নিজের দোষ, পিতার দোষ, এবং সমস্ত সঙ্কটময় পরিস্থিতির দোষ–যত দোষই দিন অম্বা, কিন্তু একবারের তরেও তিনি উচ্চারণ করলেন না–মনের গভীরে আকস্মিকভাবে উদগত সেই বুদবুদোপম সুখের কথা। ভীষ্মের যুদ্ধকৌশলে, বীরত্বে, ব্যক্তিতে তার যে মোহ তৈরি হয়েছিল অবচেতনায়–যা দূর থেকে শাশ্ব পর্যন্ত লক্ষ্য করেছেন, সেই সামান্য মোহটুকুর জন্যই যে এই সর্বব্যাপ্ত ক্ষতি হয়ে গেল, সে কথা তিনি একবারও স্বগতভাবে বললেন না। কিন্তু মুখে না বললেও মহাভারতের কবি সেটা বুঝিয়ে দিয়েছেন মনস্তাত্ত্বিকের মন্ত্রণা মিশিয়ে।
অম্বা পিতার ওপর রাগ করলেন, নিজের ওপর রাগ করলেন, বিধাতাকেও ধিক্কার দিলেন। কিন্তু ভাগ্যের দোষ দিয়ে সবার শেষে যেখানে এসে তার সমস্ত ক্রোধ কেন্দ্রীভূত হল, তিনি মহামতি ভীষ্ম। ভীষ্ম তার কোনও ক্ষতি করেননি, যখনই শারাজার কথা তিনি উচ্চারণ করেছেন সঙ্গে সঙ্গে তার সুরক্ষার সমস্ত ব্যবস্থা সম্পন্ন করে ধাই-বামুন সঙ্গে দিয়ে তাকে শারাজার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। এসব মহানুভবতা অম্বাও অস্বীকার করেন না। কিন্তু এখন। শা, পিতা, বিধাতা সবাইকে রেহাই দিয়ে তিনি ধরলেন ভীষ্মকে। বললেন-কপালের লিখন যার যেমন থাকে, তা তো হবেই, কিন্তু আমার এই দুরবস্থার জন্য আসল দায়ী হলেন ভীষ্ম-অনয়সাস্য তু মুখং ভীষ্মঃ শান্তনবো মম। যদি কারও ওপর প্রতিশোধ নিতে হয়–সে তপস্যা করে নিজের শক্তিবর্ধন করেই হোক, অথবা যুদ্ধ করেই হোক–যদি কারও ওপর প্রতিশোধ নিতে হয় তবে ভীষ্মের ওপরেই তা নেব; সেই আমার সমস্ত দুঃখের মূলসা ভীষ্মে প্রতি কর্তব্যং…দুঃখহেতুঃ স মে মতঃ।
এই যে প্রতিক্রিয়া, এক নির্দোষ ব্যক্তির প্রতি এক সুন্দরী রমণীর এই যে প্রতিশোধস্পৃহা– এই প্রতিক্রিয়া মনস্তাত্ত্বিকের নীতিতে বড় সাধারণ নয়। মনস্তাত্ত্বিক দার্শনিকের কথা যদি ধরেন, তাহলে তারা বলবেন-মানুষের কামনা যেখানে প্রতিহত হয়, সেখানেই ক্রোধের উৎপত্তি হয়। এখানে ভীষ্মের প্রতি অম্বার ক্রোধ থেকেই তার প্রতি অম্বার অবচেতন কামনার অনুমান করা যেতে পারে। অথবা এই যে সব ছেড়ে সবাইকে ছেড়ে অম্বার সমস্ত ক্রোধ ভীষ্মের প্রতি কেন্দ্রীভূত হল, তার পিছনে আছে এক ধরনের বিকার, যে বিকার উদাসীনতা থেকে কখনই জন্মায় না। একটা লোককে খারাপ লাগা বা ভাল লাগা থেকেই এই বিকারের উৎপত্তি হয়। ভীষ্ম অম্বাদের তিন বোনকে কাশীরাজের রাজসভা থেকে তুলে এনেছিলেন। তাতে তাদের। রাগও হতে পারে, আনন্দও হতে পারে। কিন্তু রাগ বা আনন্দ কোনওটারই প্রকাশ হয়নি তখন। কারণ তাদের নিয়ে কী করা হবে, কার সঙ্গে তাঁদের বিয়ে হবে–সে সম্বন্ধে তাঁদের কোনও ধারণা ছিল না।
প্রকৃত বিবাহ উৎসবের আয়োজন শুরু হতেই অম্বা শারে প্রতি তার অনুরক্তির কথা প্রকাশ করলেন, তাতেও তার কোনও অসুবিধে হয়নি। কিন্তু শাস্বরাজ তাকে প্রত্যাখ্যান করার পর তার সমস্ত রাগ যে ভীষ্মের ওপর গিয়ে পড়ল, এইখানেই হৃদয়-বিকারের লক্ষণ প্রকট হয়ে ওঠে। মহাভারতের শব্দমাত্র আভিধানিকভাবে বিচার করলে এই বিকারের সন্ধান পাওয়া যাবে না। কিন্তু যে মুহূর্তে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন–আমার সমস্ত কষ্টের মূল কারণ হলেন ওই ভীষ্ম–দুঃখহেতুঃ স মে মতঃ-সেই মুহূর্তেই ভীষ্মের প্রতি এই ক্রুদ্ধা রমণীর অবচেতন দুর্বলতা প্রমাণ হয়ে যায়।
অম্বা মনে মনে ঠিক করলেন-ভীষ্মকে শাস্তি দিতে হবে। হয় ভীন্সের থেকে অধিক কৌশলশালী কোনও অস্ত্রবিদের দ্বারা ভীষ্মকে মার খাওয়াতে হবে। নয়ত তপস্যার মাধ্যমে কোনও দেবতাকে তুষ্ট করে অম্বা নিজেই ভীষ্মের ওপর প্রতিশোধ নেবেন। কাউকে দিয়ে ভীষ্মকে মার খাওয়াতে গেলে কাকে ধরতে হবে–এসব অবশ্য তার জানা নেই। কিন্তু তার প্রতিশোধস্পৃহা এখন এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে, একজনকে তিনি খুঁজে বার করবেনই যিনি যুদ্ধে ভীষ্মের অসমোৰ্ব্ব প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন। এই সব নানা চিন্তা এবং প্রতিজ্ঞা নিয়ে তিনি শাপুরের নগরসীমা অতিক্রম করলেন। সমস্ত লোকালয় পেরিয়ে আসতে আসতেই অরণ্য ঘন ঘনতর হতে লাগল। সুদুর বনের উপান্তে এক আরণ্যক ঋষির আশ্রম চোখে পড়ল অম্বার।
সেদিন আর বেশি কথা হল না। তপস্যা, যজ্ঞ, হোম আর আরণ্যক ঋষি-মুনির উদাসীন শুষ্ক-রুক্ষ মন-সেখানে এক রমণী এসে প্রথমেই সবকিছু প্রকট করে দিতে পারে না। প্রথমে যা হয়, সেই রকম প্রণাম, কুশল-প্রশ্ন আর সদাচার-সৎকারেই রাত নেমে এল আশ্রমের অরণ্য-আবাসে। অম্বা আশ্রয় পেলেন, ঋষি-মুনিরা তাকে সমস্ত সুরক্ষা দিয়ে রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা করে দিলেন–ততস্তা অবস রাত্রি তাপসৈঃ পারিবারিতা। পরের দিন অম্বাকে নিয়ে মুনি-ঋষিদের আসর বসল। অম্বা আনুপুর্বিক সমস্ত ঘটনা মুনি-ঋষিদের জানালেন। ভীষ্ম তাঁকে কীভাবে হরণ করেছেন, কীভাবে অম্বার কথা শুনে ভীষ্ম তাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন শারে কাছে এবং অবশেষে কীভাবে শাল্ব তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, সব বললেন অম্বা। বলতে বলতে অম্বার চোখ জুড়ে কান্না এল, নিঃশ্বাস উষ্ণ এবং বাম্পায়িত হল–নিঃশ্বসন্তীং সতীং বালাং দুঃখশোকপরায়ণাম্।
মুনি-ঋষিদের মধ্যে তপোবৃদ্ধ যিনি ছিলেন, তার নাম শৈখাবত্য। আরণ্যক শাস্ত্র-উপনিষদের অধ্যাপক তিনি। তিনি একটু উদাসীন সুরেই বললেন–আমরা তো আশ্রমে থাকি, মা। ধ্যান আর তপস্যা নিয়েই আমাদের দিন কাটে। তোমার এই সমস্যায় এই সব তপস্বীরা কীই বা করতে পারেন–এবং গতে তু কিং ভদ্রে শক্যং কর্তৃং তপস্বিভিঃ।
