দাস-রাজা এবার প্রকৃত প্রস্তাব করছেন। বললেন–তবে কিনা কুমার! আমি মেয়ের বাবা বলে কথা। আমার তো কিছু বলার থাকতেই পারে। আমি শুধু চাই–আমার মেয়ের ঘরে যে নাতি জন্মাবে, তার কোনও বলবান শত্রু না থাকে। আমি তো জানি রাজকুমার–তোমার মতো এক মহাবীর যদি অসুর-গন্ধর্বদেরও শত্রু হয়ে দাঁড়ায় তবে সেই অসুর-গন্ধর্বরাও রক্ষা পাবে, তাদের কাউকে আর সুখে বেঁচে থাকতে হবে না-ন স জাতু সুখং জীবেৎ ত্বয়ি ক্রুদ্ধে পরস্তূপে। তা এখানে আমার এই মেয়ের গর্ভে তোমার পিতার যে পুত্রটি জন্মাবে এবং, ভগবান না করুন, কখনও যদি তার সঙ্গে তোমার শুত্রুতা হয়, তবে তার আর বাঁচার আশা, থাকবে? শান্তনুর সঙ্গে আমার মেয়ের বৈবাহিক সম্বন্ধে আমি এইটুকুই মাত্র দোষ দেখতে পাচ্ছি। আমার আর কোনও অসুবিধেই নেই। সত্যবতীকে তার হাতে তুলে দেওয়া বা না দেওয়া–এর মধ্যে এইটুকুই যা খটকা– এতাবান অত্র দোষো হি…দানাদানে পরন্তপ।
কুমার দেবব্রত কৈবর্ত রাজার আশ্রয় স্পষ্ট অনুধাবন করলেন। সমস্ত ক্ষত্রিয়বৃদ্ধর সামনে তিনি সোদাত্ত কণ্ঠে জবাব দিলেন–তুমি তোমার মনের সত্য গোপন করনি, দাসরাজ! আমিও তাই সত্যের প্রতিজ্ঞা করছি। উপস্থিত ক্ষত্রিয়রা সবাই শুনে রাখুন–এমন প্রতিজ্ঞা আগে কেউ করেননি, পরেও কেউ করবেন না–নৈব জাতো ন চাজাত ঈদৃশং বক্তৃৎসহেৎ। দেবব্রত এবার দাসরাজের কথার সূত্র ধরে বললেন–তুমি যেমনটি বললে, আমি তাই করব। আমি কথা দিচ্ছি–এই সত্যবতীর গর্ভে যে পুত্র জন্মাবে, সেই আমাদের রাজা হবে–যোস্যাং জনিষ্যতে পুত্রঃ স নো রাজা ভবিষ্যতি।
আগেই বলেছিলাম-কৈবৰ্তরাজ পাটোয়ারিবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। তিনি বুঝলেন-সত্যবতীর ছেলের রাজা হবার পথ নিষ্কন্টক। কিন্তু রাজত্ব, রাজসুখ এমনই এক বস্তু যা পেলে বংশ-পরম্পরায় মানুষের ভোগ করতে ইচ্ছা করে। উল্কার মতো এসে যে সুখ ধূমকেতুর মতো চলে যায়, সে সুখ রাজতন্ত্রের রাজা বা গণতন্ত্রের নেতা–কেউই চান না। দাসরাজা তাই চিরস্থায়ী রাজসুখের স্বপ্ন দেখে দেবব্রতকে বললেন–আপনি যা বলেছেন, তা শুধু আপনারই উপযুক্ত। তবে কিনা আমি মেয়ের বাবা বলে কথা। মেয়ের বাবাদের স্বভাবই এমন আর সেই স্বভাবের বশেই আরও একটা কথা আমায় বলতে হচ্ছে–কৌমারিকাণাং শীলেন। বক্ষ্যাম্যহমরিন্দম।
কৈবর্ত্যরাজ বলেন–আপনার প্রতিজ্ঞা যে কখনও মিথ্যা হবে না, সে কথা আমি বেশ জানি। আমি জানি-আপনার পিতার পরে আমার সত্যবতীর ছেলেই রাজা হবে। কিন্তু কুমার! আপনার যে পুত্র হবে তার সম্বন্ধে আমার সন্দেহটা তো থেকেই যাচ্ছে–তবাপত্যং ভবে যত্ত্ব তত্র নঃ সংশয়ো মহান্ দেবব্রত দাসরাজার অভিপ্রায় বুঝে সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধ ক্ষত্রিয়দের শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন–শুনুন মহাশয়েরা, আমার পিতার জন্য আমি প্রতিজ্ঞা করছি–আমি পূর্বেই রাজ্যের অধিকার ত্যাগ করেছি, আপনারা শুনেছেন। এখন আমি বলছি–আমি বিবাহও করব না এ জীবনে। আজ থেকে আমি ব্রহ্মচর্য পালন করব–অদ্য প্রভৃতি মে দাস ব্রহ্মচর্যং ভবিষ্যতি। আমি চিরজীবন অপুত্রক অবস্থায় থাকলেও এই ব্রহ্মচর্যই আমাকে স্বর্গে নিয়ে যাবে।
সেকালের দিনে মানুষের বিশ্বাস ছিল–অপুত্রকের স্বর্গলাভ হয় না। কিন্তু ব্রহ্মচারীর জীবনে যে নিয়ম-ব্রত এবং তপস্যার সংযম আছে, সেই সংযমই তাকে স্বর্গের পথে নিয়ে যায়। দেবব্রতের প্রতিজ্ঞার পরে ব্রহ্মচর্যের সংযম তাই স্বেচ্ছাকৃত হলেও অকারণে নয়।
দেবব্রতর কঠিন প্রতিজ্ঞা শুনে অন্য কার মনে কী প্রতিক্রিয়া হল, মহাভারতের কবি সে খবর দেননি, কিন্তু দাস রাজার হৃদয় আপন স্বার্থসিদ্ধিতে প্রোফুল্ল হয়ে উঠল। সানন্দে তিনি ঘোষণা করলেন–মেয়ে দেব না মানে! তোমার পিতার নির্বাচিত বধুকে এই এখুনি তোমার সঙ্গেই পাঠিয়ে দিচ্ছি আমি। পিতার মনোনীত হস্তিনাপুরের রাজবধু সত্যবতীর সামনে এসে দাঁড়ালেন দেবব্রত। তাকে আপন জননীর সম্মান দিয়ে ভীষ্ম বললেন–এস মা! রথে ওঠ। আমরা এবার নিজের ঘরে ফিরব–অধিরোহ রথং মাতঃ গচ্ছাবঃ স্বগৃহানিতি।
বয়সের দিক দিয়ে দেখতে গেলে দেবব্রত হয়তো সত্যবতীর সমবয়সী হবেন প্রায়। হয়তো বা সত্যবতী একটু বড়। দেবব্রত যখন শান্তনুর ঔরসে গঙ্গাগর্ভে জন্মেছেন, হয়তো তার সমসাময়িককালেই পরাশরের ঔরসে সত্যবতীর গর্ভে জন্মেছেন মহাভারতের কবি। কিন্তু বিবাহের বয়স যেহেতু রমণীর ক্ষেত্রে সব সময়েই কম হয় অপিচ পরাশর যেহেতু সত্যবতীর প্রথম যৌবনটুকুই লঙ্ঘন করেছিলেন তাতে অনুমান করি–সত্যবতী দেবব্রতর চেয়ে খুব বেশি বড় হবেন না বয়সে।
যাই হোক, দেবব্রত যেদিন জননীর সম্বোধনে সত্যবতীকে নিজের রথে তুলে নিয়ে হস্তিনাপুরের পথে পা বাড়ালেন, সেদিন থেকেই এই অল্পবয়স্কা জননীর সঙ্গে তার ভাব হয়ে গিয়েছিল। হস্তিনাপুরের রাজসঙ্কটে এই প্রায় সমবয়স্ক দুই মাতা-পুত্রের পরম বন্ধুত্ব বার বার। পরে আমাদের স্মরণ করতে হবে। দেবব্রত অল্পবয়স্কা জননীকে রথে চাপিয়ে–রথমারোপ্য ভাবিনী–উপস্থিত হলেন হস্তিনাপুরের রাজধানীতে, পিতার প্রকোষ্ঠে। শান্তনুকে তিনি জানালেন–কীভাবে দাসরাজাকে রাজি করাতে হয়েছে এই বৈবাহিক সম্পর্ক সুসম্পন্ন করার জন্য।
এই মুহূর্তে শান্তনুর মুখে পুত্র দেবব্রতর স্বার্থ-সম্বন্ধীয় কোনও সুশ্চিন্তার বলিরেখা আপতিত হয়নি। একবারও উচ্চারিত হয়নি–পুত্র! তোমাকে আমি যুবরাজ পদবীতে অভিষিক্ত করেছিলাম, এখনও তুমি তাই থাকলে। একবারও শান্তনু বলেননি-দেবব্রত! তোমার মতো পুত্র থাকতে, অন্য পুত্রের প্রয়োজন নেই আমার। পরম নৈঃশব্দ্যের মধ্যে দেবব্রতর যৌবরাজ্যের সুখ সংক্রান্ত হল শান্তনু ভাবী পুত্রের জন্য। যৌবনবতী সত্যবতীকে লাভ করে শান্তনুর হৃদয়ে যে রোমাঞ্চ তৈরি হয়েছিল, সেই আকস্মিক হৃদয়াহূদ মহাভারতের কবি সলঙ্কে বর্ণনা করেননি, কারণ আপন জননী সত্যবতীর সম্পর্ক চেতনার মধ্যে রাখলে শান্তনুও মহাভারতের কবির পিতা। তাঁর পক্ষে শান্তনুর হৃদয় ব্যাখ্যা করা সাজে না। যা সাজে তিনি তাই করেছেন। শান্তনুর মুখ দিয়ে পরমেপ্সিত স্ত্রী লাভের কৃতজ্ঞতা বেরিয়ে এসেছে পুত্র দেবব্রতর জন্য। তিনি বর দিলেন–বৎস! তুমি যত কাল বেঁচে থাকতে চাও, ততকালই বেঁচে থাকবে। মৃত্যু তোমার ইচ্ছাধীন, তুমি ইচ্ছামৃত্যু–ন তে মৃত্যুঃ প্রভবিতা যাবজ্জীবিতুমিচ্ছসি।
