ভাগবত পুরাণ কিংবা অন্যান্য কিছু বৈষ্ণবীয় পুরাণে বসুদেবের কাহিনী শুনলে মনে হবে–তিনি একেবারে এক গোবেচারা ভাল মানুষ। রাজনৈতিক বুদ্ধি তার কিছুই ছিল না। তিনি শুধু কংসের কোপানলে দগ্ধ হয়ে সারা জীবন কংসের কারাগারে পচে মরলেন। আমরা অবশ্য এই মতের পোষণ করি না। আমরা হরিবংশ, বিষ্ণুপুরাণ এবং মহাভারত পড়ে এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে, জরাসন্ধ-কংসের আমলে যে রাজনীতির আবর্ত তৈরি হয়েছিল, বসুদেবও তার অন্যতম বলি। আমরা মনে করি পূর্বদেশীয় দেশগুলির সঙ্গে বসুদেবের ভগিনীদের বৈবাহিক সম্বন্ধ এবং হস্তিনাপুরের রাজবাড়ির সঙ্গে বসুদেবের নিজের বৈবাহিক সম্বন্ধ লক্ষ্য করেই উগ্রসেনের বড় দাদা দেবক তার সাত-সাতটি মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন বসুদেবের সঙ্গে। এদের মধ্যে জ্যেষ্ঠা হলেন দেবকী।
দেবকের সাত মেয়ের নাম হল–সহদেবা, শান্তিদেবা, শ্রীদেবা, দেবরক্ষিতা, বুকদেবী, উপদেবী এবং দেবী। এঁদের মধ্যে প্রথম ছয়জনের সঙ্গে বসুদেবের আগেই বিয়ে হয়েছিল কি না সে কথা স্পষ্ট করে কোথাও বলা নেই। কিন্তু কনিষ্ঠা অথবা জ্যেষ্ঠা দেবীর সঙ্গে বসুদেবের যে আলাদাভাবে এবং মহা আড়ম্বরে বিয়ে হয়েছিল-সেকথা আমরা জোর দিয়ে বলতে পারি।
.
৫৮.
মহামতি ভীষ্ম সত্যবতীকে রথে চড়িয়ে নিয়ে এসে পিতার সামনে সমস্ত ঘটনা নিবেদন করেই ক্ষান্ত হলেন না, শাস্ত্রের নিয়ম অনুসারে পিতার সঙ্গে সত্যবতীর শুভ-বিবাহ সম্পন্ন করলেন তিনি–বিবাহং কারয়ামাস শাস্ত্রদৃষ্টেন কর্মণা। এখানে সংস্কৃত ভাষায় ক্রিয়াটি হল প্রবর্তক ক্রিয়া-বিবাহং কারয়ামাস-বিবাহ করালেন। মন্দ লোকেরা অশ্লীল কথ্য ভাষায় কুবাক্য ব্যবহার করে বলে–বাপের বিয়ে দেখিয়ে দেব। যার প্রতি এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হয়, তার যে এই শব্দ শ্রবণমাত্রেই অতি কঠিন এবং কষ্টকর প্রতিক্রিয়া হবে–সে কথা ধরে নিয়েই মন্দ লোকে এমন মন্দ কথা বলে। এই নিরিখে নিজের চোখের সামনে সত্যবতীর সঙ্গে পিতার বিবাহ সম্পন্ন করতে ভীষ্মের মনে কত কষ্ট হয়েছিল–সে খবর মহাভারতের কবি দেননি।
ভীষ্ম দেখলেন–তাঁর পিতা শান্তনু সত্যবতীকে নিয়ে নিজের প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করলেন– তাং কন্যাং রূপসম্পন্নাং স্বগৃহে সন্ন্যবেশয়ৎ। সেই মুহূর্ত থেকেই কোনও কষ্টের কথা তো নয়ই, মহাভারতের কবি ভীষ্মকে যেন তার পিতারও অভিভাবক হিসেবে নিযুক্ত করলেন। এমন একজন অভিভাবক, যিনি পিতার বিবাহ দিয়ে পিতার সন্তানগুলি মানুষ করার ভার নিলেন। শান্তনু খুব বেশিদিন বাঁচেননি। সত্যবতীর গর্ভে দুটি পুত্রের জন্ম দিলেন তিনি। দুই পুত্র–চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্য। কনিষ্ঠ বিচিত্রবীর্য যৌবনের সন্ধিলগ্নে পৌঁছনোর আগেই শান্তনু স্বর্গত হলেন।
শান্তনু প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলেই যেহেতু নিজের জননী সত্যবতীর সম্বন্ধে কথা বলতে হয়, তাই মহাভারতের কবি কোনও বিস্তারের মধ্যে যাননি। শান্তনুর জীবনে মিতাচারিতার লক্ষণ খুব প্রকট নয়। পূর্ব জীবনে গঙ্গা এবং এই এখন এই মুহূর্তে সত্যবতীর সঙ্গে তাঁর গার্হস্থ্য জীবন খুব মিতাচারিতার মধ্যে কাটেনি বলেই মনে হয়। মহাভারতের কবি নিজের মাকে কোনও রকমে শান্তনুর প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছেন বটে, কিন্তু সময় বুঝে তিনি খুব তাড়াতাড়ি ভীষ্মকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। শান্তনু স্বৰ্গত হলে ভীষ্ম সঙ্গে সঙ্গে তার জ্যেষ্ঠ পুত্র চিত্রাঙ্গদকে হস্তিনাপুরের রাজসিংহাসনে অভিষিক্ত করলেন। সত্যবতীর বিবাহের সময় দাস রাজার পূর্বকথা এবং শর্ত তার মনে আছে। সত্যবতীর অনুমতি নিয়ে মহামতি ভীষ্ম হস্তিনাপুরের রিক্ত সিংহাসন পূর্ণ করে দিলেন চিত্রাঙ্গদকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করে।
রাজ্য পরিচালনা করার পূর্ব অবস্থায় একজন ক্ষত্রিয়ের যে তপস্যা এবং সাধনা দরকার হয়, চিত্রাঙ্গদের তা ছিল না। শান্তনুর বয়স্ক জীবনের আদর নিয়ে তিনি মানুষ হয়েছেন, বলদর্পিত এবং দম্ভ তাকে খানিকটা পেয়ে বসেছিল। কিছু দেশ জয় করার ‘ক্রেডিট’ তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বটে, কিন্তু এই জয়কার যে কোনও রাজনামের অলংকার-ধ্বনিমাত্র। বাস্তবে তিনি ছিলেন অহংকারী বলদর্পী। কাউকেই তিনি নিজের তুল্য বলে মনে করতেন না-মনুষ্যং ন হি মেনে স কঞ্চিৎ সদৃশমাত্মনঃ।
মহারাজ শান্তনুর মধ্যে যে অমিতাচারিতা ছিল, তার সঙ্গে যুক্ত হল ক্রোধ এবং অহংকার। দেবতা এবং অসুর, যাঁরা চিরকালই মনুষ্যবুদ্ধির উত্তর পর্যায়ে অবস্থিত, চিত্রাঙ্গদ তাদের তোয়াক্কা তো করতেন না, বরং সদা সর্বদা তাদের নিন্দায় মুখর ছিলেন। আর মানুষ তো তার গ্রাহ্যের মধ্যেই ছিল না–তং ক্ষিপন্তং সুরাংশ্চৈব মানুষ-অসুংস্তথা। মহাভারতের ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে দেবাসুর-মনুষ্যের মর্যাদা কলঙ্কিত করে কোনও রাজার পক্ষে সুস্থিরভাবে রাজ্যশাসন করা সম্ভব ছিল না। আমরা দেখতে পাচ্ছি–এক গন্ধর্বরাজ স্বর্গ থেকে নেমে এসেছেন হস্তিনাপুরে চিত্রাঙ্গদ রাজার কাছে রাজার কাছে। তিনি বলছেন–আমার নামও চিত্রাঙ্গদ। পৃথিবীতে একই নামের দুটো লোক তো আর থাকতে পারে না। সেইজন্য আমি তোমার সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাই–ত্বয়াহং যুদ্ধমিচ্ছামি…ন গচ্ছেন্নাম তে মম।
