পড়লেন এই রমণী। যার কাছে তিনি প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, তার চরিত্রাশঙ্কী সেই শারাজাকে বিয়ের জন্য জোর করলে, তিনি যদি চাপে পড়ে রাজিও হন, তো সে বিয়ে যে সুখের হবে না তো তিনি জানতেন। অপরদিকে ভীষ্ম! এক মুহূর্তের জন্য হলেও তো এই প্রৌঢ়-বৃদ্ধ মানুষটিকে দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। না হয় রাগের মাথায় দাদু হোত্ৰবাহনকে একবার বলেই ফেলেছিলেন যে, ভীষ্মকে তিনি শাস্তি দিতে চান। তাই বলে এত তাড়াতাড়ি সে ব্যবস্থা করতে হবে। অম্বার মনের গভীরে কী হচ্ছিল, কে জানে?
অকৃতব্রণ প্রশ্ন করলে তিনি অসত্য কথা বলতে পারলেন না। আবারও বলি–কেন, কে জানে? অম্বা বললেন–ভীষ্ম কিছুটি না জেনেই আমাকে অপহরণ করেছিলেন। আমি যে পূর্বাহ্নেই শাল্বরাজের প্রতি অনুরক্ত ছিলাম, তাকে যে আমি আগে থেকেই মন দিয়েছি–সে কথাও তো তিনি কিছু জানতেন না–ন হি জানাতি ভীষ্মে মে ব্ৰহ্মন্ শাগতং মনঃ। অম্বা নিজের কোনও সিদ্ধান্ত জানাতে পারলেন না, যেমনটি পাঞ্চাল হোত্ৰবাহন জানিয়েছিলেন অকৃতব্রণকে। অম্বা বললেন–আপনারাই বিচার করে স্থির করুন–কার শাস্তি পাওয়া উচিত? কৌরবশ্রেষ্ঠ ভীষ্মই অন্যায় করেছেন, নাকি শাল্বরাজ, নাকি দুজনেই–তা আপনারাই বলুন। আমি আমার দুঃখ-কষ্ট যেমনটি ঘটেছে, তেমনটি নিবেদন করেছি। এখন শা এবং ভীষ্ম–এই দুজনের মধ্যে সত্যিই কার শাস্তি পাওয়া উচিত–তা আপনারাই সবচেয়ে সযৌক্তিকভাবে ঠিক করতে পারেন–ভীষ্মে বা কুরুশার্দুলে শারাজে’থবা পুনঃ।
অম্বা আগে যতই রাগ করুন ভীষ্মের ওপরে, ঠিক ঠিক যখন তাকে মার খাওয়ানোর প্রশ্ন এল, তখন কিন্তু ভীয়ের দোষের কথা তিনি কিচ্ছুটি বললেন না। বরঞ্চ, তার ঘটনায় ভীষ্মের যে কোনও দোষই নেই, সেই কথাই তো তিনি শেষ মুহূর্তে ‘প্লিড’ করলেন, আর তার নাম বলার সময় একটা শ্রেষ্ঠত্বসূচক বিশেষণও লাগালেন–কুরুশ্রেষ্ঠ ভীষ্মভীষ্মে বা কুরুশাধূলে, যে বিশেষণ তার পূর্বপ্রিয়তম শাল্বরাজের ভাগ্যে জুটল না। অম্বার মনে সত্যি কী ছিল, তা মহাভারতের কবি স্বকণ্ঠে না বললেও আমরা যেন বুঝতে পারি। কিন্তু সমস্ত ঘটনা মিলিয়ে পরিস্থিতিটা এখন এমনই জটিল হয়ে গেছে যে, এখন আর তার হাতের মধ্যে কিছু নেই। তার মধ্যে ঘটনার কর্তৃত্ব এখন চলে গেছে সৃঞ্জয় হোত্ৰবাহনের হাতে। হোত্ৰবাহন তাকে বলেছেন–তুমি আমার কাছেই থাকবে এবং আমিই তোমার দুঃখ দূর করব-দুঃখং ছিলাম্যহং তে বৈ ময়ি বর্ত পুত্রিকে।
