সম্বোধনটা খেয়াল করবার মতো। ধর্মজ্ঞ, মানে যিনি ধর্ম জানেন। একটি সুন্দরী রমণী তার মনের কথা বলছেন। এখানে রাজার ধর্ম অনুসারে চললেই হবে না। একটি রমণীর মনের ইচ্ছে-অনিচ্ছের ব্যাপারে ভীষ্মকে এবার ধর্মজ্ঞতার প্রমাণ দিতে হবে। রমণী হেসে বললেন–অনেক আগে, ওই স্বয়ম্বর সভার অনেক আগেই আমি মনে মনে সৌভপতি শাল্বরাজকে মন দিয়েছি–ময়া সৌভপতিঃ পূর্বং মনসাভিবৃতঃ পতিঃ। আর শাল্বরাজও আমার ইচ্ছেতে সাড়া দিয়ে আমাকেই পত্নী হিসেবে বরণ করবেন বলে ঠিক করেছিলেন। এমনকি আমার বাবাও চাইতেন–এই বিয়ে হোক–এষ কামশ্চ মে পিতৃঃ।
কাশীরাজের জ্যেষ্ঠা কন্যার নাম অম্বা। সামান্য তিনটি কথা বলে তিনি বোঝাতে চাইলেন–তার ইচ্ছেটা একটা বিলাসমাত্র ছিল না। একটি পুরুষ এবং একটি মেয়েই শুধু নয়। সম্পূর্ণ দুটি পরিবার এই বিবাহের মন্ত্রণা করেছিলেন আগেই। অম্বা বললেন–স্বয়ম্বর যদি সম্পূর্ণ হত, তাহলে সেই স্বয়ম্বরে আমি সৌভপতি শাল্বকেই বরমাল্য দিতাম–ময়া বরয়িতব্যো ভূচ্ছা-স্তস্মিন্ স্বয়ম্বরে। কিন্তু সে তো আর হয়নি। তার মধ্যে নানা অনর্থ ঘটে গেল। ভীষ্ম সকলকে হরণ করে নিয়ে এসেছেন হস্তিনাপুরের রাজধানীতে। শাল্বরাজ যুদ্ধেও প্রতিহত হয়েছেন। অম্বার তাই কোনও উপায় ছিল না রাজধানীর নির্জন কক্ষে বিরহের দিন কাটিয়ে দেওয়া ছাড়া। কদিন সেইভাবেই গেছে। কিন্তু আজ যখন ভীষ্ম সত্যবতীর অনুমতি নিয়ে ব্রাহ্মণদের ডেকে এনেছেন বিবাহ-উৎসবকে শাস্ত্রীয় রূপ দেওয়ার জন্য, তখন আর তিনি বিলম্ব করতে চাইলেন না।
অম্বার উদ্দেশ্য ছিল দুটি। এক, ভীষ্মের শুভবুদ্ধির কাছে প্রার্থনা জানানো। দুই, যদি তিনি কোনওভাবে অস্বীকৃত হন, তার কথা না শোনেন, ভীষ্মের শুভবুদ্ধি যদি কাজ না করে, তাহলে ধর্মজ্ঞ ব্রাহ্মণেরা তার পূর্বপ্রণয় এবং বাগদানের সংকল্প শুনে অবশ্যই ভীষ্মকে সদুপদেশ দেবেন এবং ব্রাহ্মণ-সভায় ভীষ্মের ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব অত প্রবলভাবে খাটবে না। অম্বা বললেন আমি সমস্ত বিষয় আপনাকে জানালাম, এখন আমার অবস্থা বুঝে যা ধর্ম বলে মনে হয়, তাই ব্যবস্থা করুন, কারণ এ বিষয়ে ধর্ম কী হওয়া উচিত, তাও আপনি জানেন–এত বিজ্ঞায় ধর্মজ্ঞ ধর্মতত্ত্ব সমায়।
অম্বা ভীষ্মের বংশমর্যাদায় আঘাত দিয়ে আরও একটি কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন–আমি অন্য পুরুষকে ভালবেসেছি, ভীষ্ম। সেখানে আপনি রাজধর্ম অতিক্রম করে কী ভাবে আমাকে দিয়ে জোর করে আপনার ভাইকে ভালবাসাবেন? আপনি না কুরুবংশে জন্মেছেন, আপনি না কৌরব! এই কি তার পরিচয়-বাসয়েথা গৃহে ভীষ্ম কৌরবঃ সন্ বিশেষতঃ। অম্বা আরও বলেছিলেন–রাজধর্ম নয়, ভীষ্ম! রাজার অহংকারে আপনি আমাকে হরণ করে আনতে পেরেছেন মাত্র। কিন্তু আপনি আমার অবস্থা বিচার করুন আপনার বুদ্ধি দিয়ে, আপনার মন দিয়ে–এতদ বুদ্ধ্যা বিনিশ্চিত্য মনসা ভরতষভ। অম্বা জানিয়ে দিলেন–শারাজা এখনও আমার জন্য অপেক্ষা করে বসে আছেন নিশ্চয়–স মাং প্রতীক্ষতে ব্যক্ত–অতএব আপনার ধর্মে যাকে সুবিচার বলে, সেই সুবিচার আমার ওপর করুন।
ব্রাহ্মণসভায় সমবেত ব্রাহ্মণদের সামনে অম্বার এই উক্তিতে যথেষ্ট বিব্রত হলেন ভীষ্ম। বুঝলেন–ব্যাপারটা ঠিক হয়নি। যাঁরা বলেন–সেকালের ভারতবর্ষে স্ত্রী-স্বাধীনতা ছিল না, তারা পদে পদে মার খেতেন, তাঁদের কাছে আমরা অম্বার উদাহরণ দিয়ে থাকি। তিনি রাজধানীর অন্দরমহল ছেড়ে বেরিয়ে এসে ব্রাহ্মণদের আলোচনা-সভায় উপস্থিত হতে পেরেছিলেন। নিজের বক্তব্যও পেশ করতে পেরেছিলেন সুশৃঙ্খলভাবে। তাকে মাঝপথে কেউ স্তব্ধ করে দেননি। সবচেয়ে বড় কথা–তার কথা শুনে মহামতি ভীষ্ম তার ভুল স্বীকার করে নিয়েছেন। সমবেত ব্রাহ্মণদের সঙ্গে আলোচনা করে-বিনিশ্চিত্য স ধর্মজ্ঞো ব্রাহ্মণ বেপারগৈঃ–ভীষ্ম অম্বাকে তার স্বাধীন ইচ্ছেমতো চলার অনুমতি দিলেন। পরিষ্কার ভাষায়–ভাই বিচিত্রবীর্যের বিবাহের জন্য মনোনীত কন্যাকে তিনি সমস্ত মানসিক বন্ধন থেকে মুক্তি দিলেন। অম্বা সানন্দে চললেন সৌভপতি শাল্বরাজের সঙ্গে দেখা করার জন্য।
অম্বা হস্তিনাপুর ছেড়ে চলে যাবার জন্য মনস্থ করতেই ভীষ্ম সমস্ত ঘটনা জানিয়েছিলেন সত্যবতীকে। মন্ত্রী, পুরোহিত, ঋত্বিক সবার অনুমতি নিয়ে কয়েকজন বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ এবং একটি ধাত্রীকে তিনি অম্বার সঙ্গে দিলেন, যাতে হস্তিনাপুর থেকে শাপুর যাবার পথে তাঁর সুরক্ষার কোনও অসুবিধে না ঘটে। অম্বা শাপুর পৌঁছলেন, নির্বিঘ্নে দীর্ঘপথ অতিক্রম করে। অন্যের দ্বারা হৃত হওয়া সত্ত্বেও অম্বা যে তার অভীপ্সিত প্রিয়তমের কাছে ফিরে আসতে পেরেছেন, তার জন্য কতই না উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলেন তিনি। শাল্বরাজ যে তাকে দেখে খুব খুশি হয়ে উঠেছিলেন, তা অবশ্য নয়। আর সেই জন্যই এক যুবতী যে কথা বলে না, সে কথাই তাকে বলতে হল শাল্বরাজের সামনে। অম্বা বললেন–বীর আমার! আমি ফিরে এসেছি তোমার কাছে–আগতাহং-মহাবাহো মুদ্দিশ্য মহামতে।
অম্বার সম্বোধনে ‘মহাবাহু’ এবং ‘মহামতি’, এই দুটি শব্দই বড় তাৎপর্যপূর্ণ। মাত্র কদিন আগে ভীষ্মের সঙ্গে যুদ্ধে তিনি রথ, ঘোড়া, সারথি সব হারিয়ে কোনওমতে প্রাণ নিয়ে ফিরেছিলেন। সে কথা ভেবে শাল্বরাজ যদি কোনওভাবে অপ্রতিভ বোধ করেন। তাই অম্বা ভাব দেখাচ্ছেন-যুদ্ধে হারলেও তুমি সেই বীরপুরুষটিই আছ আমার কাছে অথবা সেই বুদ্ধিশালী নায়কটি–মহাবাহো…মহামতে। অম্বা বললেন–আমি তোমার জন্য ফিরে এসেছি, তুমি আমাকে আদর করবে না একটু, তুমি যা চাও, তোমার যাতে ভাল হয়, আমি তো তাই চাই, রাজা আমার! আমি শুধু তোমার আদরটুকু চাই–অভিনন্দস্ব মাং রাজন সাপ্রিয়হিতে রতাম্।
