এমন রূপ মহারাজ শান্তনু বুঝি আর দেখেননি। কী তার রূপ! কী মাধুর্য! কৃষ্ণবর্ণ শরীরে রূপের আগুন লেগেছে। শান্তনু তাকে দেখামাত্রই প্রেমে পড়লেন; কামে মোহিত হলেন সমীক্ষ্য রাজা দাসেয়ীং কাময়ামাস শান্তনু। দেবরূপিণী কন্যার দিকে তাকিয়ে রাজা বললেন–তুমি আমার হও। সহাস্যে কন্যা বলল–আমি নিজেই নিজেকে তোমার হাতে তুলে দিতে পারি না। তুমি আমার পিতাকে বলো। শান্তনু সঙ্গে সঙ্গে কৈবর্তপল্লীতে দাস রাজার কাছে গেলেন। নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন-আমি হস্তিনাপুরের রাজা শান্তনু। তোমার কন্যাটিকে বিবাহ করতে চাই আমি–স গত্বা পিতরং তস্যা বরয়ামাস তাং তদা।
কৈবর্তপল্লীর দাস-রাজা মোড়ল গোছের মানুষ। মৎস্য রাজের কন্যাকে তিনি পালন করেছেন ভাতজল দিয়ে। মেয়েকে তিনি যথেষ্ট ভালবাসেন। অনার্য কৈবর্তদের প্রধান হলে কী হবে, তিনি যথেষ্ট পাটোয়ারিবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। রাজার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে হল, আর তিনি ধন্য হয়ে যাবেন-এমন হীনম্মন্যতা তার নেই। তাঁর বিষয়বুদ্ধি অন্য কারও থেকে কম নয়। তিনি বুঝলেন–হস্তিনাপুরের রাজা যখন তাঁর মেয়ের অঞ্চল ধরে এই কৈবর্তবলীতে এসে উপস্থিত হয়েছেন, অতএব তাঁর কাছ থেকে মেয়ের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে নিশ্চিত কথা আদায় কতে হবে।
দাসরাজা চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন– মেয়ে যখন হয়েছে, তখন তাকে তো পাত্রস্থ করতেই হবে, মহারাজ! সে আর এমন বেশি কথা কী–জাতমাত্রৈব মে দেয়া বরায় বরবণিনী। তবে কিনা আমার দুটো কথা ছিল এ বিষয়ে। অভিলাষ সামান্যই, তবু মহারাজ সে কথাটা আপনার শুনতে হবে। অর্থাৎ আপনি যদি সত্যিই এই কন্যাকে আপনার ধর্মপত্নী হিসেবে গ্রহণ করতে চান, তবে আপনাকে তিন সত্যি করে একটা প্রতিজ্ঞা করতে হবে। এই প্রতিজ্ঞাটি করলেই আমি আপনার হাতে মেয়ে তুলে দেব-নইলে আপনার মতো খাসা জামাই আর কোথায় পাব, মহারাজন হি মে ত্বৎসমো কশ্চিদ্ররা জাতু ভবিষ্যতি।
শান্তনু রাজা মানুষ। সহজেই তিনি বুঝে গেলেন–দাসরাজ সহজ নোক নন। শান্তনু প্রথমেই তিন সত্যি করে বসলেন না। বললেন–আগে তোমার অভিলাষটা শুনি, দাস! তবেই সেটা মেটাবার চেষ্টা করব। যদি সেটা মানার মতো হয়, তবেই তো মানব। একটা অসম্ভবকে তো সম্ভব করে ফেলা যাবে না।
দাস-রাজা নিজের সমস্যা ব্যক্ত করলেন–মহারাজ! আমার এই কন্যার গর্ভে যে ছেলেটি হবে, আপনার পরে তাকেই দিতে হবে হস্তিনাপুরের সিংহাসন। আপনি বেঁচে থাকতেই সেই পুত্রকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করতে হবে, যাতে অন্য কোনও ভাগীদার আপনার সিংহাসনের উত্তরাধিকার দাবি না করতে পারেনান্যঃ কশ্চন পার্থিবঃ। যমুনার তীরচারিণী যে রমণী তাকে মুগ্ধ করেছিল, তার মোহন মুখটুকু ছাপিয়ে শান্তনুর মনে ভেসে উঠল গঙ্গাপুত্র, দেবব্রতের সেই কৈশোরগন্ধী মুখখানি। হস্তিনাপুরে সে তার পিতা ছাড়া আর কিছু জানে না। রাজ্যের প্রতিটি প্রজার জন্য তার মায়া ছড়ানো আছে। তাছাড়া, বহু পূর্বেই তিনি হস্তিনাপুরের যুবরাজপদে অভিষিক্ত হয়েছেন। সেই নবযৌবনোৎসুক দেবব্রতকে যৌবরাজ্য থেকে সরিয়ে দিয়ে এই স্বার্থান্বেষী কৈবর্তমুখ্যের কথা মেনে নিতে পারলেন না শান্তনু।
কৈবর্তরাজ শান্তনুকে ভালভাবেই চিনতেন। তাঁর চরিত্রও অস্পষ্ট ছিল না তার কাছে। কৈবর্ত্যরাজ নিশ্চয় জানতেন যে, গঙ্গানামী এক রমণীর সঙ্গে মহারাজ শান্তনুর আত্মিক ঘনিষ্ঠতা ছিল এবং তাকে তিনি বিবাহ করে রাজধানীতে নিয়ে যেতে পারেননি। এমনকি শান্তনুর ঔরসে জাত গঙ্গার পুত্র দেবব্রতই যে হস্তিনাপুরের যুবরাজপদে অধিষ্ঠিত–এই সংবাদও তার অজানা নয়। সবচেয়ে বড় কথা মহারাজ শান্তনু যে স্ত্রী সঙ্গলোভী এক কামুক ব্যক্তি–এও তিনি ভালভাবেই জানতেন। যমুনাতীরবর্তিনী সত্যবতীকে দেখে শান্তনু যখন মুগ্ধ হয়েছেন, তখন তাকে দিয়ে যে খানিকটা অন্যায় কাজও করিয়ে নেওয়া যাবে-এই ছিল দাসরাজার ধারণা। কিন্তু শান্তনু আপাতত রাজি হতে পারলেন না। সাময়িকভাবে হলেও যুবক পুত্র দেবব্রতর জন্য তাঁর কিছু চক্ষুলজ্জা কাজ করল, বিশেষত মতলববাজ দাসরাজার সামনে।
কিন্তু দাসরাজার সামনে যতই তিনি ‘না’ করুন, শান্তনুর মন থেকে সত্যবতীর মোহ একটুও দূরীভূত হল না। সত্যবতীর রূপ চিন্তা করতে করতে কামনায় অধীর হয়ে তিনি হস্তিনাপুরে ফিরলেন–স চিন্তয়ন্নেব তু তাং…কামোপহতচেতনঃ। হস্তিনাপুরের রাজকার্যে তার মন লাগে না, প্রজাদের সুখ-দুঃখের কথা শুনতে তাঁর ভাল লাগেনা, মন্ত্রীদের সঙ্গে রাজ্য শাসনের ভাল-মন্দ নিয়ে আর তিনি কোনও আলোচনায় বসেন না। সারাটা দিন তিনি শুধু বসে থাকেন, আর আনমনে কী যেন ভাবেন।
এইরকমই একদিন মহারাজ শান্তনু বসে বসে সত্যবতীর রূপের ধ্যানেই যেন বসেছিলেন–শান্তনুং ধ্যানমাস্থিত–আর তখনই পুত্র দেবব্রত এসে তার ধ্যান ভাঙিয়ে দিয়ে বললেন–সবদিকেই তো আপনার মঙ্গল দেখতে পাচ্ছি, পিতা! সমস্ত সামন্ত রাজাই আপনার শাসন মেনে নিয়েছেন, তবে কেন সব সময় আপনাকে খুব দুঃখিত আর শোকক্লিষ্ট দেখতে পাচ্ছি। সব সময় কেমন যেন ধ্যান-যোগীর মতো বসে আছেন। আমার সঙ্গে পর্যন্ত একটা কথা বলেন না, ঘোড়া ছুটিয়ে বাইরেও যান না আপনার পুর্বের অভ্যাস মতো। আর শরীরটাই বা কী হয়েছে আপনার–বিবর্ণ, কৃশ, পাণ্ডুর–ন চানে বিনির্যাসি বিবর্ণো হরিণঃ কৃশঃ।
