সমস্ত পুরাণ, এমনকি মহাভারতের থেকেও ভাগবত পুরাণ ব্যাপারটা ধরেছে খুব ভাল। এখানে দেখা যাচ্ছে–পরীক্ষিত রাজা হয়েই খেয়াল করলেন যে, তার রাজমণ্ডলের সর্বত্র কলি ঢুকে পড়েছে–যদা পরীক্ষিত কুরু-জাঙ্গলে বসন/কলিং প্রবিষ্টং নিজচক্রবর্তিতে। দেখুন, কলি একটা মানুষ নয় মোটেই, যে রাজ্যে ঢুকে পড়ল। কলি মানে সেই লোভ, হিংসা, মিথ্যা আর কুটিলতা। পুরাণকার সব অন্যায়-অত্যাচারের প্রতিরূপে কলিকে একটা মানুষের চেহারা দিয়েছেন। পরীক্ষিত যেই খবর পেলেন–কলি ঢুকে পড়েছে, অমনই তিনি ধনুক-বাণ হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন–কলিকে মারবার জন্য। পরীক্ষিতের দিগ-বিজয় শুরু হল।
তারপর ভদ্ৰাস্ব, কেতুমাল, উত্তর-কুরু-সব ঘুরে এসে পরীক্ষিত একটা আশ্চর্য ঘটনা লক্ষ্য করলেন। পরীক্ষিত দেখলেন–একটি ষাঁড় দাঁড়িয়ে আছে। তার তিনটে পা-ই ভাঙা আর তার কাছেই দাঁড়িয়ে আছে একটি গরু–এমন করুণ তার অবস্থা যেন সদ্য তার বাছুরটি মারা গেছে–বিবৎসামিব মাতরম্। ষণ্ড-বৃষ এবং গাভী দু’জনেই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
ভারতের ভাবনা-রাজ্যে রূপকের একটা বিশাল জায়গা আছে। আধুনিকেরা যারা চলচ্চিত্রে, কবিতায়, স্থাপত্যে অথবা ছবিতে ‘সিমবলিজম’ নিয়ে উদ্বাহু নৃত্য করেন, আর অনেকটাই না বুঝে বিস্ময়মুকুলিত নেত্রে বক্তৃতা দেন, তাদের আগে নিজের দেশের সিমবলিজম’গুলো বুঝতে অনুরোধ করি, তারপর পিকাসোরদা, কামু-কাফকা নিয়ে যা বলবেন, শুনব। এই যে ষণ্ড-বৃষটিকে এইমাত্র দেখলেন পরীক্ষিত, ইনি আসলে ধর্ম। দেবদেব মহাদেবকে যে আপনারা বৃষ-বাহন দেখেন, তিনি আসলে ধর্মবাহন, জ্ঞান-বাহন। সত্য-ক্রেতা-দ্বাপর-কলি, এই চার যুগ ষাঁড়ের চার পা। সত্য-ক্রেতা-দ্বাপর-সত্যযুগে ধর্মের রমরমা অতএব ষাঁড়ের চার-পা’ও ঠিক-ঠাক। ত্রেতাতে ষাঁড়ের এক পা ভেঙে গেছে, সে তিনপায়ে দাঁড়িয়ে। দ্বাপরে অন্যায়-অধর্ম বেড়ে গেল। দুই পায়ে দাঁড়িয়ে রইল ষাঁড়। আর কলিতে তার তিন পাই ভেঙে গেছে, এক পায়ে নড়বড়ে হয়ে কোনওমতে দাঁড়িয়ে আছে, যাকে বলি ধর্মের ষাঁড়।
আর ওই যে গাভীটিকে দেখলেন পরীক্ষিত, উনি হলেন পৃথিবী। গাভীকে আমরা দোহন করে দুগ্ধ বার করি, তেমনই পৃথিবীকেও আমরা দোহন করে শস্য বার করি, খনিজ-পদার্থ বার করি। সেইজন্য গাভী পৃথিবীর প্রতিরূপ। পরীক্ষিত দেখলেন বৃষরূপী ধর্ম আর গাভীরূপিণী পৃথিবীর মধ্যে নানা সুখ-দুঃখের কথা হচ্ছে। কৃষ্ণ যখন বেঁচেছিলেন, পাণ্ডবরা যখন রাজ্য শাসন করছিলেন, তখন কত সুসময় ছিল আর এখন কলি এসে কী দুরবস্থা করেছে–এই সব তারতম্যের আলোচনা চলছে। পরীক্ষিত দেখলেন; কিন্তু ওই গোমিথুনকে তিনি ধর্ম আর পৃথিবী বলে তখনও বোঝেননি।
তৃতীয় আরও একটি সত্তার উপস্থিতিও পরীক্ষিতের নজর এড়াল না। পরীক্ষিত দেখলেন– একটি লোকলোকটির আচার-আচরণ বর্বরের মতো–সে একবার নিস্তেজ ষণ্ডটিকে লাথি মারছে, আরেকবার গাভীটিকে লাথি মারছে। তার হাতে একটা লাঠি এবং সেই লাঠি দিয়ে দুটি প্রাণীকে সে মেরে ফেলার ভয়ও দেখাচ্ছে। ধর্মরূপী বৃষটি নিরুপায় এক পায়ে দাঁড়িয়ে এবং লোকটির বিভীষিকায় সে প্রস্রাব করে ফেলেছে–মেহন্তমিব বিভ্যত। লোকটার ভাব-সাব রাজার মতো, আচরণ নির্ভীক, এবং তাকে দেখতে যেমনই হোক, সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হল, তার জামা-কাপড় আসল সোনার জরি দিয়ে মোড়ানো। পরীক্ষিত এই কম্পমান গোমিথুন এবং এই জঘন্য লোকটিকে দেখে তাদের সামনে রথ থামালেন। লোকটিকে বললেন, কে হে তুমি, আমার রাজত্বে বাস করে দুর্বল পশু দুটির ওপর জোর খাটাচ্ছ? দেখতে তো বেশ রাজার মতো, গায়ে এমন সোনার পিরান, অথচ কাজটা যে করছ–সেটা রাজোচিতও নয় ব্রাহ্মণোচিতও নয়– নরদেববাসি বেশেন নটবং কর্মণাদ্বিজঃ।
পরীক্ষিত বেশ রেগেই গেলেন। বললেন, কী ভেবেছ তুমি? আজকে কৃষ্ণ ধরাধামে নেই বলে, গাণ্ডীবধ অর্জুন নেই বলে তুমি যা ইচ্ছে তাই করবে? নিরপরাধ প্রাণীকে তুমি এইভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে পীড়ন করবে? আজ তোমার নিস্তার নেই, তোমার মৃত্যু নিশ্চিত জেনো। পরীক্ষিত এবার ধর্মরূপী বৃষ এবং গোরূপা পৃথিবীকেও চিনে ফেললেন এবং তাদের অবস্থা দেখে কলিকেও চিনতে তার দেরি হল না। সঙ্গে সঙ্গে শাণিত খঙ্গ হাতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন কলিকে মারার জন্য-নিশাতমাদদে বঙ্গং কলয়ে’ধর্মহেতবে। কলি দেখল- মহা-বিপদ। প্রাণে মারা যাবার চেয়ে রাজার পায়ে পড়া ভাল। কলি রাজার পা জড়িয়ে ধরল।
পরীক্ষিত বললেন, ঠিক আছে, তুমি প্রাণে বাঁচলে বটে, কিন্তু আমার রাজ্যে তোমার জায়গা হবে না এক রত্তি।–ন বর্তিতব্যং ভবতা কথঞ্চন/ক্ষেত্রে মদীয়ে ত্বমধর্মবন্ধু। পরীক্ষিত পায়ে-পড়া কলিকে তার অকরুণার কারণ দেখিয়ে বললেন, তোমার মতো অধর্মের বন্ধু যদি আমার রাজ্যে থাকে, তাহলে আমাদের প্রজাদের মধ্যে হিংসা, লোভ, দম্ভ-অহঙ্কার, খুন, রাহাজানি, চুরি-বদমাশি–সবই অত্যন্ত বেড়ে যাবে।
এই যে শব্দগুলো উচ্চারণ করলেন পরীক্ষিত, এইগুলোই কলির স্বরূপ। কবিরা দম্ভ-অহংকার আর নানা অসদ গুণের রূপ কল্পনা করে তার নাম দিয়েছেন কলি। পরীক্ষিত বললেন, তোমার সাহস তো কম নয় বাপু। এই ব্রহ্মাবর্ত কত পবিত্র স্থান! সরস্বতী আর দৃষদ্বতী নদীর মাঝখানের এই জায়গাটুকুতে ব্রাহ্মণ সমাজের কত পবিত্রতার স্মৃতি। ব্রাহ্মণরা এখানে কত মন্ত্রে যজ্ঞেশ্বর বিষ্ণুকে আবাহন করেন-যজ্ঞেশ্বরং যজ্ঞ-বিতানবিজ্ঞাঃ। আর তুমি কিনা সেইখানে দাঁড়িয়ে ব্রাহ্মণদের সমস্ত আন্তর ধর্মের প্রতীক একটি গোমিথুনকে মারতে চাইছ? বেরও, বেরিয়ে যাও তুমি আমার রাজ্য থেকে।
