মূল যদুবংশ যখন ভাগ হয়ে অন্ধক, বৃষ্টি বা ভোজ সংঘে বিভক্ত হয়ে পড়ল, তখন এই সংঘগুলির মধ্যে ঘনিষ্ঠতা যেমন ছিল, তেমনই জ্ঞাতিভেদও কিছু কিছু ছিল। এক গোষ্ঠী বা সংঘের সঙ্গে অন্য গোষ্ঠী বা সংঘ যদি ঘনিষ্ঠ হতে চাইত, তবে সব চেয়ে ঈশিত উপায় ছিল বিবাহ। লক্ষ্য করে দেখুন, বসুদেবের পিতা শূর বা মহাশূর–তিনি কিন্তু এক ভোজরাজের কন্যাকেই বিবাহ করেছিলেন। এই ভোজরাজকন্যার গর্ভেই বসুদেব জন্মান। শোনা যায় বসুদেবের জন্মের সময় স্বর্গরাজ্যে নাকি আনক’ নামে এক বাদ্য বেজে উঠেছিল এবং সেইজন্যই বসুদেবের এক নাম আনকদুন্দুভি’-আনকানাঞ্চ সংহ্রাদঃ সুমহান্ অভব দিবি।
বসুদেব যখন প্রথম বৈবাহিক সম্বন্ধের কথা ভাবলেন, তখন কিন্তু প্রথমেই তিনি ভোজ, অন্ধক বা বৃষ্ণিগোষ্ঠীর কারও সঙ্গে সম্বন্ধের কথা ভাবলেন না। বৈবাহিক সম্বন্ধের জন্য তিনি বেছে নিলেন হস্তিনাপুরের রাজবংশকে। হস্তিনাপুরে তখন রাজত্ব করছিলেন মহারাজ শান্তনু এবং আমরা জানি শান্তনুর কোনও কন্যা সন্তান হয়নি। কিন্তু শান্তনুর মেজ দাদা বাহ্লীক, যিনি শান্তনুর রাজ্যাভিষেকের পর রাজ্য ছেড়ে তার মামাবাড়ির দেশে চলে গিয়েছিলেন বলে বলেছি, তিনি কিন্তু পিতৃভূমিতে একেবারে পরবাসী ছিলেন না। শান্তনুর মন্ত্রিসভায় তিনি অন্যতম মন্ত্রী ছিলেন, এবং মহাভারতের যত্রতত্র কৌরবসভার মন্ত্রী হিসেবে আমরা বাহ্লীকের নাম পাব। বাহ্লীকের সর্বময় খ্যাতি পুরুবংশীয় বলেই।
শান্তনুর এই মেজদাদা বাহ্লীকের পাঁচটি সুন্দরী মেয়ে ছিল। এই পাঁচজনের নাম হল রোহিনী, ইন্দিরা, বৈশাখী, ভদ্রা এবং সুনাম্নী। বাহ্লীক হস্তিনাপুরের রাজ্য নাই গ্রহণ করুন, রোহিণী ইত্যাদি পাঁচটি কন্যাই কিন্তু পৌরবী বলে পরিচিত ছিলেন–পৌরবী রোহিণী নাম ইন্দিরা চ তথা বরা।
আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস–জরাসন্ধ যখন সমস্ত ভারতবর্ষে প্রবল হয়ে উঠছেন এবং মথুরাধিপতি কংস যখন তার এজেন্ট হিসেবে উত্তর-পশ্চিম ভারত প্রায় পদানত করে ফেলেছেন, তখন হস্তিনাপুরের এই নতুন রাজবংশের সঙ্গে বসুদেবের এই বৈবাহিক সম্বন্ধ রাজনৈতিক দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জা—িহস্তিনাপুরে মহারাজ শান্তনুর পূর্বে তেমন শক্তিধর রাজা কেউ ছিলেন না। মহারাজ প্রতীপের পর শান্তনুর হাত ধরেই হস্তিনাপুরের পূর্ব গৌরব আবার ফিরে আসছিল। মগধরাজ জরাসন্ধ আপন পূর্বতন কুরুবংশের সম্বন্ধেই হোক, অথবা অন্য কোনও কারণে-কখনই তিনি হস্তিনাপুরের রাজাদের সঙ্গে শত্রুতা করেননি। করলে, শান্তনুর ক্ষমতা হত না তাকে রোখার।
সে যাই হোক, বাহ্লীকের সঙ্গে শ্বশুর-সম্বন্ধ স্থাপন করে বসুদেব কিন্তু হস্তিনাপুরের নবোথিত রাজশক্তির সঙ্গে খানিকটা ঘনিষ্ঠ হলেন এবং এই সম্বন্ধ রাজনৈতিক দিক দিয়ে তার কাছে জরুরী ছিল বলেই আমরা মনে করি। মহামতি বসুদেবের ঘরে আরও দুটি বৈবাহিক সম্বন্ধও যথেষ্ট খেয়াল করার মতো। অবশ্য এই সম্বন্ধ তিনিই ঘটিয়েছিলেন, নাকি তার পিতা শুর, সে ব্যাপারে কোনও তর্ক না তুলেও বলতে পারি, এই সম্বন্ধগুলিও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত।
আপনাদের খেয়াল থাকবে–চৈদ্য উপরিচর বসু যে রাজ্যে প্রথম এসে জাঁকিয়ে বসেছিলেন, সে রাজ্যের নাম হল চেদি। চেদি আগে যাদবদের দেশ ছিল। পরে এই দেশ দখল করে নেন উপরিচর বসু এবং তার পাঁচ পুত্রের একজনকে তিনি এখানে অধিষ্ঠিত করেন। হয়তো তাঁর নাম ছিল প্রত্যগ্রহ। অনুমান করা যায়–তারই কোনও অধস্তন পুরুষের সঙ্গে বসুদেবের এক ভগিনীর বিবাহ হয়। এই ভগিনীর নাম হল শ্রুতবা। বসুদেবের আরেক বোন হলেন পৃথুকীর্তি। এঁর বিবাহ হয় করূষ দেশের রাজা বৃদ্ধশর্মার সঙ্গে। করূষ দেশেও পূর্বে যাদবদের আধিপত্য ছিল, পরে সেখানে সিংহাসনে বসেন বসুরাজের আরেক পুত্র। মনে রাখা দরকার–চেদি এবং করূষ–এই দুই দেশই কিন্তু জরাসন্ধের দেশ মগধের সঙ্গে প্রায় লাগোয়া। সুদূর মথুরা-শূরসেনে বসে মগধ-রাজ্যের পাশাপাশি দুটি রাজ্যের রাজাদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করার মধ্যে যতখানি হৃদয়ের সরসতা আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি আছে রাজনৈতিক অভিসন্ধি।
কংস যেখানে দিনে দিনে অত্যাচারী হয়ে উঠছেন, সেখানে জরাসন্ধের আত্মীয়জনের সঙ্গে বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করে শুর এবং বসুদেব–দুজনেই হয়তো খানিকটা ‘রিলিফ’ পেতে চেয়েছিলেন। আমরা পরে দেখব-বসুদেবের ভগিনীর এই সম্বন্ধ দুটি একেবারেই বিফলে গিয়েছিল। অর্থাৎ যে রাজনৈতিক অভিসন্ধিতে এই বৈবাহিক সম্বন্ধ দুটি ঘটনো হয়েছিল বলে আমাদের অনুমান, সেই অভিসন্ধি ফলপ্রসূ হয়নি। পরবর্তী সময়ে চেদিতে শিশুপাল জন্মাবেন, করূষদেশে জন্মাবেন দন্তবক্র-এঁরা চিরকাল মথুরা-শূরসেনের বিরোধিতা করবেন।
কিন্তু সে সব পরের কথা, পরেই দেখা যাবে। মথুরা-শূরসেনের অন্তঃরাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে শর কিংবা বসুদেবের স্থিতিটা আমরা আগে বুঝে নিই। চেদি-করূষে দুই বোনের বিয়ে দিয়ে এবং নিজে হস্তিনাপুরের রাজসম্বন্ধী পাঁচটি কন্যাকে বিয়ে করে বসুদেব কিন্তু মথুরা-শূরসেনে এক রীতিমতো মাননীয় ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন। আমরা যেহেতু পরে তাকে মথুরাধিপতি কংসের কট্টর বিরোধী নেতার ভূমিকায় দেখতে পাব, তাই ধরে নিতে পারি, অনেক আগে। থেকেই তিনি কংসের বিরোধী মত পোষণ করতেন।
