অম্বা ভাবলেন–ভীষ্মের আসা থেকে আরম্ভ করে বিবাহের শেষ আলোচনার সব বৃত্তান্ত ঠিক ঠিক শাল্বরাজকে বুঝিয়ে বললে হয়তো তিনি বুঝবেন। এ ছাড়া আর উপায়ও তো নেই। অম্বা একটু বুঝিয়ে বললেন-যুদ্ধে হারবেন না বলে ভীষ্মের একটা গোঁ চেপে গিয়েছিল বলেই তোমাকে তিনি অমন করে হারিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আমি আমার সমস্ত বৃত্তান্ত বিয়ের আগেই ভীষ্মকে সব জানিয়েছি। তার অনুমতি নিয়েই আমি তোমার কাছে চলে এসেছি চির জীবনের মতো–অনুজ্ঞতা চ তেনাশ্মি তবৈব বশমাগতা। তাছাড়া আসল ঘটনাটা তো তুমি বুঝবে–ভীষ্ম মোটেই আমাকে চাইছেন না, তিনি নিজে কোনও বিয়েও করতে চান না–ন হি ভীষ্মে মহাবুদ্ধির্মামিচ্ছতি বিশাম্পতে। তিনি নাকি তার ভাইয়ের বিয়ের জন্য কন্যা-হরণ করেছেন শুনলাম। আমার আর দুই বোন অম্বিকা এবং অম্বালিকার সঙ্গে তিনি তার ছোট ভাই বিচিত্রবীর্যের বিয়েও দিয়ে দিয়েছেন। এ
অম্বা সমস্ত বৃত্তান্ত জানিয়েও দেখলেন–শাল্বরাজের হৃদয়ে তার জন্য কোনও দুর্বলতা তৈরি হয়নি। এই মুহূর্তে তার মতো অসহায় রমণী আর কে আছে? কাজেই নিজের সমস্ত অসহায়তা প্রতিপাদন করেই তিনি এবার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ স্পর্শ করে নিজেকে সপ্রমাণ করতে চাইলেন। অম্বা বললেন–আমি আমার মাথা ছুঁয়ে বলছি–তুমি ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনও পুরুষের কথা আমি মনে-মনেও কখনও ভাবিনি–বামৃতে পুরুষ ব্যাঘ্র তথা মূৰ্দ্ধানমালভে। অম্বা বললেন–আমি আমার হৃদয় স্পর্শ করে বলছি–আমি কারও হইনি। কারও সঙ্গে আমার পূর্ব-সম্বন্ধ হয়নি। আমি তোমার কাছে এসেছি কুমারীর সত্তায় তোমার প্রেম এবং অনুগ্রহের যাচনা নিয়ে। তুমি আমাকে বিবাহ করো।
অম্বা অনেক অনুনয়-বিনয় করলেন। মস্তক-স্পর্শ, হৃদয়-স্পর্শের মতো সর্বাঙ্গীন প্রতিজ্ঞা এবং বিশ্বাস বিপর্যস্ত হয়ে গেল শাল্বরাজের রুক্ষতার সামনে। মহাভারতের কবি মন্তব্য করেছেন–সাপ যেমন পুরনো খোলস ছেড়ে দেয়,জীর্ণাং তুচমিবোরগঃ–ঠিক সেইভাবে অম্বাকে ত্যাগ করলেন শাল্বরাজ। অম্বার এত প্রণয়-বচন, এত কাতরোক্তি–সব যে এক নিমেষে ব্যর্থ হয়ে গেল, তার পিছনে শাল্বরাজের আপন মর্মে ব্যাঘাত অজুহাত যাই থাক না কেন, এক্কেবারে শেষে তিনি সত্যি কথাটি বলেছেন।
অম্বা বলেছিলেন–তুমি আমাকে ত্যাগ করেছ বলে আমি যে খুব অস্থানে পতিত হব, তা তুমি ভেব না। ভদ্রলোকেরা নিশ্চয়ই আমাকে আশ্রয় দেবেন। শাম্ব বলেছিলেন–তুমি এখান থেকে যাও! আমার বিনীত অনুরোধ, তুমি ফিরে যাও। যেহেতু ভীষ্ম তোমাকে একবার গ্রহণ করেছেন, অতএব আর আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিতে পারি না, কারণ আমি ভীষ্মকে ভয় করি–বিভেমি ভীষ্মৎ সুশ্রোণি ত্বঞ্চ ভীষ্মপরিগ্রহঃ। হয়তো শাল্বরাজের মুখে অতি সত্যকথনের কারণেই অম্বার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল ভীষ্মের ওপর।
০৬০. সৌভপতি শাল্ব
৬০.
সৌভপতি শাল্ব অম্বাকে ত্যাগ করলে অম্বা খুব কাঁদলেন। শাম্বপুর থেকে বেরিয়ে যাবার সময় বারবার নিজেকে বড় অসহায় মনে হল তার। এক উদ্ভিযৌবনা রমণীর পক্ষে এইভাবে প্রত্যাখ্যাত হওয়াটা তার যৌবনেরই অপমান বলে মনে হল যেন। তার মনে হল–দ্বিতীয়া কোনও যুবতী নেই এই পৃথিবীতে যে নাকি এমন দুরবস্থায় পড়েছে–পৃথিব্যাং নাস্তি যুবতি-বিষমস্থতরা ময়া। ভীষ্ম তাকে উঠিয়ে নিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে তার বাপের বাড়ির আত্মীয়-স্বজন তাকে ত্যাগ করেছেন অনেক আগেই। শাল্বরাজ তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন অতি নির্মমভাবে। অন্যদিকে হস্তিনাপুরে ভীষ্মের কাছে শাধের প্রতি নিজের ভালবাসার কথা এমন সরবে সোচ্চার বলে এসেছেন অম্বা যে, সেখানে আর তার ফিরে যাবার উপায় নেই–ন চ শক্যং ময়া গন্তুং ময়া বারণসাহয়।
শুধু কোথাও গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করা নয়, অম্বার মন এখন দীর্ণ হয়ে উঠল নানা অকারণ স্বগ্রথিত ভাবনার শৃঙ্খলে। যদি এটা না হত, তবে ওই ঘটনাটা ঘটত না, যদি এটা না করে ওটা করতাম, তবে এটা ঘটত না–এইরকম স্বকল্পিত গ্রন্থনার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে অম্বা মনে মনে ভাবলেন–মুখ ফুটে শান্দুরাজার প্রতি আমার প্রেমের কথা জানিয়েছিলাম বলেই তো ভীষ্ম আমাকে সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিয়েছিলেন; এখন আমি কাকে দোষ দেব? নিজেকে? না ওই। ভীষ্মকে?–কিন্তু গাম্যথাত্মানম্ অথ ভীষ্মং দুরাসদম্?
নিজের পিতার ওপরেও অম্বার রাগ হল। ভাবলেন–আমার পিতা-ঠাকুরটিই একটি মস্ত বোকা তোক। তিনিই তো স্বয়ম্বরের আয়োজন করে আমাকে সকলের চক্ষুর সামনে ঠেলে দিলেন–অথবা পিতৰং মূঢ়ং যো মেকাষীৎ স্বয়ম্বর। স্বয়ম্বরের আয়োজনই যদি না হত, তাহলে গোপনে গোপনে শারাজার সঙ্গে বিয়ে হয়ে যেতে পারত আমার। কিন্তু ওই বোকা বদমাশ বাবাটি আমার! স্বার্থপরের মতো তিনি নিজে রাজকীর্তি লোকের সামনে তুলে ধরার জন্য আমাকে বেশ্যার মতো সব রাজার সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। রাজাদের সুবিধে হল–যার গায়ের জোর আছে, তিনিই জিতে নিতে পারেন আমাকে, স্বয়ম্বরের। নিয়মমতো–যেনাহং বীর্যশুকেন পণ্যস্ত্রীব প্ৰচোদিতা! ভীষ্মও তাই করেছেন।
পিতার সঙ্গে সঙ্গে নিজের দোষ স্বীকার করে নিলেন অম্বা। আমরা আগে বলেছি–অম্বা একবারও ভীষ্মের কাছে নিজের অনুরাগের প্রসঙ্গ তোলেননি। না স্বয়ম্বরসভায়, না রথে উঠবার সময়, না রথে যেতে যেতে। এখন তার মনে হচ্ছে-ই। আমি নিজে কী বোকামিই না করেছি? যখন ভীষ্মের সঙ্গে শাম্বের যুদ্ধ হচ্ছিল, তখন যদি আমি ভীষ্মের রথ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছুট্টে শাল্বরাজের কাছে চলে যেতাম! কিন্তু তা তো আমি করিনি এবং এখন তার ফল পাচ্ছি। এখন কারও কাছেই আমার ঠাই নেই–তস্যেয়ং ফলনিবৃত্তি-যদাপন্নাস্মি মূঢ়বৎ।
