দেশে নতুন রাজা রাজত্বভার গ্রহণ করলে সর্বকালে এবং সর্বদেশে উচ্চশ্রেণীর মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, কংস রাজা হবার পর যাদব সংঘমুখ্যদের মধ্যেও সেই প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল। সাধারণত ক্ষমতার পালা বদল হলে উচ্চশ্রেণীর মানুষের একাংশ রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে রাজা বা নেতার পক্ষপাতী হয়ে পড়েন, আর অন্যাংশ এই নেতৃত্বের বিরোধিতা করতে থাকেন। কংস রাজা হবার পর যাদব সংঘমুখ্যদের অনেকেই তার সঙ্গে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে আমরা কংসের রাজসভার একটি আলোচনাচক্রের কথা উল্লেখ করব। এবন তার প্রসঙ্গ নেই বলে শুধু এইটুকু জানিয়ে রাখছি যে, কংস ভোজ-বৃষ্টিমুখ্যদের অনেককেই সঙ্গে পেয়েছিলেন।
উপরিউক্ত এই সভায় প্রথম বক্তৃতা দেবার সময় কংস রাজোচিতভাবে বলেছিলেন–এই মহান যদুকুল যখন নিজের মর্যাদা থেকে ভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছিলেন–ব্যাবৰ্তমানং সুমহৎ–তখন আপনাদের মতো কীর্তিমান লোকেরাই এই যদুবংশকে আপন মর্যাদায় স্থাপন করেছিলেন, ঠিক যেমন পাহাড়ের দৃঢ়তায় ধৃত হয় এই ধরাতল–ধৃতঃ যদুকুলং বীরৈ ভূতলং পর্বতেরিব। সন্দেহ নেই-কংসের বলা ওই যদুকুলের মর্যাদাভ্রংশের সময়টি অবশ্যই কংসের পূর্বঘটিত বলেই কংস মনে করেন। তিনি নিশ্চয় মনে করেন–তার সময়েই যদুবংশের চরম প্রতিষ্ঠা এবং সম্মান সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু যাঁরা মর্যাদা পুনঃস্থাপনে সাহায্য করেছেন কংসকে, তারা অনেকেই কংসের মন যুগিয়ে চলেন। কংস নিজেই সেকথা সগর্বে উচ্চারণ করে বলেছেন আপনারা সকলেই আপন আপন স্থানে অত্যন্ত যোগ্য ব্যক্তি এবং আপনারা প্রত্যেকেই আমার মনের অনুকূল আচরণ করেন–এবং ভবৎসু যুক্তেষু মম চিত্তানুবর্তিযু।
কংসের মনের অনুকূল আচরণ যারা করেছেন, তাদের মধ্যে এমন সব নাম আমরা পাচ্ছি, যাঁদের নাম শুনলে আমাদের কিছুটা আশ্চর্যই লাগবে। কংস এই সভায় কৃষ্ণপিতা বসুদেবকে খুব কষে গালাগালি দিয়েছিলেন। তাতে বুঝি, তিনি তার অনুকূল ছিলেন না। কিন্তু কৃতবর্মা, ভূরিশ্রবা যাদের নাম আমরা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় আবার শুনতে পাব, কিংবা অর, যাকে ভবিষ্যতে অনেক সময়েই কৃষ্ণের বিপক্ষভূমিতে দেখতে পাব, অথবা দারুক, সত্য ভবিষ্যতে যাদের কৃষ্ণের সহমর্মিতার স্থানে দেখতে পাব–এঁদের সকলকে কিন্তু এখন কংসের অনুকূল ভূমিকায় দেখতে পাচ্ছি। তার মানে কংস রাজা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের বলেই হোক, বুদ্ধিতেই হোক অথবা মগধরাজ জরাসন্ধের জুজু দেখিয়েই হোক–এঁদের সবাইকে তিনি নিজের অনুকূলে টানতে পেরেছিলেন।
মথুরা-শূরসেন অঞ্চলে কংসের রাজনৈতিক স্থিতি নিয়ে আমরা যে দু-চারটে কথা বলছি, বা বলব, তা যেমন মহাভারতে একটু-আধটু পাব, তেমনই অনেকটাই পাব হরিবংশ এবং অন্যান্য পুরাণগুলিতে। মহাভারতের স্বপ্পোল্লিখিত সংবাদগুলি আমরা যখন পুরাণগুলি থেকে ‘সাবস্ট্যানসিয়েট’ করতে পারব তখনই বুঝব, আমরা ঠিক কথা বলছি। কিন্তু এই সমস্ত প্রক্রিয়ার জন্যই আমরা এখন শুধু ভূমিকা রচনা করছি এবং তা করতে হচ্ছে হরিবংশ কিংবা পুরাণ থেকে।
অন্ধক বংশের রাজা উগ্রসেন কারাগারে বন্দী হলে কংস রাজা হলেন। কিন্তু উগ্রসেন যখন রাজা ছিলেন, তখনও কিন্তু আমরা উগ্রসেনের জ্যেষ্ঠ দেবকের মধ্যে কোনও মন্দ প্রতিক্রিয়া দেখিনি। তিনি উগ্রসেনের বড় ভাই না ছোট ভাই, সেই তর্কের মধ্যে না গিয়েও বলতে পারি–দেবক কখনও উগ্রসেনের প্রত্যক্ষ বিরোধিতা করেননি। কিন্তু কংস যখন রাজা হলেন এবং পিতা উগ্রসেনকে বন্দী করলেন, তখন কিন্তু তিনি কংসের বিরুদ্ধ রাজনৈতিক কোটিতে অবস্থান করছিলেন বলেই মনে করি। এই ধারণার কারণও আছে।
প্রাথমিকভাবে কংস বেশিরভাগ যাদব গোষ্ঠী বা সংঘমুখ্যর সমর্থন আদায় করে নিলেও ক্ষমতার লোভে অথবা ক্ষমতার চূড়ায় বসে তিনি নিজেকে আর নিজের বশে রাখতে পারেননি। এর ফলে মথুরাবাসীর ওপরে নেমে এসেছে অত্যাচার আর অবিচারের বোঝ। হরিবংশে বর্ণিত কংসের চেহারাটা যদি ধর্মের নির্মোক মুক্ত করে বিচার করি, তাহলে ইতিহাসের তথ্যগুলো একটু একটু করে বেরিয়ে আসতেও বা পারে।
ধর্মের রক্ষার কারণে ঈশ্বর যখন অবতার গ্রহণ করেন, তখন প্রায় রুটিনমাফিক একটা আবেদন-নিবেদনের পালা আসে ভগবান বিষ্ণুর কাছে। মুনি-ঋষি, দেবতা, অথবা স্বয়ং পৃথিবীমাতাকে আমরা এই সময় ক্রন্দনরত অবস্থায় বিষ্ণু-নারায়ণের কাছে পৌঁছতে দেখব। তারা পৃথিবীতে অত্যাচারী রাজার অত্যাচারের ফিরিস্তি দিয়ে ঈশ্বরকে অবতার গ্রহণ করতে অনুরোধ করেন। ঈশ্বর ভক্তের ওপর অপার করুণায় দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালনের জন্য তখন পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়ে অত্যাচারীকে বধ করেনএবং পৃথিবীকে পাপমুক্ত করেন।
ধর্মীয় দৃষ্টিতে এই দেবতা, ঋষি বা পৃথিবীর সরোদন অনুরোধ ভগবান বিষ্ণুর কাছে এসেছিল কংসের রাজত্বকালেও। আমরা সেসবের মধ্যে যাচ্ছি না। আমরা যেহেতু পরবর্তী কালে কৃষ্ণকে এক বিশুদ্ধ রাজনৈতিক নেতা এবং ত্রাতা হিসেবে যুক্তিসঙ্গতভাবে প্রতিষ্ঠা করব, তাই এই অবতারগ্রহণের প্রণালীর মধ্য থেকেই আমাদের রাজনৈতিক উপাদানগুলি চয়ন করতে হবে। কংসের অত্যাচার চরমে পৌঁছলে নারদ ঋষি বিষ্ণুর কাছে গিয়ে প্রথমে মথুরাপুরীর বর্ণনা দিলেন খানিকটা। তিনি বললেন-মথুরাপুরী এক বিরাট বিস্তৃত নগরী। বড় বড় বাড়ি অথবা অট্টালিকার শোভা তো আছেই, কিন্তু আমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল মথুরাপুরীর সুবৃহৎ প্রাচীরখানি এবং তার প্রবেশদ্বারটুকু-সা পুরী পরমোদারা সাট্টাপ্রাকারতোরণা।
