চিত্রাঙ্গদের রাজত্বকালে ভীষ্ম উদাসীন ছিলেন। পৈতৃক রাজ্য তিনি পাননি অথচ তাঁর পিতার অন্য পুত্র রাজ্যশাসন করছেন। তিনি যদি কোনও কথাই ভীষ্মকে না জিজ্ঞাসা করেন, তাহলে তিনিই বা আগ বাড়িয়ে উপদেশ দিতে যাবেন কেন? এর ফল যা হবার তাই হয়েছে। কিন্তু চিত্রাঙ্গদের মরণাস্তিক উদাহরণ দেখে তার কনিষ্ঠ, বিচিত্রবীর্য, দেখে শিখেছেন। অতএব তিনি রাজত্ব চালাতে লাগলেন ‘ধর্মার্থকুশল’ ভীষ্মের অভিভাবকতায় আস্থা রেখে। ভীষ্মও তাই। কুমার বিচিত্রবীর্যকে যথোপযুক্ত রাজনৈতিক উপদেশ দিয়ে সর্বসময় তাকে রক্ষা করে চলতেন–স চৈনং প্রত্যপালয়ৎ।
বাস্তব ঘটনা যা দাঁড়াল, কুমার বিচিত্রবীর্য হস্তিনাপুরের সিংহাসন অলংকৃত করে রাখলেও এই কিশোর বালকটির সমস্ত দায়িত্বভার ভীষ্মের হাতেই তুলে দিয়েছিলেন সত্যবতী। ফলত রাজ্যের শাসনও চালাতে হত স্বয়ং ভীষ্মকেই। যদিও শাসন সংক্রান্ত সমস্ত ব্যাপারেই ভীষ্ম আগে সত্যবতীর মত গ্রহণ করতেন-পালয়ামাস তদ্রাজ্যং সত্যবত্যা মতে স্থিতঃ–এবং এটাই ছিল তার বুদ্ধিমত্তা। যিনি পিতার প্রণয়-সন্তুষ্টির জন্য নিজের সংসার-সুখ, বাৎসল্য-সুখ বলি দিলেন, সেই পিতার প্রথম পুত্র তাকে মানল না–এ দুঃখ তার কাছে সইবার নয়। কাজেই বুদ্ধিশালিনী সত্যবতীর বুদ্ধিতে কুমার বিচিত্রবীর্যের ভার যখন ভীষ্মের ওপর এসে পড়ল, তখন যেন তিনি ধন্য হয়ে গেলেন। অসীম মমতায় তিনি এই বৈমাত্রেয় ভাইটির সমস্ত দায়িত্ব আত্মসাৎ করলেন যেন।
হস্তিনাপুরের রাজকুমার বিচিত্রবীর্য একটু বড় হতেই ভারি সুন্দর হয়ে উঠলেন। রাজকুমারের তারুণ্যের অভিসন্ধিতে ভীষ্মের নতুন দায়িত্ব এসে গেল। পিতৃকল্প সর্বজ্যেষ্ঠ ভ্রাতা পুত্ৰকল্প বিচিত্রবীর্যের যৌবনসন্ধিতে চিন্তান্বিত হলেন। তার প্রথমে মনে হল–ভাইয়ের বিয়ে। দিতে হবে–ভীমো, বিচিত্রবীর্যস্য বিবাহায়াকরোল্মতি। নানা লোকের সঙ্গে নানা কথায় ভীষ্মের কানে এল–কাশীর রাজার তিনটি মেয়েই স্বয়ংবরা হবেন। ভীষ্ম জননী সত্যবতীর মতামত জানতে চাইলেন।
সেকালের দিনে কাশীর রাজার সম্মান ছিল যথেষ্ট। কাশীর উত্তরে হুল কোশল, দক্ষিণে চেদি-করূষ, পূর্বে মগধ আর পশ্চিমে বৎসদেশ। বৌদ্ধগ্রন্থ গুট্টিলজাতকে কাশীনগরীকে সেকালের সমস্ত নগরীর শ্রেষ্ঠতমা বলে বলা হয়েছে। সম্ভব-জাতক আবার সেকালের মিথিলা আর যুদ্ধিষ্ঠিরের ইন্দ্রপ্রস্থের সঙ্গে কাশীর তুলনা দিয়ে বলেছে–কাশী নগরীর আয়তন হল বার। যোজন, যেখানে মিথিলা অথবা ‘ইন্দপত্ত’র আয়তন মাত্র সাত যোজন–দ্বাদশযোজনিকং সকল-বারাণসী-নগর।
পুরাণে-ইতিহাসে কাশীর রাজা ব্রহ্মদত্তের মাহাত্ম কীর্তন করা হয়েছে একাধিকবার। এবং ব্রহ্মদও একজন নন, অনেকজন। আর শুধু পুরাণ-ইতিহাসই বা বলি কেন বৌদ্ধগ্রন্থ মহাবও এ ব্যাপারে সহমত পোষণ করে। মহাবগ্নের বর্ণনায়–ব্রহ্মদত্ত ছিলেন যেমন বলী, তেমনই ধনী। যেমন ভোগী, তেমনই পরাক্রমশালী-বারানস্যাং ব্রহ্মদত্তো নাম কাশীরাজা অহহাসি অড়ঢ়ো মহদ্ধনোমহাভোগো মহাবলো মহাবাহনো মহাবিজিততা পরিপুঃ-কোষ-কোঠঠাগারো। পুরাণে একাধিক বিখ্যাত ব্ৰহ্মদত্তের নাম পাওয়া যায়। কাশীর রাজাদের মধ্যে অলক, প্রতর্দনের নামও ভারতজোড়া। বিশ্বকাসেন, উদকসেন কিংবা ভল্লাটের নামও মহকীর্তি কাশীরাজদের অন্যতম।
বৌদ্ধগ্রন্থে দেখা যাবে কাশীর রাজা ব্ৰহ্মদত্তরা (পর পর ব্রহ্মদত্তের বংশধরেরা) কোশল রাজ্যটিও জয় করে নিয়েছিলেন। আমাদের ধারণা, মহাভারতের ভীষ্ম যখন কাশীরাজের তিন কন্যার কথা শুনলেন, তখনও কোশল রাজ্যটি কাশীর অন্তর্ভুক্ত ছিল, কারণ, এই তিন কন্যাকে কাশীরাজের মেয়ে ছাড়াও বারবার ‘কৌশল্যা বলে ডাকা হয়েছে। যাই হোক সত্যবতী কাশীরাজের সম্মান জানতেন। অতএব ভীষ্ম বলামাত্রই তিনি তার তরুণ পুত্রের অভিভাবকের সমস্ত মন্ত্রণা মেনে নিলেন।
ভীষ্ম সঙ্গে কোনও সেনাবাহিনী নিলেন না। যাবার আগে তিনি শুধু জননী সত্যবতীর অনুমতি নিলেন, তারপর একটি সুসজ্জিত রথে করে একা রওনা হলেন কাশী। ভীষ্ম শুনেছেন-কাশীরাজের তিনটি মেয়েই বড় সুন্দরী-কন্যাস্তিস্রো’রোপমাঃ–অতএব মনে মনে ঠিক করলেন-তিনটি মেয়েকেই তিনি বিয়ে দেবেন তরুণ বিচিত্রবীর্যের সঙ্গে। ভাইকে তিনি বড় স্নেহ করেন। ভীষ্ম কাশী পৌঁছলেন ঠিক স্বয়ংবরের দিন। দেখলেন–রাজারা সবাই এসে উপস্থিত হয়েছেন রাজসভায়। বিচিত্র আসন মঞ্চে সমাসীন হয়ে তারা কাশীরাজের তিন কন্যার অপেক্ষায় আছেন। ভীষ্মও কাশীর স্বয়ংবরসভায় একটি আসনে বসে গেলেন।
অপরূপ সাজে সেজে বিবাহের লজ্জাবস্ত্র মাথায় দিয়ে তিন কন্যা উপস্থিত হলেন রাজার সভায়। রাজারা নড়েচড়ে বসলেন। কেউ তার কেশরাশি সুবিন্যস্ত করলেন, কেউ বা বহুমূল্য বস্ত্র, অলংকারের বিন্যাস শেষবারের মতো পরীক্ষা করে নিলেন। প্রৌঢ় বৃদ্ধপ্রায় ভীষ্ম বসে রইলেন দৃঢ়ভাবে কোনও কিছুর তোয়াক্কা না করে।
সভায় উপস্থিত বিবাহেচ্ছু রাজাদের নাম এবং পরিচয় দেওয়া আরম্ভ হল। ইনি বৎসদেশের রাজা, উনি অবন্তীর, তিনি শ্রাবস্তীর–এই রকম রাজনাম উচ্চারণের সঙ্গে তিন কন্যা সেই সেই রাজাদের সামনে দাঁড়িয়ে খানিক নিরীক্ষণ করে অপছন্দের মুদ্রা দেখিয়ে চলে যেতে লাগলেন। বিবাহ-কৌতুকিনী তিন কন্যা এবারে মহামতি ভীষ্মের সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং তাকে প্রৌঢ়-বৃদ্ধ দেখে প্রায় ছুটেই পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। হয়তো তারা ভাবলেন–স্বয়ংবর সভার মান বুঝি যথেষ্ট নেমে গেছে, নইলে প্রৌঢ়-বৃদ্ধরাও এসে ভিড় বাড়ান কী করে!
