আমরা শুধু ভাবি–শান্তনু যখন একপুত্রের জীবন নিয়ে পূর্বে এত শঙ্কিত হচ্ছিলেন, তখনই এই মহান বরদান সম্পন্ন করলে পারতেন। কিন্তু তাতে মহাভারতের কবির পক্ষে লোকচরিত্রের বৈচিত্র্য দেখানো সম্ভব হত না। পুত্রকে সারা জীবন বাঁচিয়ে রাখা বা মৃত্যুকে তার ইচ্ছাধীন করে রাখার মধ্যে পিতার সবথেকে বেশি বাৎসল্য প্রকাশ পায়, জানি। হয়তো পুত্রকে এক বৃহৎ জীবন দান করে তার নিজকৃত বঞ্চনার প্রতিদান দিয়েছেন শান্তনু। কিন্তু মহাভারতের কবির দৃষ্টিতে–এই ঘটনা বঞ্চনার অক্ষরে লিখিত হয়নি, হয়তো তার কাছে এ ঘটনা তত রূঢ়ও নয়। পরবর্তী সময়ে মহাভারতের বিশাল ঘটনা-সন্নিবেশের মধ্যে দেবব্রতকে যেভাবে উপস্থাপিত করা হবে, তাতে দেখা যাবে, পিতার বাৎসল্যে এই মহান পুরুষটি বঞ্চিত হলেও, অতিদীর্ঘ জীবনের অধিকারী হওয়ার সুবাদে তিনি এক বিশাল যুগের দ্রষ্টা বলে পরিগণিত হবেন।
পিতার বিবাহের জন্য প্রতিজ্ঞা করে একদিকে তিনি ইচ্ছামৃত্যু হলেন, অন্যদিকে ভীষণ প্রতিজ্ঞা করার জন্য রাজা-প্রজা সকলে তাঁকে ‘ভীষ্ম’ নামকরণ করল। কিন্তু আমাদের কাছে এ সব কিছুর চাইতেও দাসরাজার ক্ষুরধার বক্তব্যটুকু বড় হয়ে উঠেছে। সত্যবতীর সঙ্গে পিতার বিবাহ দেওয়ার জন্য দেবব্রতর রাজত্ব পরিত্যাগের শপথ শুনেই দাসরাজা বলেছিলেন–আপনি এই প্রতিজ্ঞা করে শুধু মহারাজ শান্তনুরই প্রভু হলেন না, এই কন্যা সত্যবতীরও প্রভু হলেন-তবমেব মাথঃ পর্যাপ্তঃ শান্তনোরমিতদ্যুতেঃ। কন্যায়াশ্চৈব ধর্মাত্মন্…।
আমরা পরে দেখব–দেবব্রত ভীষ্ম কুরুবংশের গৌরবের জন্য সত্যবতীর পুত্র থেকে আরম্ভ করে সেই দুর্যোধন পর্যন্ত তার লোকহিতৈষিণী ভাবনা প্রসারিত করেছেন। আমরা বলব–তার এই ভাবনা আরম্ভ হয়েছে পিতার বিবাহ দেওয়া থেকে। যে ব্যক্তি পিতার বিবাহ দর্শন করে নিজের যৌবন আরম্ভ করেন, সেই ব্যক্তিকে এক মহাকাল পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখে মহাভারতের কবি তাকে এক সাক্ষী চৈতন্যের ভূমিকায় দ্রষ্টা হিসেবে নিযুক্ত করেছেন। এই দ্রষ্টার দৃষ্টি থেকেই পরে মহাভারতের কর্তার সৃষ্টি হবে। সত্যবতীর এক পুত্র সত্য দর্শন করছেন, সত্যবতীর আরেক পুত্র সত্য বর্ণন করছেন–সত্য-দর্শন আর সত্যের বর্ণন থেকেই কবির জন্ম-দর্শনাৎ বর্ণনাচ্চৈব রূঢ়া লোকে কবিশ্রুতিঃ। এক অর্থে বেদব্যাস যদি মহাভারতের স্রষ্টা কবি হন, তাহলে দেবব্রত ভীষ্ম হলেন দ্রষ্টা কবি। আর শুধু ভীষণ প্রতিজ্ঞা করেই নয়–পিতার বিবাহ থেকে আরম্ভ করে দিন-দিন প্রতিদিন, তার মৃত্যুকামনা পর্যন্ত যত ভীষণ ঘটনা তাকে দেখতে হবে, সেইজন্যই নিষ্পাপ নিষ্কলুষ দেবব্রত ‘ভীষ্ম’ হলেন হয়তো। ভীষ্ম না হলে এত কঠিন ঘটনা-পরম্পরা, যা তার স্বল্পসৃষ্টি থেকে একটু একটু করে অবক্ষীণ হতে থাকবে, ‘ভীষ্ম’ না হলে, তিনি সেসব সহ্য করবেন কী করে?
.
৫৭.
এই সেদিনও নবাব আলিবর্দি খাঁকে বাংলা-বিহার-ওড়িশার নবাব বলে বিমলানন্দ লাভ করতাম। বাংলা-বিহার-ওড়িশার এই একক জোটের বৈশিষ্ট্য, বলতে গেলে প্রায় খ্রিস্টপূর্ব সময় থেকে চলে আসছে। মগধরাজ জরাসন্ধ যখন তার শাসন-ক্ষমতার তুঙ্গবিন্দুতে পৌঁছেছেন, তখন অঙ্গ-বঙ্গ কলিঙ্গের রাজা ছিলেন তাঁর অভিন্নহৃদয় বন্ধু। অসম বা প্ৰাগজ্যোতিষপুরের অনার্য রাজাও ছিলেন তারই মিত্রগোষ্ঠীর অন্তর্ভুত। দক্ষিণে চেদি, বিদর্ভ, দশার্ণ দেশের রাজারা জরাসন্ধের আজ্ঞায় উঠতেন এবং বসতেন, অথচ এই সমস্ত রাজ্যই আগে যাদবদের অধিকারভুক্ত ছিল। হয়তো সেই কারণেই যাদবদের যে কোনও উপায়ে পর্যুদস্ত করাটাই যেমন জরাসন্ধের ধর্মের মতো হয়ে গিয়েছিল, তেমনই যাদবরাও জরাসন্ধের চিরশত্রু হয়ে গিয়েছিলেন।
যাদবদের প্রতি জরাসন্ধের শত্রুতা চরমে পৌঁছয়, যখন মথুরার অধিপতি উগ্রসেন কারাগারে বন্দী হলেন। জরাসন্ধের এজেন্ট হিসেবে তারই ক্ষেত্রজ পুত্র কংস খুব ভালভাবে কাজ করতে আরম্ভ করলেন মথুরা-শূরসেনের ভূখণ্ডে। আমাদের ব্যক্তিগত ধারণা–যাদবরা যেহেতু বিভিন্ন সংঘমুখ্যকে নিয়ে একটি গোষ্ঠীতন্ত্র চালাতেন, তাই বিভিন্ন সংঘমুখ্যর মধ্যে যে সব অন্তর্বিবাদ ছিল, সেই বিবাদের সুযোগ নিয়েই জরাসন্ধ মথুরায় নিজের প্রতিনিধি কংসকে স্থাপন করতে পেরেছিলেন।
লক্ষ্য করার বিষয়–অন্ধক-কুকুর বংশের প্রধান আহকের পুত্র দেবক, উগ্রসেনের বয়োজ্যেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও তিনি মথুরা-শূরসেনের রাজা হতে পারেননি। রাজা হয়েছিলেন কনিষ্ঠ উগ্রসেন। দেবক স্বেচ্ছায় এই রাজ্যের অধিকার ত্যাগ করেছিলেন নাকি তার মনে এ সব ঘটনা নিয়ে কোনও ক্ষোভ ছিল, তা নিয়ে ইতিহাস-পুরাণে একটি কথাও স্পষ্ট করে বলা নেই। অন্য রাজবংশগুলিতে রাজা হিসেবে অমনোনীত জ্যেষ্ঠ পুরুষদের হয় মুনিবৃত্তি গ্রহণ করতে দেখেছি, নয়তো ব্রাহ্মণ হয়ে যেতে দেখেছি। আজকের জ্যেষ্ঠ পুত্র দেবক কিন্তু নিজের রাজ্যেই অথবা কনিষ্ঠ উগ্রসেনের রাজ্যেই বসবাস করছিলেন। তার মধ্যে কোনও চাপা ক্ষোভ ছিল কি না আমরা তা জানি না, কিন্তু অন্ধক, বৃষ্ণি, ভজমান ইত্যাদি যাদবসংঘের মধ্যে সব সময়েই যে খুব সদ্ভাব ছিল এমন মোটেই নয়। নানা বিষয় নিয়ে এঁদের মতপার্থক্য ছিল এবং হয়তো এই পার্থক্যের সুযোগ নিয়েই কংস রাজা হতে পেরেছিলেন মথুরায়।
