কুলপতি শৌনক এই অনুরূপ ঘটনা পুনরায় স্মরণ করতে চেয়েছেন, তার কারণ, তিনি নিজে ভৃগুবংশের জাতক এবং অনেক পুরাণ-মতেই তিনি স্বয়ং রুরুর পৌত্র। রুরুর ছেলের নাম শুনক। তার ছেলে শৌনক। পণ্ডিতেরা মহাভারত-কথার মৌলাংশের পূর্বেই ভৃগুবংশের এই বিরাট আখ্যান-আখ্যাপনের মধ্যেই ভার্গবদের প্রক্ষেপের অভিসন্ধি খুঁজে পেয়েছেন এবং হয়তো কোনও কোনও জায়গায়, তাদের গবেষণা মিথ্যা নয়। শুধু ভারত-কথা কেন, ভারতের অন্য যে মহাকাব্য, সেই রামায়ণ-রচনার পেছনেও ভাগবদের অবদান আছে।
যাঁরা কৃত্তিবাসী রামায়ণ পড়েছেন, তাঁরা সেই বিখ্যাত গল্পটির প্রথম পয়ারটা খেয়াল করবেন–
চ্যবন মুনির পুত্র নাম রত্নাকর।
দস্যুবৃত্তি করে সেই বনের ভিতর।
একটু আগেই আপনারা শুনেছেন চ্যবন মুনি ভৃগুর পুত্র। তার পুত্র রত্নার বাল্মীকি—পুত্র না হলেও শিষ্য তো বটে। কৃত্তিবাস বাল্মীকির দস্যুস্বভাব এবং অনার্য প্রকৃতির খোঁজ পেয়েছেন স্কন্দপুরাণের বর্ণনা থেকে। কিন্তু অন্য কোনও প্রাদেশিক রামায়ণ যেখানে বাখীকিকে চ্যবন-মুনির পুত্র বলেনি, সেখানে কৃত্তিবাসের এই বক্তব্য বড় একটা পয়েন্টার। আরও আশ্চর্য সেই প্রথম/দ্বিতীয় খ্রিস্টাব্দের কবি অশঘোষ তার বুদ্ধচরিত নাটকে লিখেছেন যে, চ্যবন-মুনিই নাকি রামায়ণ রচনার একটা প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন, কিন্তু ওই কাজ তিনি শেষ করে যেতে পারেননি। ফলে বাল্মীকির হাতেই প্রথম জন্ম নিল রামায়ণের কাব্য-কথা– বাল্মীকিরাদৌ চ সসৰ্জ পদ্যং/জগ্রন্থ যন্ন চ্যবনো মহর্ষিঃ।
এত কথা বললাম এই কারণে যে, মহাকাব্য সংকলন বা রচনার ব্যাপারে ভার্গব-বংশীয়দের বিলক্ষণ হাত ছিল, তাতে বড় সন্দেহ নেই, কিন্তু যেখানে সেখানে প্রক্ষেপের ধুয়া তুলে তাদের কালের মৃদু-মন্দ স্বাদ-গন্ধটুকু বাদ দেওয়ায় আমাদের ভীষণ আপত্তি আছে। আমরা মহাভারতকে পূর্ণ প্রাণে পেতে চাই, বিশেষত সেই পূর্ণতা যখন ব্যাখ্যাযোগ্যও বটে।
.
০৬.
সেকালের ব্রাহ্মণ-বংশগুলি এবং ক্ষত্রিয় বংশগুলির মোটামুটি বোঝাপড়াটা একরকম ছিল। হস্তিনাপুরে পাণ্ডবদের রাজত্ব শেষ হয়ে গেলে পরীক্ষিত যেমন নাগবংশীয়দের অত্যাচার এড়াতে পারেননি, তেমনই ব্রাহ্মণ উতঙ্কও নাগদের অসভ্যতায় ক্ষুব্ধ। ভৃগুবংশীয়দের কাহিনী, বিশেষত রুরু-প্রমদ্বরার কাহিনী শুনতে চেয়ে মহর্ষি শৌনক শুধু আগুনে ঘি দিলেন। অর্থাৎ ভাবটা এই–এদের বড় বাড় বেড়েছে, উগ্রশ্রবা। আমাদের পূর্ববংশীয়রাও এদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাননি। শৌনকের এই ভাবটা যদি বা থেকেও থাকে, কিন্তু নিরপেক্ষ কথক-ঠাকুর সে কথায় তত আমল দেননি। জনমেজয়ের সর্প-যজ্ঞের আগে যত কাহিনী এসেছে, সবই নাগ-বংশীয়দেরই কাহিনী। ক, বিনতা, জরৎকারু, আস্তীক-মুনি–সকলেই নাগবংশের সঙ্গেই জড়িত। সত্যিই তো মহাভারতের মূল পর্বে যাবার আগে নাগবংশীয়দের এত কথা শুনব কেন? স্বাভাবিকভাবেই প্রবৃত্তি হয় বলতে–এগুলি সব প্রক্ষেপ। পণ্ডিতেরা অবশ্য তাইই বলেছেন। কিন্তু আমার কেবলই মনে হয় এই কাহিনীগুলির একটা রাজনৈতিক এবং সামাজিক গুরুত্বও আছে।
রাজনৈতিক এবং সামাজিক গুরুত্বটা এক কথায় প্রকাশ করতে গেলে বলতে হয় নিম্নবর্গীয় একটি জাতি-গোষ্ঠী কিভাবে চরম শত্রুতা থেকে আর্যগোষ্ঠীর বন্ধুতে পরিণত হল এবং আর্যগোষ্ঠীর দিক থেকেও নবাগত এবং বশ্যতাপ্রাপ্ত বন্ধুকে কিভাবে উপাস্যতা দান করা হল–মহাভারতের মূল পর্বের প্রথমে সেই সামাজিক ইতিহাসটুকুই ধরা আছে।
তবে এই সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাস ধরবার জন্য আমরা মহাভারতের উপাখ্যান অংশকে আগেই ব্যাহত করব না। বরং উপাখ্যানের হাত ধরেই আমরা ইতিহাসে গিয়ে পৌঁছব। কথা হল, হস্তিনাপুরের বর্তমান রাজা জনমেজয় পরীক্ষিতের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে সর্পষজ্ঞ করেছিলেন। কাজেই সর্পযজ্ঞের আগে আসে পরীক্ষিতের মৃত্যুর কথা।
পরীক্ষিত হলেন ক্ষীণ পাণ্ডব-বংশের প্রথম এবং শেষ অঙ্কুর। পুরাণের ভাষায় সন্তানবীজং কুরু-পাণ্ডবানা। যুধিষ্ঠির মহারাজ মৃত অভিমন্যুর এই পুত্রটিকে সিংহাসনে বসিয়ে মহাপ্রস্থানে চলে গেলেন ভাইদের নিয়ে। ভালই রাজত্ব করছিলেন পরীক্ষিত। প্রজারা খুশি, ব্রাহ্মণরা নির্বিঘ্নে যাগ-যজ্ঞ করছেন, রাজকোষ পূর্ণ, সমস্ত দেশ আনত-সামন্ত। কিন্তু তবু তার রাজত্বের দিনগুলোকে খুব মধুর বলা যাবে না। পৌরাণিরো খবর দিয়েছেন পরীক্ষিতের আমলে দ্বাপরযুগ শেষ হয়ে কলি-যুগ প্রবেশ করেছে। কলি’ বলতে আপনারা যদি শুধু যুগের পরিমাণ ধরেন তাতে আমার আপত্তি আছে। কলি শব্দের এক অর্থ হল বিবাদ। অর্থাৎ পরীক্ষিতের আমলেই ঝগড়া-ঝাটি, বিবাদের আমদানি হয়ে গেল ভাল রকম। ঘটনাটা ধর্মের ভাষাতেও সুন্দর বলা যায়।
আমাদের শাস্ত্রে যুগের পরিমাণ ব্যাপারটা এমনই বিশাল এক জিনিস যে, এখনকার ক্রিশ্চান ক্যালেন্ডারের নিয়মে সাল-তারিখ মেপে কখনওই বলা যাবে না যে–অমুক দিন কলিযুগ আরম্ভ হল। আসলে ঝগড়া-বিবাদ অথবা কলিযুগ পরীক্ষিতের রাজত্বের অনেক আগেই আরম্ভ হয়ে গেছে। দ্বারকায় কৃষ্ণের জ্ঞাতি-গুষ্টিরা যখন আকণ্ঠ মদ গিলে নিজেরাই মারামারি করে মরলেন, তখনই যুধিষ্ঠির-অর্জুনের মতো লোকেরা বুঝে গেলেন–ধরাধামে সুস্থভাবে আর বাঁচা যাবে না। পুরাণ বলেছে–যুধিষ্ঠির দেখলেন–শুধু দ্বারকায় নয়, ঘরে বাইরে, নগরে রাষ্ট্রে–সর্বত্র বাদ-বিসংবাদ, লোভ, হিংসা, কুটিলতা একেবারে ছেয়ে গেছে পুরে চ রাষ্ট্রে চ গৃহে তথাত্মনি/বিভাব্য লোভানত-জিহ্ম-হিংসনা। তিনি বুঝলেন–ঢুকে পড়েছে কলি, আর নয়–অভদ্ৰহেতুঃ কলিরবৰ্তত। তিনি ভাইদের নিয়ে মহাপ্রস্থানে চলে গেলেন। সিংহাসনে বসলেন পরীক্ষিত।
