আমরা জানি–ইতিহাসের প্রয়োজনেই মথুরাপুরীর এই বিরাট প্রাচীর গড়ে উঠেছিল। মগধরাজ জরাসন্ধের আগ্রাসী হাত থেকে মথুরাবাসীদের বাঁচনোর জন্যই এই দুর্গপ্রায় প্রাচীর পরে ব্যবহৃত হবে বটে, তবে এই প্রাচীর নির্মিত হয়েছিল কংস রাজা হওয়ার বহু পূর্বে। পৌরাণিকদের কথা শুনে বোঝা যায়-মথুরা নগরীর মধ্যস্থিত বাসস্থানটি তৈরি করেছিলেন শূরসেন, যাকে আমরা পূর্বে যদুবংশীয় কার্তবীর্যাজুনের জ্যেষ্ঠ পুত্র বলে চিহ্নিত করেছি–নিবিষ্টবিষয়শ্চৈব শূরসেন স্তভবৎ। পৌরাণিকেরা কাব্য করে বলেছেন-মথুরা নগরীর চারদিকে যে স্বচ্ছজলের পরিখা নির্মাণ করা হয়েছিল, সেই পরিখাঁটি দেখতে লাগত উড়িয়ে দেওয়া একটি ওড়নার মতো। তার মধ্যে যমুনার প্রাকৃতিক বেষ্টনী মথুরানগরীকে অর্ধচন্দ্রের শোভায় ভূষিত করেছিল–অর্ধচন্দ্রপ্রতীকাশা যমুনাতীরশোভিতা।
দেখুন, কংসের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা প্রমাণ করার জন্য মথুরার নিসর্গশোভা বর্ণনার যে কোনও প্রয়োজন নেই সেটা আমরা যথেষ্ট জানি। কিন্তু এই বর্ণনার অনুষঙ্গে আমরা যেটা বলতে চাই, সেটা হল-মথুরা-নগরীর সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক পরিবেশ এতটাই ভাল ছিল যে, কংসকে সে দিক দিয়ে কোনও ভাবনাচিন্তাই করতে হয়নি। মনু-মহারাজ শূরসেনকে ব্রহ্মর্ষিদেশগুলির অন্যতম বলে গণ্য করেছেন, সেটা সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে মহাভারতের মন্তব্যের সঙ্গে মেলে। মহাভারত বলেছে–বৈদিক যাগযজ্ঞের ব্যাপারে মথুরা-শূরসেনীদের বিশেষজ্ঞ বলে মনে করা হত–শূরসেনাশ্চ যজ্ঞান। অন্যদিকে অর্থনীতির কথা যদি ভাবেন, তাহলে হিউয়েন সাঙের সময়ে অন্তত এই রাজ্যের সম্পন্ন এবং ভূমির উর্বরতার সংবাদ যা পাওয়া যাচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষের অবস্থাও মোটেই খারাপ ছিল না। শস্যও হত প্রচুর। ক্ষেত্রাণি শস্যবস্ত্যস্যা কালে দেবশ্চ বৰ্ষতি। মথুরায় একটা ভাল বাজার ছিল, যেখানে দেশ-বিদেশের লোকেরা ব্যবসা-বাণিজ্য করত। নগরীর দোকান-পাট, রত্নসঞ্চয় সমসাময়িক অন্যান্য নগরীর তুলনায় ঈর্ষণীয় ছিল–পুণ্যাপণবতী দুর্গা রত্নসঞ্চয়গর্বিত।
মথুরা-নগরীর এই সমৃদ্ধিই এক সময় মহারাজ কংসকে লুব্ধ করে তুলল। মথুরা শুরসেনীদের নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে তিনি বিচ্যুত হলেন। ব্রাহ্মণ্য যাগ-যজ্ঞ অথবা সত্যধর্মের পথ তাকে কোনওভাবেই আকর্ষণ করল না। জরাসন্ধের জামাই হবার সুবাদে সমস্ত সামন্ত রাজা তাকে ভয় করে চলতে আরম্ভ করল–রাজ্ঞাং ভয়ঙ্কররা ঘোরঃ শঙ্কনীয়ো মহীক্ষিতা। আর সেই থেকেই কংস নিজেকে বেশ কেউকেটা বলে ভাবতে আরম্ভ করলেন। সমস্ত সৎ পথ থেকে তিনি যেমন বিচ্যুত হলেন, তেমনই মথুরাবাসী প্রজাদের কাছেও অত্যন্ত ভীতিজনক হয়ে উঠলেন–সৎপথা বাহ্যতাং গতঃ,…প্রজানাং রোমহর্ষণ।
অত্যন্ত অত্যাচারী হয়ে উঠলেন কংস। রাজধর্মের সমস্ত আদর্শ বিসর্জন দেওয়াটা তার কাছে সামান্য ঘটনা। আত্মম্ভরিতা এবং স্বার্থসিদ্ধির জন্য তিনি এমন সব কাণ্ড করতে আরম্ভ করলেন, যে যদুবংশীয় সংঘমুখ্যেরা আর তাঁর অন্যায় আচরণ মেনেও নিতে পারছিলেন না– ন রাজধর্মাভিরতো নাত্মপক্ষসুখাবহঃ। ঠিক এই রকম একটা অবস্থায় কংস প্রজাদের ওপর অযথা কর চাপিয়ে এমন উৎপীড়ন করা আরম্ভ করলেন, যাতে মনে হল রাজকর ছাড়া আর কিছুতেই তার স্পৃহা নেই-নাত্মরাজে বির্যশ্চঃ কারুচিঃ সদা। ঠিক এই রকম চরিত্রের জন্যই পৌরাণিক্রে যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করেন, সেই সংজ্ঞা হল অসুর, রাক্ষস, দানব ইত্যাদি। পৌরাণিকের নিজের ভাষায় কংসে অসুরভাবের দ্বারা আবিষ্ট অন্তঃকরণে মাংসভক্ষী রাক্ষসের মতো সমস্ত লোকের। উৎপীড়ন করতে লাগলেন–ব্যাদো বাধতে লোকান্ অসুরোত্মরাত্মনা।
আমরা উগ্রসেন-জ্যেষ্ঠ দেবকের কথা বলতে বলতে কংসের কথায় এসেছিলাম। আমাদের ধারণা–কংসের উন্মাদ অত্যাচার যাঁরা মেনে নিতে পারছিলেন না, তাঁদের মধ্যে দেবক একজন। তিনি যে কংসের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিবাদে ফেটে পড়লেন, তা মোটেই নয়। তিনি একটা মাধ্যম খুঁজছিলেন, যে মাধ্যমটি তিনি কাজে লাগাবেন কংসের বিরোধিতার জন্য। এই মাধ্যমটি ছিলেন বসুদেব, যিনি ভবিষ্যতে কৃষ্ণের পিতা হবেন।
কংস যেমন অন্ধক উগ্রসেনের পুত্র ছিলেন, তেমনই বসুদেব ছিলেন বৃষ্ণি-সংঘের মুখ্য। পুরুষ। অবশ্য বৃষ্ণির বংশ চার-পাঁচটি ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়ায় তাকে আর সোজাসুজি বৃষ্ণিসংঘের মুখ্য নায়ক না বলাই ভাল। কারণ বৃঞ্চিবংশীয় অক্রুর তখনও কংসের অন্যতম সভাসদ এবং হয়তো তখনও কংসের অনুকূল। বসুদেব ছিলেন আর্য শুরের পুত্র। বৃষ্ণির এক পুত্রের ধারায় অরের জন্ম, আরেক পুত্রের ধারায় বসুদেবের জন্ম। হরিবংশে যেমন দেখছি, তাতে বোঝা যায় বসুদেব অরের চাইতে বয়সে অনেক বড় ছিলেন এবং তিনিও ছিলেন কংসের সভাসদ। কিন্তু কংসের সভাসদ হলেও তিনি কংসের সব মত নির্বিচারে মেনে নিতে পারছিলেন না এবং মনে মনে তিনি বেশ খানিকটা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিলেন কংসের ব্যবহারে।
উগ্রসেন-জ্যেষ্ঠ দেবক তার নিজের মেয়ে দেবকীর সঙ্গে এই ক্ষুব্ধ যুবকের বিয়ে দেবেন বলে ঠিক করলেন, কিন্তু তার আগে দেখতে হবে এইরকম একটা পছন্দ তিনি করলেন কেন? বসুদেবের ক্ষোভটাই বা তিনি টের পেলেন কী করে? এসব কথা বলতে হলে আমাদের আরও দু-একটা কথা জানতে হবে।
