দেবব্রত গাঙ্গেয় শেষ পর্যন্ত একটু অধৈর্য হয়েই বললেন–আপনার রোগটা কী জানতে পারি আমি? রোগটা জানলে তার প্রতিকারও সম্ভব-ব্যাধিমিচ্ছামি তে তুং প্রতিকুৰ্যাং হি তত্র বৈ। শান্তনু প্রত্যুত্তর দিলেন বটে এবং দেবব্রতকে খুব ভাল ভাল কথাও বললেন বটে, কিন্তু সেই ভাল ভাল কথাগুলির মধ্যে এমন একটা হাহাকার ছিল, যা পুত্রবাৎসল্য অতিক্রম করে অত্যন্ত নঞর্থকভাবেই শান্তনুর জীবনে এক নতুন সত্যোপলব্ধিকে সদর্থক করে তোলে।
শান্তনু বললেন–তুমি যেমন বলছ–আমি ধ্যানী-যোগীর মতো বসে আছি, কথা-বার্তা বলছি না–এসব কথা মিথ্যা নয়। তবে কি জান–আমার এই বিশাল বংশে তুমিই একমাত্র সন্তান। তুমি যেমন সব সময় নিজের পুরষকার প্রদর্শন করে অস্ত্রশস্ত্রের কৌশল দেখাচ্ছ তাতে আমার বড় ভয় আছে মনে। মানুষের জীবন’বড় চঞ্চল, বাবা। কখন কী হয় কিছুই ঠিক নেই। তাই বলছিলাম–তোমার যদি বিপদ ঘটে, তবে তো আমার বংশটাই লোপ হয়ে যাবে।
শান্তনু কী বলতে চাইছেন বলুন তো? কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে যেন এই পুত্রটির ভাবনা ছাড়া আর কিছুই ভাবেননি জীবনে। একমাত্র পুত্রের সম্ভাবিত কোনও বিপদের জন্য যেন তিনি বড়ই আকুল। শান্তনুর এবারের ভাষণটি মনে রাখার মতো। তিনি বললেন–তুমি আমার একশ ছেলের বাড়া এক ছেলে। আমি আর সন্তান বৃদ্ধির জন্য অনর্থক বিয়ে-টিয়ে করে। গোলমাল পাকাতে চাই না–ন চাপ্যহং বৃথা ভুয়ো দারা কর্তুমিহোৎসহে।
এ যেন অতিরিক্ত মদ্য মাংসপ্রিয় এক অতিথি আমন্ত্রণকারী ব্যক্তিকে বলছে–না, না, ওসব ব্যবস্থা করবেন না। ওই শাক-শুক্তোতেই খুব ভাল। কিন্তু এই ভাল-মানুষির সঙ্গে শান্তনু যখন বলেন–পিতার কাছে একটি মাত্র পুত্রও যা নিঃসন্তান হওয়াও তাই–তখনই তার আসল ইচ্ছেটা বোঝা যায়। দেবব্রতকে তিনি শতপুত্রের অধিক গৌরব দান করেও যখন মন্তব্য করেন-যজ্ঞ বল, বেদ বল, এই সমস্ত কিছুই পুত্রপ্রাপ্তির সৌভাগ্য থেকে কম-তখন বোঝ যায় দেবব্রত ছাড়াও অন্য আরও কোনও পুত্রের মাহাত্ম তার কাছে বড় হয়ে উঠছে। দেবব্রতকে শান্তনু বলেছিলেন–তুমি সব সময় যুদ্ধবিগ্রহ করে বেড়াচ্ছ–তৃঞ্চ শুরঃ সদামী শনিত্যশ্চ ভারত–এই যুদ্ধবিগ্রহের ফলে তোমার যদি ভালমন্দ কোনও ঘটনা ঘটে যায়, তুমি যদি কোনওভাবে নিহত হও–নিধনং বিদ্যতে ক্কচিৎ–তাহলে এই বিশাল বংশের কী গতি হবে?
শান্তনুর কথা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়–দেবব্রত ছাড়াও তিনি অন্য পুত্রের আকাক্ষা করছেন এবং পুত্রের কথা বলাটাই যেহেতু ধর্মর্সম্মত, যেহেতু শাস্ত্রে বলে-পুত্রের প্রয়োজনেই বিবাহ–অতএব বিবাহের মতো একটি গৌণ কর্ম তাঁর অনীপ্সিত নয় এবং যেন পুত্রোৎপত্তির মতো কোনও মুখ্য কর্মের সাধন হিসেবেই এই বিবাহের প্রয়োজন। পুত্র দেবব্রত সব বুঝলেন। মহাভারতের কবি মন্তব্য করেছেন–সব বুঝেই বুদ্ধিমান দেবব্রত পিতার কাছে বিদায় নিয়ে কুরুসভার এক বৃদ্ধ মন্ত্রীর কাছে এলেন– দেবব্রতো মহাবুদ্ধিঃ পথ্যমেবানুচিত্তয়। দেবব্রত তাকে পিতার মনোদুঃখের কারণ জিজ্ঞাসা করলে সেই মন্ত্রী কোনও ঢাক-গুড়গুড় না করে স্পষ্ট বললেন–দাস রাজার কন্যা সত্যবতীর জন্য শান্তনুর মন খারাপ হয়েছে। তিনি তাকে বিবাহ করতে চেয়েছিলেন।
মন্ত্রীর কথা শুনে দেবব্রত সঙ্গে সঙ্গে কুরুসভার অভিজ্ঞ, বৃদ্ধ ক্ষত্রিয়দের নিয়ে উপস্থিত হলেন সেই কৈবর্তপল্লীতে। পিতার বিবাহের জন্য দেবব্রত সত্যবতীকে যাচনা করলেন দাসরাজার কাছে। দাসরাজা বুদ্ধিমান মানুষ। তিনি আকস্মিকভাবে কোনও উলটো কথা বলে বসলেন না। কুমার দেবব্রতকে সাদর সম্ভাষণে তুষ্ট করে আগে তাকে নিয়ে গিয়ে বসালেন নিজের সভায়। বললেন-কুমার! আপনি মহারাজ শান্তনুর পুত্র। যাঁরা অস্ত্রবিদ বলে বিখ্যাত, তাদের মধ্যে আপনি হলেন গিয়ে শ্রেষ্ঠ। পিতার উপযুক্ত অবলম্বন। আপনাকে আর কীই বা আমি বলব! সত্যি কথা বলতে কি-মহারাজ শান্তনুর মতো এক বিরাট পুরুষের সঙ্গে বৈবাহিক সম্বন্ধের সুযোগ পেয়েও যদি সেটা গ্রহণ করা না যায়, তবে আমি কেন স্বর্গের দেবরাজ ইন্দ্ৰঠাকুরও অনুতপ্ত হবেন মনে মনে।
দাসরাজা লুব্ধ শান্তনুর সঙ্গে যেভাবে কথা বলেছিলেন, যেভাবে নিজের শর্তটি তাকে শুনিয়েই চুপ করে গিয়েছিলেন, এখানে কুমার দেবব্রতর সঙ্গে সেভাবে কথা বললেন না। দেবব্রত যুদ্ধবাজ মানুষ, সত্যে তার চিরপ্রতিষ্ঠা, অতএব দাসরাজা ধীরভাবে তার কথাগুলি সযৌক্তিক করে তুললেন। দাসরাজা বললেন–এ মেয়ে আমার নয়, কুমার। কন্যাটি রাজা উপরিচরের–যে উপরিচর কৌলীন্যের গুণে আপনাদেরই বার সমকক্ষ। তিনি কতবার আমাকে বলেছেন যে, এই মেয়ের উপযুক্ত স্বামী হতে পারেন একমাত্র মহারাজ শান্তনু–তেন মে বহুস্তাত পিতা তে পরিকীর্তিতঃ। অহঃ সত্যবতীং বোঢ়ম…।
কোথায় মহারাজ উপরিচর, আর কোথায় শান্তনু! ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে সময়ের একটা মস্ত ফারাক ঘটে যায়। তবে ওই যে বলেছিলাম–মৎস্যদেশে উপরিচর বসু যে পুত্রটিকে বসিয়ে দিয়েছিলেন, সেই পুত্রের পরম্পরায় জাত কোনও মৎস্যরাজের কন্যা হবেন সত্যবতী। দাসরাজা কৈবর্তপল্লীতে তাঁকে মানুষ করেছেন বটে, তবে বাসব রাজাদের কৌলীন্য তিনি ভুলে যাননি। আর কী অদ্ভুতভাবে সত্যবতীর উপাদেয়তা এবং দুর্লভতা উপস্থাপন করছেন তিনি। দাস রাজা বললেন–এই তো সেদিন দেবর্ষি অসিত এসেছিলেন আমার থানে। অসিত, দেবল–এঁরা সব দেবর্ষি। তা দেবর্ষি অসিত বললেন–সত্যবতীকে তার চাই। আমি সোজা ‘না’ বলে দিলাম-অসিতো হ্যপি দেবর্ষিঃ প্রত্যাখ্যাতঃ পুরা ময়া। রাজকন্যে বলে কথা, তাকে কি আর এক শুষ্করুক্ষ মুনির হাতে তুলে দিতে পারি!
