অম্বা যথেষ্ট বুদ্ধিমতী। একটু চতুরাও বটে। তিনি একবারও বললেন না যে, ভীষ্মের ওপর তিনি প্রতিশোধ নিতে চান। খুব ভালমানুষের মেয়ের মতো তিনি শাল্বরাজের ওপরেই আপাতত সমস্ত দোষ চাপিয়ে দিয়ে তার অসহায় অবস্থার কথা বুঝিয়ে বললেন–দেখুন, শাল্বরাজ আমাকে প্রত্যাখ্যান করে তাড়িয়ে দিয়েছেন। আমার মনে আনন্দ বলে আর কিছু নেই–প্রত্যাখ্যাত নিরানন্দা শানে চ নিরাকৃতাঃ।
সংস্কৃত ভাষায় কথাটা দ্ব্যর্থব্যঞ্জক। ভীষ্মের নাম না করেও এই শ্লোকের অর্থ এইরকম হতে পারে–ভীষ্ম আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন আর শাম্ব আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। এই অবস্থায় আর আমার বাড়িতে নিজের জনের কাছেও ফিরে যাবার উপায় নেইনোসহে চ পুনর্গত্তং স্বজনং প্রতি তাপসা। তাই ভাবছিলাম–যা হবার তা তো হয়েই গেছে। পূর্বজন্মে অনেক পাপ করেছি তার ফলও পাচ্ছি। এখন এই অবস্থায় আপনারা আমায় একটু অনুগ্রহ করুন। আমিও সন্ন্যাসিনী হয়ে জীবন কাটিয়ে দেব। যেমন তপস্যা করা যায় না, সেই দুশ্চর তপস্যায় মন দেব আমি–ব্রাজ্যমহমিচ্ছামি তপস্তন্স্যামি দুশ্চরম্।
অম্বার কথা শুনে শৈখাবত্য মুনি নানান শাস্ত্র-যুক্তি দিয়ে সান্ত্বনা দিলেন তাকে। তবে এক যুবতী মেয়ের মুখে যোগিনী হবার কথা শুনে সমস্ত মুনি-ঋষিদের মনই একটু করুণা-সিক্ত হয়ে রইল। সত্যিই অস্থার জন্য কিছু করা যায় কি না, তার জন্য তাদের মনও খানিকটা প্রস্তুত হল। তপস্বীদের মধ্যে কেউ কেউ অবশ্য তাকে ঘরে ফিরে যেতে বললেন। কেউ ভীষ্মকে। গালাগালি দিলেন, কেউ বা শাশ্বকেও। কিন্তু নানা আলোচনা করে, সবার দোষ-গুণ বিচার করে, আশ্রয়স্থল হিসেবে কোন জায়গাটা সবচেয়ে যোগ্য হবে, তার বিধান দিলেন মুনিরা। বললেন-মা! এই বয়সে তোমার ঘর ছেড়ে সন্ন্যাসিনী হওয়া সাজে না। আমাদের কথা শোন–অলং প্রব্রজিতেনেহ ভদ্রে শৃণু হিতং বচঃ।
ঋষিরা বললেন–তুমি তোমার বাপের বাড়িতেই ফিরে যাও, মা! তিনি তোমার জন্য সব থেকে উপযুক্ত ব্যবস্থা করবেন। স্বামী সুস্থ থাকলে, ভাল থাকলে তার বাড়িটাই মেয়েদের পক্ষে সবচেয়ে ভাল বটে; কিন্তু স্বামীর বিপদ ঘটলে, মারা গেলে অথবা যা হোক স্বামীর বাড়িতে কোনও ঝামেলা হলে, বাপের বাড়িটাই মেয়েদের পক্ষে সবচেয়ে ভাল। গতিঃ পতিঃ সমস্থায় বিষমে চ পিতা গতিঃ। তার ওপরে দেখো, তোমার এই কাঁচা বয়স। তুমি রাজার মেয়ে বলে কথা, তোমার স্বভাবও নরম, শরীরটাও নরম, এই বয়সে তোমার কি যোগিনী হওয়া সাজে–প্রব্রজ্যা হি সুদুঃখেয়ং সুকুমাৰ্য্যা বিশেষতঃ।
মুনিরা এবার আশ্রমে থাকার অসুবিধেগুলোও বললেন। বললেন–তুমি ভাবছ মা! আশ্রমে সন্ন্যাসিনী হয়ে রইলাম, আর সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল? তপস্যার মধ্যেও অনেক সমস্যা আছে, মা। তোমার মতো সুন্দরীদের তপস্যার ভূমিতেও শান্তি নেই। রাজা-রাজড়ারা অনেক সময়েই আমাদের সঙ্গে দেখা করার জন্য আমে আসেন। তারা তোমাকে দেখলেই তোমার সল কামনা করবেন, তোমাকে স্ত্রী হিসেবেও পেতে চাইবেন। অনেকে। সেও কি কম সমস্যা? তাই বলছিলাম, এই বয়সে তপস্বিনী হওয়ার মন কোরো না অন্তত–প্রার্থয়িষ্যন্তি রাজানঃ তস্মান্মৈবং মনঃ কৃথাঃ।
মুনি-ঋষিদের সব কথা শুনেও অম্বা কিন্তু খুব বিচলিত হলেন না। কারণ তারও বাস্তববুদ্ধি, সামাজিক বোধ কিছু কম নয়। তিনি বললেন–কাশীনগরীতে পিতার ঘরে আর আমার পক্ষে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়, বাবা! আমার আত্মীয়স্বজন, নিজের লোকেরা কেউই আমার অবস্থা ভাল করে বুঝবেন না, ফলে তাদের অবজ্ঞার পাত্র হব আমি। ছোটবেলা থেকে বাপের বাড়িতে যে আদর আর মর্যাদা নিয়ে আমি বড় হয়েছি–উষিতাস্মি যথা বাল্যে পিতৃর্বেশ্মনি তাপসাঃ–সেই আদর আর আমি পাব না। কারণ এর মধ্যে অনেক কিছু ঘটে গেছে। কাজেই আপনারা আমাকে যে সুপরামর্শ দিয়েছেন, তার জন্য বড় জোর আমি সাধুবাদ জানাতে পারি, কিন্তু আমার পক্ষে বাপের বাড়ি ফেরা আর সম্ভব নয়-নাহং গমিষে ভদ্রং বস্তত্ৰ যত্র পিতা মম। আমি তপস্যাই করব এবং আমার সুরক্ষার ভার আপনাদের।
ব্রাহ্মণ মুনি-ঋষিরা অম্বার দৃঢ়তায় একটু বিচলিতই বোধ করতে লাগলেন যেন। কী করা যায় এই সুন্দরী যুবতাঁকে নিয়ে–এই চিন্তায় যখন তাঁদের মনোজগতে ঝড় চলছে, ঠিক সেই সময় সেখানে এসে উপস্থিত হলেন রাজর্ষি হোত্ৰবাহন। হোত্ৰবাহন রাজকর্ম করেন বটে, কিন্তু তিনিও মুনি-ঋষিদের মতোই তপঃসিদ্ধ, যার জন্য তাকে রাজর্ষি বলা হয়। মুনি-ঋষিরাও তাঁকে খুব সম্মান করেন। লক্ষণীয় বিষয় হল–রাজর্ষি হোত্ৰবাহনের সঙ্গে অশ্বর একটা আত্মীয়-সম্বন্ধও আছে। হোত্ৰবাহন অম্বার মাতামহ অর্থাৎ মায়ের বাবা, দাদু। স্বাভাবিক কারণেই অম্বার দুরবস্থার কথা শুনে তিনি অত্যন্ত বিচলিত হলেন।
রাজর্ষি হোত্ৰবাহনের আরও বড় পরিচয় আমরা পরে পাব এবং সেটা অন্য কারণে খুব গুরুত্বপূর্ণও বটে। কিন্তু পরের কথা পরেই হবে। আপাতত অম্বার ব্যাপারে তার হস্তক্ষেপটুকুই বিচার্য বিষয়। অম্বার দাদু বলে কথা। হোত্ৰবাহন তার দুঃখের কথা শোনামাত্রই পরম স্নেহে আদরের নাতনিকে কোলে তুলে নিলেন–তাং কন্যা অঞ্চমারোপ্য পৰ্য্যশ্বাসয়ত প্রভোসাত্বনা দিলেন নানান মতে। অম্বাও ভীষ্ম, শা, তাদের অঙ্গীকার, প্রত্যাখ্যান–সব সবিস্তারে জানালেন দাদু হোত্ৰবাহনকে। সব শুনে হোত্ৰবাহন বললেন-বাপের বাড়ি ফিরে যাবার কোনও প্রয়োজন নেই তোমার। আমি তোমার দাদু, তোমার দুঃখ দূর করার ভার আমার-দুঃখং ছিন্দাম্যহং তে বৈ…মাতুস্তে জনকো হ্যহম্।
