চিত্রাঙ্গদ রাজা বলদর্পী মানুষ। দেবতাই হোন অথবা গন্ধর্ব, তাদের সব কথা তার কাছে উন্মত্তের প্রলাপ। তিনি কাউকে মানেন না। অতএব দুজনেই পরস্পরকে গালাগালি দিতে দিতে-ইত্যুক্তঃ গর্জমানৌ তৌ–যুদ্ধ করার জন্য হিরন্মতী নদীর তীরে পৌঁছলেন। জায়গাটার নাম কুরুক্ষেত্র, যা আসলে এক বিশাল যুদ্ধভূমি। দুজনের যুদ্ধ আরম্ভ হল এবং মহাভারতের সংবাদ অনুযায়ী এই যুদ্ধ চলল তিন বৎসর ধরে। আমাদের ধারণায় এই সময়ের বিস্তার হয়তো তিন দিন, তিন মাস নয়, তিন বছরও নয়। যুদ্ধের গরিমা প্রকাশ করার জন্য পৌরাণিক কল্পনায় তিন দিন তিন বছরে পরিণত হয়েছে। দুই চিত্রাঙ্গদের মধ্যে অস্ত্রযুদ্ধ হয়েছিল পরম্পর। এককভাবে এবং এই যুদ্ধে কূটকৌশলের জোরে গন্ধর্বরাজ জিতে গিয়ে কুরুরাজ চিত্রাঙ্গদকে মেরে ফেললেন।
হস্তিনাপুরের রাজপুরীতে শোকের ছায়া নেমে এল। কিশোর বিচিত্রবীর্যকে দিয়ে বড় দাদার শ্রাদ্ধ-শাস্তির কাজ শেষ করে মহামতি ভীষ্ম তাকেই সিংহাসনে বসালেন। মহাভারতের কবি চিত্রাঙ্গদার স্বল্প-পরিসর জীবনের কথা জানিয়ে বিচিত্রবীর্যকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করা মাত্রই মন্তব্য করলেন বিচিত্রবীর্য ভীষ্মের কথা মেনে চলতেন-ভীষ্মস্য বচনে স্থিতঃ–এবং পৈতৃক রাজ্যও শাসন করতেন তারই অনুশাসনে চলে।
কথাটা শুনলেই বিপ্রতীপভাবে মনে হয় শান্তনুর জেষ্ঠপুত্র ভীষ্মের কথা শুনতেন না। একটু আগেই যে কবি বলেছিলেন–চিত্রাঙ্গদ কোনও মানুষকে তার সমকক্ষ জ্ঞান করতেন না–আমাদের ধারণায়–এই মানুষটি হলেন ভীষ্ম। ভীষ্মকে তিনি গণনার মধ্যে আনতেন না বলে ভীষ্মও তার প্রতি উদাসীন ছিলেন। মহাভারতে নয়টি মাত্র শ্লোকে চিত্রাঙ্গদের কাহিনী প্রাথমিকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। তার মধ্যে ভীষ্মর কথা একবারও আসেনি। কথা যা এসেছে, তা সবই চিত্রাঙ্গদের বেপরোয়া ভাব নিয়ে। অথচ শান্তনুর কনিষ্ঠ পুত্র বিচিত্রবীর্য রাজা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভীষ্মের প্রসঙ্গ আসহ প্রথম থেকে। তিনিই বিচিত্রবীর্যের অভিষেক সম্পন্ন করলেন, তার মতেই বিচিত্রবীর্যের শাসন চলতে লাগল এবং সর্বোপরি মন্তব্য করা হল–বিচিত্রবীর্য ভীষ্মকে যথাবিহিত সম্মান করে চলতেন, যেহেতু ভীষ্ম ছিলেন ‘ধর্মশাস্ত্ৰকুশল’স ধর্মশাস্ত্রকুশলং ভীষ্মং শান্তনবং নৃপঃ..পূজয়ামাস ধর্মেণ…।
‘ধর্মশাস্ত্ৰকুশল’-এই একটি মাত্র বিশেষণ ভীষ্মের নামের সঙ্গে যোজিত হওয়ার বিশেষ অর্থ আছে। ধর্মশাস্ত্র বলতে সাধারণভাবে নিত্যনৈমিত্তিক কর্মের বিধিনিষেধ বোঝালেও, আসলে ধর্মশাস্ত্র হল সেকালের আইনের বই। রাজারা কীভাবে রাজ্য শাসন করবেন, কীভাবে করগ্রহণ করবেন, কীভাবে দণ্ড দেবেন, কীভাবে, কোন অবস্থায় শক্ররাজার সঙ্গে সন্ধি-বিগ্রহের শর্ত দেবেন–এইসব কিছুর আইনি দলিল হল প্রাচীন ধর্মশাস্ত্রগুলি। মহামতি ভীষ্মের সময়ে আইনি বিধিনিষেধের যে সমস্ত নীতি-নিয়ম চালু ছিল, তা প্রধানত বৃহস্পতি এবং শুক্রাচার্যের শাস্ত্ৰ-পরম্পরা। গঙ্গা যখন ভীষ্মকে শান্তনুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন তখনই ভীষ্ম বৃহস্পতি এবং শুক্রাচার্যের রাজনীতিশাস্ত্রে পারঙ্গম–উশনা বেদ যচ্ছাং যচ্চ বেদ বৃহস্পতিঃ। পরবর্তীকালে মনুর ধর্মশাস্ত্র থেকে আরম্ভ করে নারদের রাজনীতিশাস্ত্র সবই তিনি অধিগত করেছেন। এ সবের বিস্তারিত খবর পাওয়া যাবে মহাভারতের শান্তিপর্বে।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর যুধিষ্ঠির যখন কিছুতেই রাজা হতে চাইছিলেন না এবং মহাভারতের কবি স্বয়ং যখন তাকে রাজা হবার জন্য বারবার সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাচ্ছিলেন, তখন সর্বদশী ব্যাসকে যুধিষ্ঠির উদভ্রান্তের মতো প্রশ্ন করে বলেছিলেন–আমি যে রাজনীতি, রাজধর্মের কিছুই জানি না, রাজনৈতিক বিপন্নতা তৈরি হলে আমার কী কর্তব্য হবে, তাও তো আমার জানা নেই। আপনিই না হয় রাজধর্মের উপদেশ করুন–রাজধৰ্মান দ্বিজশ্রেষ্ঠ। চাতুর্বর্ণস্য চাখিলান্। ব্যাস হেসে বলেছিলেন–আমি নয়, দাদাভাই! রাজধর্ম কিংবা রাজনীতির কুট জানতে চাইলে, তোমাকে যেতে হবে মহামতি ভীষ্মের কাছে, এ ব্যাপারে তিনি সবচেয়ে বিজ্ঞ ব্যক্তি–প্রৈহি ভীষ্মং মহাবাহো বৃদ্ধং কুরুপিতামহম্। আশ্চর্যের ব্যাপার হল–যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করেছিলেন রাজধর্মের কথা, রাজনীতির কুট; তার উত্তরে ব্যাস বললেন–ধর্মের বিষয়ে যত তোমার সংশয়, সন্দেহ আছে, সব তিনি দূর করে দেবেন–স তে ধর্মরহস্যেষু সংশয়ান মনসি স্থিতান্।
এই যে ধর্ম শব্দের প্রয়োগ হল, এটা রাজার ধর্ম, রাজনীতির রহস্য। আমাদের মূল প্রসঙ্গে উপস্থিত হয়ে বলি-মহারাজ বিচিত্রবীর্য রাজনীতিকুশল (ধর্মার্থকুশল) ভীষ্মের সব কথা। শুনতেন, যা হয়তো তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা শোনেননি এবং না শুনে গোঁয়ার-গোবিন্দের মতো মৃত্যুবরণ করেছেন। গন্ধর্বরাজ চিত্রাঙ্গদ কোনও পরিচিত ব্যক্তি নন। তিনি আকস্মিকভাবে এসে একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে (আমার নাম আর তোমার নাম এক হওয়া চলবে না) চিত্রাঙ্গদের সঙ্গে ঝগড়া আরম্ভ করেছেন, এবং তাকে আততায়ীর মতো খুন করে চলে গেছেন। কাউকে যিনি কেয়ার করতেন না, তার শত্রু অনেক। গন্ধর্বরাজকে আমরা এক আকস্মিক আততায়ী বলেই মনে করি। হয়তো সেই কারণেই তার পরিচয়–তিনি গন্ধর্বরাজ এবং চিত্রাঙ্গদকে হত্যা করেই তিনি চলে গেছেন স্বর্গে অর্থাৎ কোনও অজ্ঞাত জায়গায়–অন্তায় কৃত্বা গন্ধর্বো দিবমাচক্রমে ততঃ।
