শাল্বরাজ জানতেন না–ভীষ্ম যে রমণীদের রথে উঠিয়েছেন, তাদের তিনি কামনা করেন না। কিন্তু শুধুমাত্র ভীষ্মের সঙ্গে একথস্থা হওয়ার কারণেই শাশ্ব ভাবলেন–ভীষ্ম বুঝি তার প্রতিদ্বন্দ্বী এক প্রণয়ী। কামনা প্রতিহত হওয়ার ফলেই শাল্বরাজের ক্রোধ সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ভীমের কাছাকাছি পৌঁছেই তিনি হুহংকারে চেঁচিয়ে উঠলেন–থাম, ব্যাটা! থাম্। যাচ্ছিস কোথায়? শাল্বরাজের কথা শোনামাত্রই ভীষ্মের মনের ভিতর ক্ষত্রিয়ের আগুন জ্বলে উঠল-বিধুমো’গিরিব জ্বলন্। সারথিকে বললেন–রথ, ঘুরিয়ে একেবারে শাল্বরাজের মুখোমুখি স্থাপন করো। সারথি রথ ঘোরালেন। এবার ভীষ্ম এবং শাল্বরাজ পরস্পরের সামনাসামনি দাঁড়ালেন। সমবেত রাজারা, যাঁরা এর আগে রণে ভঙ্গ দিয়েছিলেন, তারা সবাই দাঁড়িয়ে গেলেন এই দুই মহাবীরের যুদ্ধকৌশল নিরীক্ষণ করার জন্য–প্রেক্ষকাঃ সমপদ্যন্ত ভীষ্ম-শাম্বসমাগমে।
মহাভারতের কবি আবারও একটা বন্য উপমা দিলেন। বললেন–একটি গাভীর সঙ্গে মিলিত হবার জন্য দুটি বলবান বৃষ যেমন গর্জন করতে করতে পরস্পরের অভিমুখীন হয়– তৌ বৃষাবিব নদন্তৌ বলিনৌ বাসিতান্তরে–তেমনি ভীষ্ম এবং শাল্বরাজ পরস্পরের সম্মুখীন হলেন। আবারও বলি–রথস্থা রমণীর সঙ্গকামনার দৃষ্টিতে ভীকে বৃষ বলা যায় না, কিন্তু রমণীদের তিনি হরণ করে নিয়ে যাচ্ছেন, অতএব অন্য রাজাদের কাছে অথবা স্বয়ং শাল্বরাজের কাছে তিনি গাভীসঙ্গলোভী এক বৃষমাত্র। সেইজন্যই তিনি বন্য উপমা।
ভীষ্মের সঙ্গে শাল্বরাজের যুদ্ধ আরম্ভ হল। ভীষ্ম প্রথমে তাকে অতটা আমল দেননি। অতএব সেই সুযোগে ক্ষিপ্রহস্তে বেশ খানিকটা বাণবৃষ্টি করে ভীষ্মকে তিনি প্রাথমিকভাবে একটু বেকায়দায় ফেলে দিলেন। তাতেও ভীষ্ম খুব একটা ব্যাকুল হননি। কিন্তু দর্শক রাজারা যখন শাল্বরাজের নামে ‘সাধু সাধু’ রব তুললেন, তখন ভীষ্মও খানিকটা নড়েচড়ে দাঁড়ালেন। সারথিকে বললেন-যেখানে ঠিক দাঁড়িয়ে আছেন শাল্বরাজ একেবারে তার সামনে গিয়ে রথটি রাখো তো দেখি। তারপর বাজপাখি যেমন ছোঁ মেরে সাপ ধরে আমিও তেমনি ধরব এই শান্থরাজকে–ভূজঙ্গমিব পক্ষিরা।
সারথি ভীষ্মের কথামতো কাজ করল। তারপর ভীষ্ম প্রথমেই অস্ত্রাঘাতে কাবু করে ফেললেন শাল্বরাজের রথের ঘোড়াগুলোকে। মুহূর্তের মধ্যে শাল্বরাজের সারথি মারা পড়লেন। ভীষ্ম এবার শান্যের ঘোড়াগুলিকে মেরে বাণে বাণে আকুল করে ফেললেন শাল্বরাজকে। শুধু প্রাণমাত্র অবশিষ্ট রেখে শাল্বরাজকে ছেড়ে দিলেন ভীষ্ম। শাল্বরাজ কোনও রকমে জীবন নিয়ে ফিরলেন নিজের রাজধানী শাবপুরে। ভীষ্মও ফিরে চললেন হস্তিনাপুরে।
শাল্বের এই বিমর্দিত অবস্থা দেখে তিন কন্যার একজন অন্তত আকুল দীর্ঘশ্বাস মুক্ত করেছিলেন কিনা ভীষ্ম তা খেয়াল করেননি। যুদ্ধে তিনি অক্ষত থাকলেন। সমস্ত শত্রু বিজয় করে হস্তিনাপুরের বিজয়-কেতন উড়িয়ে দিলেন আপন রথে। তারপর কত বন, কত নদী-পাহাড় পেরিয়ে ভীষ্ম তিন রমণীকে অপার স্নেহে নিয়ে এলেন নিজের রাজধানীতে। শাবের অনুপস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে মহাভারতের কবির উপমা বদলে গেল। বললেন-যে যত্নে এক পুত্রবধূকে রথে চড়িয়ে নিয়ে আসেন পিতা, যে যত্নে বাপের বাড়ি থেকে আপন ভগিনীকে নিয়ে আসেন ভাই, ঠিক সেইভাবেই মহামতি ভীষ্ম কাশীরাজের তিন কন্যাকে নিয়ে এলেন কুরুদেশে–সুষা ইব স ধর্মাত্মা ভগিনীরিব বামুজা। পিতা যেমন যত্ন করে পুত্রের বিবাহের জন্য মেয়ে খুঁজে আনেন, ভীষ্মও সেইরকম ভাই বিচিত্রবীর্যের বিবাহের জন্য তিনটি রমণীরত্ন সংগ্রহ করে আনলেন কাশীরাজ্য থেকে– আনিন্যে স মহাবাহুঃ ভ্রাতুঃ প্রিয়চিকীর্ষয়া।
কন্যা তিনটিকে নিয়ে ভীষ্ম প্রথমে উপস্থিত হলেন জননী সত্যবতীর কাছে। সত্যবতীর চরণ বন্দনা করে ভীষ্ম বললেন-তোমার ছেলের বিয়ের জন্য তিন-তিনটি মেয়ে নিয়ে এসেছি, মা! ওঁদের স্বয়ংবর হচ্ছিল; ফলে বীরত্ব দেখিয়ে অন্য রাজাদের পরাজিত করে ওঁদের রথে তুলে নিয়ে আসার মধ্যে কোনও দোষ ছিল না। আমি তাই করেছি–বিচিত্রবীর্যস্য কৃতে বীর্যশুষ্কা হৃতা ইতি। সত্যবতী ভীষের ব্যবহারে অভিভূত হয়ে গেলেন। কোনওদিনই তিনি এই বয়স্ক পুত্রটিকে অবহেলা করেননি। আজ বৈমাত্রেয় ভাইয়ের জন্য তার ঔৎসুক্য দেখে তিনি অভিভূত হয়ে ভীষ্মের মস্তকাঘ্রাণ করে সার্থক জননীর মতোই বললেন–পুত্র! ভাগ্যিস তোমার কিছু হয়নি। এতগুলো রাজার সঙ্গে যুদ্ধ করে জিতে এসেছ, ভাগ্যিস কিছু হয়নি তোমার-আহ সত্যবতী হৃষ্টা দিষ্টা পুত্র জিতং ত্বয়া।
ভীষ্ম এবার বিমাতা সত্যবতীর সঙ্গে আলোচনায় বসলেন। মেয়ে তিনটিকে রাজধানীতে নিয়ে আসা হল, কিন্তু এবার তো শাস্ত্রসম্মতভাবে ধূমধাম করে তাদের বিবাহ দিতে হবে বিচিত্রবীর্যের সঙ্গে। মাতা সত্যবতী সমস্ত কিছুই ছেড়ে দিলেন ভীষ্মের ওপর। ভীষ্ম এবার ঋত্বিক এবং বৈনিক ব্রাহ্মণদের সঙ্গে আলোচনা আরম্ভ করলেন। বিবাহের দিন-ক্ষণ, মঙ্গল অনুষ্ঠান এবং আড়ম্বর–সব কিছু নিয়েই ব্রাহ্মণদের সঙ্গে আলোচনা হবে।
ব্রাহ্মণরা সভায় বসে আছেন। ভীষ্মও বসে আছেন তাদের সঙ্গে। আলোচনাও চলছে নিয়মমতো। ঠিক এই সময়ে কাশীরাজের জ্যেষ্ঠা কন্যাটি সেই ব্রাহ্মণসভায় উপস্থিত হলেন। তার মনে কোনও ভয়-ডর ছিল না। অধরে ভুবন ভোলানো হাসি। ভীষ্মের কাছে তার কিছু বক্তব্য আছে–জ্যেষ্ঠা তাসাম্ ইদং বাক্যম্ অব্রবীত্ হসতী তদা। কথা শোনার জন্য ভীষ্ম একটু উন্মুখ হতেই কাশীরাজকন্যা বললেন–ধর্মজ্ঞ! আমার সামান্য একটা অনুরোধ আছে।
