ভীষ্মের বৃদ্ধত্ব নিয়ে কাশীরাজের তিন কন্যা যে যথেষ্ট বিব্রত বোধ করেছিলেন, তা তাদের ভাবভঙ্গি, এবং পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা থেকেই বোঝা গেল। অপাক্রান্ত তাঃ সর্বা বৃদ্ধ ইত্যেব চিন্তয়া। সভায় সমাগত রাজবৃন্দের মধ্যে শোরগোল আরম্ভ হল। সভায় যারা অল্পবুদ্ধি আর। চটুল রাজা ছিলেন, তারা অকথা-কুকথা বলতে আরম্ভ করলেন ভীষ্মের নামে। বলতে লাগলেন–ভীষ্ম লোকটাকে ধার্মিক বলে জানতাম। ব্যাটা বুড়ো ভাম, গায়ের চামড়া ঝুলে পড়েছে, মাথার চুল পুরো পাকা অথচ কেমন বেহায়া দেখুন, বিয়ে করার লোভে এখানে ঠিক এসে জুটেছে-বৃদ্ধ পরমধর্মাত্মা বলীপলিতধারণঃ। কিং কারণ ইহায়াতঃ… অন্য এক তরুণ রাজা চিমটি কেটে বললেন–আরে মশাই! আমরা তো ছোটবেলা থেকে শুনেছি–উনি নাকি আবার বেম্মচারী। উনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন–জীবনে আর বিয়ে করবেন না। তা এখন লোকে শুনলে কী বলবে? এত প্রতিজ্ঞা, এতসব ব্রহ্মচারীর ব্রত–তার কী গতি হল মশাই-ব্রহ্মচারীতি ভীষ্মে হি বৃথৈব প্রথিতো ভুবি।
রাজারা কথাও যেমন বলতে লাগলেন, হো হো করে হাসতে লাগলেন সেই রকম। রাগে ঘৃণায় তার শরীর জ্বলে উঠল। যিনি পরশুরামের অস্ত্রশিষ্য তাকে কিনা এই ধরনের অপমান। এক লহমার মধ্যে তিনি নেমে এলেন বরাসনের মঞ্চ থেকে। পলায়মান তিনটি সুন্দরী কন্যাকে যাত্রাপথেই থামিয়ে দিয়ে টেনে তুললেন নিজের রথেরথমারোপ্য কন্যাঃ ভীষ্ম প্রহরতাং বরঃ
আমাকে অনেকে ব্যক্তিগতভাবে প্রশ্ন করেন–কী প্রয়োজন ছিল ভীষ্মের? কাশীরাজ্যে তার নিজের যাবার কী প্রয়োজন ছিল? আর গেলেনই যখন, তখন গিয়ে কেন বললেন না–আমি নয়। আমি আমার বৈমাত্রেয় ভাই তরুণ বিচিত্রবীর্যের জন্য কাশীরাজের মেয়ে তিনটিকে নিয়ে যেতে এসেছি। না, ভীষ্ম এসব বলেননি, বলার প্রয়োজনও বোধ করেননি। তিনি জানেন–ক্ষত্রিয়রা নিজের জোরে কন্যা হরণ করে বিয়ে করে। দরকার হলে তিনিও তাই করবেন। অত কথার দরকার কী? তিনি তো ক্ষমতার বলে, সম্মানে কারও চেয়ে খাটো নন। এই অতুল ক্ষাত্রশক্তির প্রসঙ্গ তো আছেই, তা ছাড়া আরও একটা কারণ আছে। তবে সে কারণ খুঁজতে গেলে মহামতি ভীষ্মের অবচেতন মনের মধ্যে ঢুকতে হবে এবং সেই অবচেতনার কথা মহাভারতের কবি স্বকণ্ঠে বলেননি।
একটা কথা ভাবুন–আমরা এমন মানুষ দেখেছি–পুরুষ অথবা স্ত্রী, যাঁরা এই জন্মে আর বিয়ের পিড়িতে বসলেন না, তাদের বয়সের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেরই মনের পরিণতি ঘটে না। অন্তত বিবাহিত মানুষের যে পরিণতি ঘটে, সেই পরিণতি ঘটে না। সেই যৌবনকাল থেকে তারা যে কৌমার্য বা কুমারীত্ব বহন করেন, বয়সকালেও সেই কৌমার্যের মনটুকু যায় না। ভীষ্মের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। ভাই বিচিত্রবীর্যের জন্য তিনি মেয়ে আনতে গেছেন বটে কিন্তু স্বয়ংবর-সভার বরাসনে বসলে যে আমোদটুকু হয়, সেই আমোদমাত্রই তিনি উপলব্ধি করতে চেয়েছেন, তার বেশি কিছু নয়। তাঁর অসীম শক্তি আছে, নিপুণ অস্ত্রকৌশল তার অধিগত, অতএব তরুণ রাজাদের মতো একই সঙ্গে সমাসনে বসলেই বা আমায় কে কী করতে পারে–এইরকম বেপরোয়া ভাব নিয়েই ভীষ্ম একটু আমোদ পেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রখর বাস্তব সে আমোদ পেতে দিল কই? সুন্দরী তিন কন্যা ‘বৃদ্ধ’ বলে মুখ বেঁকিয়ে চলে গেলেন, তরুণ রাজারা বৃদ্ধের আমোদে দুয়ো দিলেন। ভীষ্মের ক্রোধাগ্নি উদ্দীপ্ত হল।
এমন কি তখনও তিনি একবারও ঘোষণা করে বললেন না–আমি নই, আমার ভাইয়ের জন্য আমি এই বিবাহ-সভায় এসেছি। বিশেষত তিন রমণীর তাচ্ছিল্য দেখে তার এতই রাগ হল যে, তিনি আরও বেশি করে এমন ভাব করলেন যেন-বুড়ো তো বুড়ো, তোরা স্বয়ম্বরা হয়েছিস, আর আমিও ক্ষত্রিয় পুরুষ, জোর করে ধরে নিয়ে যাব। ভীষ্ম তিন সুন্দরীকে রথে তুললেন আর রাজাদের উদ্দেশ করে বললেন-এই যে মহাশয়রা! এতক্ষণ খুব বড় বড় কথা বলছিলেন। বিয়ে তো আর এক রকম নয়, অনেক রকম। কেউ মেয়েকে সাজিয়ে-গুজিয়ে গুণবান পুরুষের হাতে তুলে দেয়, কেউ বা বরের কাছ থেকে পণ নিয়ে মেয়েকে বিয়ে দেয়। কেউ ভালবেসে বিয়ে করে, আবার কেউ বা জোর করে ধর্ষণ করে, তারপর বিয়ে করে। যজ্ঞের মাধ্যমে কেউ বিয়ে করে আবার বাপ-মা খুশি হয়েও বিয়ে দেয়। বিয়ের এত সব উপায়, এত সব পথ। কিন্তু আমরা হলাম গিয়ে ক্ষত্রিয় পুরুষ। ক্ষত্রিয় পুরুষেরা স্বয়ম্বর ব্যাপারটাই বেশি পছন্দ করেন এবং তারা শত্রুপক্ষকে যুদ্ধে জয় করেই কন্যা হরণ করে। এইরকম বিয়েই আমাদের পক্ষে প্রশস্ত–প্রমথ্য হৃতামাহু-র্জায়সীং ধর্মবাদিনঃ।
ভীষ্ম এবার সমবেত রাজাদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বললেন–এই আমি আপনাদের সামনে এই মেয়ে তিনটিকে রথে তুললাম বাড়িতে নিয়ে যাবার জন্য–জিহীর্যামি বলা ইতঃ আপনাদের ক্ষমতা থাকে তো আটকান। আমি যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছি–স্থিতো’হং পৃথিবীপালা যুদ্ধায় কৃতনিশ্চয়ঃ। কাশীরাজকে শুনিয়ে শুনিয়ে রাজাদের যুদ্ধাহ্বান জানালেন ভীষ্ম এবং সঙ্গে সঙ্গে তিন সুন্দরীকে রথে চড়িয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে চললেন হস্তিনাপুরের উদ্দেশে।
ভীষ্মের কথা শুনে বিবাহেচ্ছু রাজাদের ক্রোধ চরম বিন্দুতে পৌঁছল। যে কন্যাগুলিকে তারা নিজেদের ভবিষ্যদুভোগ্যা ভেবে আনন্দ লাভ করছিলেন, তাদের তুলে নিয়ে গেল এক বুড়ো। রাজারা হাত কামড়ে, ঠোঁট কামড়ে শেষ পর্যন্ত বরের সাজ মণিমুক্তোর মালা গলা থেকে খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। যুদ্ধের জন্য পরিধান করলেন লোহার বর্ম। তারপর সবাই একযোগে হা-রে-রে-রে শব্দ তুলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন ক্রমবিলীয়মান ভীষ্মের ওপর। ভীষ্ম একা, রাজারা অনেকে। ভয়ঙ্কর যুদ্ধ আরম্ভ হল–একস্য চ বহুনাঞ্চ তুমুলং লোমহর্ষণম্।
