এঁরা দশ হাজার বাণ ছাড়ছেন, তো ভীষ্ম সেগুলো কেটে খান খান করে দিচ্ছেন। এঁরা এই তিন-তিনটে বাণ ছাড়েন, তো ভীষ্ম সেসব বাণ কেটে পাঁচ পাঁচটা বাণে তাদের বিদ্ধ করছেন–অস্ত্রচালনায় এমন ক্ষিপ্রতা দেখে শত্রু রাজারাও ভীষ্মের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠলেন–শত্রবোপ অভ্যপূজয়। সোজা কথায় বলা যায়, ভীষ্ম যুদ্ধ জিতলেন এবং নিশ্চিন্ত মনে কল্পিত ভ্রাতৃবধুদের নিয়ে ফিরে চললে হস্তিনাপুরের দিকে, যেখানে তার নিজের লোকেরা আছেন–কন্যাভিঃ সহিত প্রায়াঙারত ভারতা প্রতি।
ভীষ্ম এখনও পর্যন্ত কন্যাদের বলেননি যে, তিনি তাদের পাণিপ্রার্থী নন। তিনি তাদের শুধু রথে বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন মাত্র। যাঁরা এই মুহূর্তে ভীষ্মের এই মৌনতায় ক্ষুব্ধ হন, তাদের জানাই ভীষ্মকে আমরা চিরকাল এক বৃদ্ধ-পিতামহের বৃদ্ধ মানসিকতায় দেখেছি। কিন্তু গভীর অন্তরে তিনি যে এক ভীষণ রসিক মানুষ। যৌবনের প্রথম উম্মাদনায় আত্মস্বার্থ বলি দেওয়ার মধ্যে তিনি যে সরসতা খুঁজে পেয়েছিলেন, সেই সরসতাই তাকে এমন মধুর রসিক করে তুলেছে।
মনে রাখতে হবে তিনি তার পিতার জন্য নির্দিষ্ট আপন বিমাতাকেও নিজের রথে চড়িয়েই নিয়ে এসেছিলেন পিতার সঙ্গে বিবাহ দেওয়ার জন্য–রথমারোপ্য ভাবিনীম্। অতএব সেই পিতার বিবাহের দিন থেকেই তিনি যে কৌরব পরিবারের সময় স্বাত্মপ্রযুক্ত অভিভাবক নিযুক্ত হয়েছিলেন, সেই অভিভাবকত্বের জোরেই আজও তিনি ভ্রাতৃবধূদের রথে চড়িয়ে নিয়ে আসছেন। তাকে কারও কিছু বলবার নেই। পিতা শান্তনুও তাকে কিছু বলেননি, জননী সত্যবতীও তাকে কিছু বলেননি, ভাই বিচিত্রবীর্যও তাকে কিছু বলেননি। অতএব আমরাও কিছু বলব না। যিনি যৌবনের সমস্ত ভোগসুখ পরিহার করে সম্পূর্ণ পরিবারের জন্য আত্মবলি দেন, তার দোষ ধরার মতো আহাম্মক আমরা অন্তত নই।
.
৫৯.
ভীষ্মের অসামান্য অস্ত্রনৈপুণ্যের জন্য মুগ্ধ হয়েই হোক, অথবা ভয়ের জন্যই হোক, অন্যান্য রাজারা আর যখন ভীষ্মের সঙ্গে লড়াই করতে চাইলেন না, তখনি সেই মহাবীর রাজপুরুষকে একাকী দেখা গেল ভীষ্মের পিছনে ধাবিত হতে। ইনি সৌভপতি শাশ্ব। সৌভ জায়গাটা কোথায়–আগেই আমরা বলেছি। আরও একটু ভাল করে বলি–কারও ধারণা, সেটা আরাবল্পী পাহাড়ের পশ্চিমে কোনও জায়গায়। কারও মতে শান্থরা থাকতেন যমুনাতীরবর্তী কোনও অঞ্চলে অর্থাৎ এখনকার গুজরাতের উত্তর-পূর্বে কোনও স্থানে তাদের রাজধানী ছিল। আমাদের আরকিওলজিক্যাল সার্ভে অভ ইন্ডিয়ার বাৎসরিক রিপোর্ট অনুযায়ী শাবপুর বলে বিখ্যাত যে নগরটি শাহুদের প্রধান আবাসভূমি বলে চিহ্নিত ছিল, সেটার নাম লোকমুখে পরিবর্তিত হয়ে প্রথমে হয়েছিল শাওয়ার। তারপর সেটা থেকে ‘হালওয়ার’, (তালব্য ‘শ’ যে কেমন করে ‘হ’ হয়ে যায়, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ পূর্ববঙ্গীয় উচ্চারণে ‘হালায় কয়’)। আর হালওয়ার থেকে এখনকার আলওয়ার।
আমরা এর আগে ‘আলওয়ার’ অঞ্চলটাকে প্রাচীন মৎস্যদেশের অন্তর্গত কোনও স্থান বলে। উল্লেখ করেছি। বলেছি–তখনকার মৎস্যদেশ হল জয়পুর, ভরতপুর এবং আলোয়ার অঞ্চল। কিন্তু এই যে সময়ের কথা বলছি, তখনও মৎস্যদেশের সীমা সংকুচিত ছিল হয়তো। কারণ মৎস্যদেশ তখন সবে রূপ পরিগ্রহ করছে। মহাভারতের মধ্যে শারা অনেক সময়েই মৎস্যদেশীয়দের সঙ্গে যুগ্মভাবে উল্লিখিত হয়েছেন–শামৎস্যস্তথা। এতে বোঝা যায় শাদের রাজ্য মৎস্যদেশের অব্যবহিত পাশের রাজ্য। পানিনির সূত্র এবং ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলির। প্রমাণে এ কথা জোর দিয়েই বলা যায় যে, শাশ্বরা সে যুগে যথেষ্ট পরিচিত জনজাতির অন্যতম ছিলেন। পরবর্তী সময়ে শাম্বরাজা মারা যাবার পর মৎস্যদেশের একক গুরুত্ব বেড়ে যাবার পরপরই হয়তো শাল্বপুর বা আলওয়ার (আলোয়ার) অঞ্চল মৎস্যদেশের অন্তর্ভূত হয়।
কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে যে রাজাটিকে আমরা ভীষ্মের পশ্চাদ্ধাবন করতে দেখলাম, তিনি। প্রবল পরাক্রান্ত এক নৃপতি। দেশ বা জনজাতির প্রধান হিসেবে তার নামও শাশ্ব। ভীষ্ম যে তিনটি রমণীকে নিয়ে রথ চালিয়ে দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠা যিনি, তাঁর সঙ্গে শারাজার পূর্ব-প্রণয় ছিল। কাশীরাজের স্বয়ম্বর সভাটিকে শান্ধরাজ ব্যবহার করতে। চেয়েছিলেন বিবাহের সাধন হিসেবে। ঠিক ছিল–স্বয়ম্বরসভায় অন্যান্য রাজাদের সঙ্গে শারাজাও বরাসনে বসে থাকবেন সাধারণ পাণিপ্রার্থী বিবাহেচ্ছু রাজাদের মতোই। কাশীরাজার কন্যারা সভায় আসবেন বরমাল্য হাতে করে এবং পূর্বপ্রণয়িনী রমণীটি ভাল মানুষের মতো শান্থরাজার গলায় মালা দিয়ে পূর্বপ্রণয়ের সিদ্ধি ঘটাবেন বিবাহের রূপান্তরে। কিন্তু ভীষ্মের জন্য প্রণয়ীযুগলের সমস্ত পরিকল্পনা বিপর্যস্ত হয়ে গেল। কোনও কিছু ঘটবার আগেই সমবেত রাজমণ্ডলীর সঙ্গে ভীষ্মের কথা-কাটাকাটি আরম্ভ হল এবং ভীষ্ম সদম্ভে তিন। কন্যাকে রথে চড়িয়ে রথ চালিয়ে দিলেন হস্তিনাপুরের দিকে।
রাজারা যখন ভীষ্মকে সমবেতভাবে আক্রমণ করলেন, তখন তাদের মধ্যে বিবাহভ্রষ্ট শাল্বরাজও ছিলেন। তিনিও একই সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন। কিন্তু অন্যান্য রাজারা যখন রণে ভঙ্গ দিলেন, তখন শাল্বরাজ আত্মপ্রকাশ করতে বাধ্য হলেন। একান্ত ব্যক্তিগত ক্রোধে উদ্দীপিত হয়ে শাল্বরাজ একা ধাওয়া করলেন ভীষ্মের পিছন পিছুর। মহাভারতের কবি এক বন্য উপমা ব্যবহার করেছেন এই মুহূর্তে। বলেছেন–একটি সাধারণ হস্তী যখন হস্তিনীর পিছন পিছন যেতে থাকে, তখন কামোন্মত্ত হস্তী-যুথপতি যেমন হুড়মুড়িয়ে এসে পূর্বোক্ত হস্তীটির পিছনে দাঁত দিয়ে আঘাত করে তাকে সরিয়ে দেয় এবং নিজেই হস্তিনীর অনুসরণ করে,-বারণং জঘনে ভিন্ দন্ত্যাভ্যামপরো যথা–মহারাজ শাল্বও তেমনি এসে ভীষ্মের পিছনে আঘাত করে তার অভীপ্সিতা রমণীর পশ্চাদগামী হতে চাইলেন।
