অম্বার কথাগুলি শুধু সাময়িকতার আবেগতাড়না মাত্র নয়। সৌভদেশের রাজার ধর্মপত্নী হিসেবে বৃত হতে এসেছেন তিনি। অম্বা বললেন–রাজা আমার! তুমি আমাকে তোমার স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করে ধর্ম পালন করা। আমি তো মনে মনে সুচিরকাল তোমার কথাই ভেবে এসেছি আর তুমিও তো আমাকে তোমার স্ত্রী হিসেবেই চেয়েছিলে–ত্বং হি মে মনসা ধ্যাতত্ত্বয়া চাপপমন্দ্রিতা।
শাল্ব একটু হাসলেন যেন–স্ময়ন্নিব। সে হাসির মধ্যে প্রেমিকের প্রাণ ছিল না অন্তত। ছিল না কোনও আবেগ, উচ্ছ্বাস। সে হাসির মধ্যে যা ছিল, তা অম্বার মতো প্রেমিকার কাছে বিড়ম্বনামাত্র। সেই অদ্ভুত হাসি হেসেই যেন শান্ধ বললেন–তুমি ভুলে যেও না–তোমাকে হরণ করে নিয়ে গিয়েছিল একজন পুরুষ। সেই পুরুষের স্ত্রী হবার জন্যই যে রমণী চলে গিয়েছিল, তাকে আমি অন্তত স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে পারি না–ত্বয়ানপূর্বয়া নাহং ভাৰ্য্যার্থী বরবণিীনি। ঈর্ষান্বিত, অবিশ্বস্ত প্রেমিকের সমস্ত আঘাত হেনে শাহ্ বললেন–ভদ্রে! তুমি ভীষ্মের কাছেই যাও। সে সমস্ত রাজাদের পরাজিত করে তোমাকে জোর করেই ধরে নিয়ে গিয়েছিল, তোমাকে স্পর্শও করেছিল–পরামৃশ্য মহাযুদ্ধে নির্জিত্য পৃথিবীপতীন্। শান্ধ এবার অম্বার হৃদয়ে আঘাত করে বললেন–আরও একটা কথা। ভীষ্ম যখন সমস্ত রাজাদের (শা নিজেকেও এই বচনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছেন নিশ্চয়) যুদ্ধে পরাজিত করে তোমাকে নিয়ে গেলেন, তখন তোমাকে বেশ খুশি-খুশিই তো লাগছিল-ত্বং হি ভীষ্মেণ নির্জিত্য নীতা প্রীতিমতী তদা।
আচ্ছা স্ত্রীলোকের মনের কথা কে বলবে? দেবা ন জানন্তি কুতো মনুষ্যাঃ। যে মুহূর্তে প্রৌঢ়-বৃদ্ধ ভীষ্ম শারাজাকেও অনায়াসে যুদ্ধে প্রতিহত করে তাকে প্রাণদান করে ছেড়ে দিলেন, সেই মুহূর্তে এই যুবতীর অযান্ত্রিক মনের মধ্যে এক মুহূর্তের বিস্ময় অথবা বীরপূজার শ্রদ্ধানুরাগ কাজ করেনি তো? শাম্বকে তিনি মনে-প্রাণে ভালবাসেন সত্যি, তাই বলে শাশ্ব-ভীষ্মের অস্ত্রযুদ্ধে ভীষ্মের অপূর্ব রণকৌশল দেখে কাশীরাজবালার হৃদয় এক মুহূর্তের জন্যও অন্তত আচ্ছন্ন হয়নি তো? যদি হয়ে থাকে, তবে সেই মুহূর্তটুকুও তো মিথ্যে নয়।
শাল্ব কি সেই মুহূর্তেই অম্বার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে ছিলেন? অম্বা কি তখন মুগ্ধ বিস্ময়ে ভীষ্মকে দেখছিলেন। নইলে শাল্বকে তিনি অত ভালবাসেন-সে কথা রথের ওপর দাঁড়িয়েই ভীষ্মকে বললেন না কেন? যে লজ্জা ভেঙে তিনি ব্রাহ্মণদের সভায় এসে সোচ্চারে শাল্বের নাম উচ্চারণ করেছিলেন, ভালবাসার সেই দৃঢ় উচ্চারণ হস্তিনাপুরের গমনপথেই শব্দিত হতে পারত এবং ভীষ্মের কাছেই হতে পারত। আমরা জানি ভীষ্ম বাধা দিতেন না। কিন্তু কী অদ্ভুত ঘটনা ঘটল-অম্বা তো একবারও ভীষ্মের সামনে শাল্বরাজের নামও উচ্চারণ করলেন না! না রথে উঠবার সময়, না রথে চড়ে যেতে যেতে, না তার একান্ত প্রিয়তম শাল্বরাজ যুদ্ধে প্রতিহত হওয়ার সময়! কেন যে বললেন না? অন্তত সেই মুহূর্তে ভীষ্মের মুখের মধ্যে তিনি কী দেখেছিলেন? হয়তো সেই খণ্ড মুহূর্তের মধ্যে অম্বার মুখের দিকে তাকিয়ে শাল্বরাজের মনে হয়েছিল–অম্বা দুঃখিত নন অন্তত। হয়তো একথা ঠিক, হয়তো নয়।
অম্বা আর শাল্বরাজের উত্তর-প্রত্যুত্তর শুনতে লাগে অনেকটা সেই ডেসডিমনা আর ওপেনোর শেষের সেদিনের মতোই। ওথেলো বলেছিলেন–that handkerchief which I so loved and gave thee / Thougay to Cassio.
ডেসডিমনা প্রত্যুত্তর করেছিলেন– No, by my life and soul! Send for the man and ask him. I never did offend you in my life/ never lov’d Cassio…I never gave him token.
অম্বা বলেছিলেন–আমি চিরকাল তোমার প্রিয় কাজ করেছি, তোমারই ভাল চেয়েছি সদা প্রিয়হিতে রতাম্ অর্থাৎ I never did offend you in my life. কিন্তু যে মুহূর্তে শা বললেন–ভীমের সঙ্গে যাবার সময় তোমাকে খুশি-খুশি দেখাচ্ছিল–নীতা প্রীতিমতী তদা–তখন ঠিক ডেসমিনার never lov’d Cassio’র মতোই ভয়ঙ্কর নঞর্থক প্রতিবাদ করে উঠলেন অম্বা–এমন করে বোলো না, রাজা আমার–নৈবং বদ মহীপাল–একথা মোটেই ঠিক নয়। ভীষ্ম আমাকে জোর করে নিয়ে গেলেন, আর আমি খুশি হব? ভাবছ কী করে? আমি এতটুকু খুশি হইনি-নাস্মি প্রীতিমতী নীতা। আমি রীতিমতো কাঁদতে কাঁদতে ভীষ্মের রথে উঠেছিলাম আর তিনি যুদ্ধ জয় করে জোর করে আমাকে তুলে নিয়ে চলে গেলেন-বলাম্নীতাস্মি রুদতী বিদ্রাব্য পৃথিবীপৃতীন্।
শাল্ব বলেছিলেন–যে রমণী একবার অন্য পুরুষের হস্তগত হয়েছিল, তাকে আমি অন্তত স্ত্রী হিসেবে পেতে চাই না। শাস্ত্রবিধি আমার যতটুকু জানা আছে আর আমি যেহেতু রাজা হিসেবে অন্যান্য সকল ব্যক্তিকে ধর্মের উপদেশ দিই, সেই উপদেশকারী রাজা সব জেনেশুনে এক পরপূর্বা রমণীকে ঘরে জায়গা দিতে পারে না–কথমস্যবিধো রাজা পরপূর্বাং প্রবেশয়েৎ। তুমি তোমার যেখানে ইচ্ছে চলে যেতে পার, এখানে সময় নষ্ট করার কোনও দরকার নেই। তোমারমা ত্বং কালো ত্যগাদয়ম।
অম্বা অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। যাকে তিনি এত ভালবাসেন, যার জন্য ঘর ছেড়ে, মর্যাদা ছেড়ে প্রিয়তমের সন্নিধানে পৌঁছেছেন, তার মুখে এই কথা! ভাবলেন–শারাজার অভিমান হয়েছে, একটা অন্য পুরুষ হঠাৎ করে নিয়ে গেল, অভিমান তো হতেই পারে। তাই অম্বা একটু মিনতি করে বললেন-দেখো শাল্বরাজ! আমার বয়স বেশি নয়, আমি নিজে কোনও অপরাধও করিনি, আর সবচেয়ে বড় কথা, আমি তোমাকে ভালবাসি। অতএব আমাকে স্বীকার করতেই হবে তোমায়–ভজস্ব মাং শাবপতে ভাং বালামনাগসাম্।
