রাজর্ষি হোত্ৰবাহন অর দুঃখের সঙ্গে একাত্ম হলেন। অম্বার ক্লিষ্ট শীর্ণ শরীর আর মানসিক কষ্ট দেখে তিনি তাকে আত্মীয়তার আশ্রয় দিয়ে বললেন–তুমি আমার কাছেই থাকবে–এ তো সাধারণ কথা। সঙ্গে সঙ্গে এও জানাই–তুমি যা চাইছ, তারও উপায় আছে। বলি শোনো–তুমি একবার ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ পরশুরামের কাছে যাও। মহাকালের আগুনের মতো তার তেজ। ভীষ্ম যদি তার কথা না শোনেন, তবে তিনিই একমাত্র পারেন ভীষ্মকে যুদ্ধে হারাতে, এমনকি মেরেও ফেলতে-হনিষ্যতি রণে ভীষ্মং ন করিষ্যতি চেচঃ। সাধারণ মেয়েরা সংসারে স্বামী-পুণ্ডুর নিয়ে যে অবস্থায় থাকে, তোমাকে সেই অবস্থা ফিরিয়ে দিতে পারেন একমাত্র পরশুরাম।
কথাটা শুনে অম্বার কান্না পেয়ে গেল। কীভাবে, কোথায় পরশুরামের সঙ্গে তার দেখা হবে, তখন-তখনই তার যাওয়া উচিত কি না–এসব প্রশ্ন নিয়েও আলোচনা চলল মাতামহ হোত্ৰবাহনের সঙ্গে। হোত্ৰবাহন বললেন–পরশুরাম থাকেন মহেন্দ্র পর্বতে। দেখবে এক মহাবনের মধ্যে তিনি তপস্যায় নিযুক্ত আছেন। আমার নাম করে, আমার পরিচয় দিয়ে তুমি যা চাইছ, সে সব কথা তুমি তাকে বলো। দেখবে, তোমার কথা তিনি শুনবেন, কারণ পরশুরাম আমার বন্ধু মানুষ-মম রামঃ সখা বৎসে প্রীতিযুক্তঃ সুহৃচ্চ মে।
হোত্রবাহনের সমস্ত নির্দেশ শুনে অম্বা মহেন্দ্র পর্বতে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন এমন সময় পরশুরামের অনুচর অকৃতব্রণ ওই আশ্রমেই এসে উপস্থিত হলেন। আশ্রমে উপস্থিত রাজর্ষি হোত্ৰবাহনকে দেখে অকৃতব্রণ খুবই খুশি হলেন এবং সানন্দে বললেন– মহাত্মা পরশুরাম সবসময় আপনার গল্প করেন। বারবার আমাদের বলেন–সৃঞ্জয়বংশীয় হোত্ৰবাহন আমার পরম প্রিয় সখা-সৃঞ্জয়ো মে প্রিয়সখো রাজর্ষিারতি পার্থিব।
রাজর্ষি হোত্ৰবাহনের আরও একটা পরিচয় বেরল। তিনি সৃঞ্জয়বংশীয়–স চ রাজা বয়োবৃদ্ধঃ সৃঞ্জয়া হোত্ৰবাহন। এই পরিচয়টা আমাদের কাছে অত্যন্ত জরুরী। সৃঞ্জয়বংশীয়দের কথা আমরা আগে বলেছি। সঞ্জয় পাঞ্চালদেশের রাজা ছিলেন এবং দ্ৰৌপদী, ধৃষ্টদ্যুম্ন এবং শিখণ্ডীর পিতা বলে পরিচিত দ্রুপদের পূর্বপূরুষ সৃঞ্জয়। বস্তুত পাঞ্চালদেশের রাজারা সকলেই সৃঞ্জয়ের নামেই বিখ্যাত। পরবর্তী কালে শিখণ্ডীর মধ্যে অম্বার রূপান্তর এবং এখন সৃঞ্জয় হোত্ৰবাহনের ভীষ্মবধের পরিকল্পনার মধ্যে বহু পরবর্তী কালের রাজনৈতিক স্থিতিগুলি অনেকটাই সুপ্ত ছিল বলে আমরা মনে করি। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ভীষ্ম পাণ্ডবদের পক্ষে না এসে কৌরবদের পক্ষেই কেন থেকে গেলেন–এই রাজনৈতিক কূটের সমাধান করার জন্য যাঁরা শুধু ভীষ্মের মৌখিক কথাটুকু বিশ্বাস করেন, তারা আর যাই বুঝুন মহাভারতের রাজনৈতিক তাৎপর্য বোঝেন না। ভীষ্ম নাকি বলেছিলেন–মানুষ অর্থ এবং অন্নের দাস। আমি কুরুবাড়ির অন্ন খেয়েছি, অতএব সেই ঋণশোধের জন্যই আমাকে কৌরবপক্ষে থাকতে হবে।
ভীষ্মের এই কথাটা বোকা-বোঝনোর মৌখিকতা মাত্র। ভারতযুদ্ধের রাজনৈতিক তাৎপর্য বোঝার চেষ্টা করলে দেখা যাবে-কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কাশীর রাজা পাণ্ডবপক্ষে যোগ দিয়েছিলেন এবং পাঞ্চাল-সৃঞ্জয়রাও যোগ দিয়েছিলেন পাণ্ডবপক্ষে। কাশীর রাজার মেয়েদের হরণ করে আনতে গিয়ে সেই স্বয়ম্বরসভায় ভীষ্ম যেভাবে অপমানিত হয়েছিলেন এবং পরবর্তী কালে পাঞ্চাল দেশের রাজা সৃঞ্জয় হোত্ৰবাহন পরশুরামকে দিয়ে যেভাবে ভীষ্মকে মার খাওয়ানোর পরিকল্পনা করছেন, তাতে ভীষ্মের পক্ষে পাণ্ডবদের হয়ে যুদ্ধ করার রাজনৈতিক সমস্যা ছিল। রাজর্ষি হোত্ৰবাহন যেভাবে অম্বার পাশে এসে দাঁড়ালেন এবং সেকালের ক্ষত্রিয়দের চরম শত্রু পরশুরামের সঙ্গে জোট বাঁধলেন রাজনৈতিক দিক দিয়ে সেটা রীতিমতো এক ধূর্ত পরিকল্পনা।
এ বাবদে মহাভারতের কবির বক্তব্য বড়ই সরল। তিনি যেহেতু মহাকাব্যের কবি, তাই অনর্থকভাবে রাজনৈতিক আবর্ত তৈরি করেন না। নইলে ঈষৎ পূর্বের পরিস্থিতিটাই একটু মনোযোগ দিয়ে দেখুন–যে আশ্রমের ঋষিরা একটু আগেই অম্বাকে বাপের বাড়ি ফিরে যেতে বলেছেন, যাঁকে তারা বলেছেন–আমরা ঋষিরা কীই বা করতে পারি তোমার সমস্যায়, সেই আশ্রমেই মুহূর্তের মধ্যে পাঞ্চাল রাজর্ষি হোত্ৰবাহন এসে পৌঁছলেন, সেই আশ্রমে পরশুরামের নাম উচ্চারণ মাত্রেই তার অনুচর অকৃতব্রণ এসে পৌঁছলেন, আবার তিনি এসে বলছেন কিনা–পরশুরাম এখনই আসছেন–এই সমস্ত ঘটনার শৃঙ্খল মহাকাব্যোচিত আকস্মিকতার সূত্রে গাঁথা হলেও ঘটনাগুলি আমাদের কাছে এত সরল নয়। আর সরল নয় বলেই এই সম্পূর্ণ কাহিনীটা আমরা ভীষ্মের মুখেই শুনতে পাচ্ছি। তিনি এই ঘটনার বলি। এবং এই সমস্ত ঘটনা তিনি নিজমুখে বর্ণনা করেছেন সেই উদ্যোগপর্বে গিয়ে। কীভাবে, কত সুপরিকল্পিত তার পিছনে লাগা হয়েছিল, সে সব ঘটনা তিনি সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন কুরুবাড়ির নেতাদের কাছে।
আরও লক্ষ্য করে দেখবেন–গীতায় অর্জুন যেখানে বিশাল দুই যুযুধান সৈন্যবাহিনীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আকুল হয়ে পড়েছেন, সেখানে যারা শাঁখ বাজিয়ে যুদ্ধ আরম্ভ করেছেন তাদের মধ্যে পাশাপাশি নাম দুটি হল-কাশীর রাজা এবং পাঞ্চাল শিখণ্ডীর–কাশশ্চ পরমেম্বাসঃ শিখণ্ডী চ মহারথঃ। কাশী এবং পাঞ্চালের এই জোট আরম্ভ হয়েছিল বহু আগে, সেই বিচিত্রবীর্যের বিবাহ-সময়ে এবং সেটা প্রধানত হস্তিনাপুরের সর্বময় কর্তা ভীষ্মের বিরুদ্ধে। আমাদের মতে এই রাজনৈতিক শত্রুতা চলেছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ পর্যন্ত।
