সত্যবতী মিলিত হলেন মহর্ষি পরাশরের সঙ্গে এবং অলৌকিকভাবে সদ্যই গর্ভবতী হলেন। পুত্রও প্রসব করলেন সঙ্গে সঙ্গেই। জন্মালেন মহাভারতের কবি বেদব্যাস। সদ্যগর্ভ, সদ্য-প্রসবের কথা অলৌকিকতার মহিমাতেই মহিমান্বিত থাকুক, কারণ আমাদের মহাভারতের কবি জন্ম নিয়েছেন-জয়তি পরাশর-সুনুঃ সত্যবতী-হৃদয়-নন্দনো ব্যাসঃ।
লক্ষণীয় বিষয় হল–ওদিকে গঙ্গা নামের সেই রমণী হস্তিনাপুরের মহারাজ শান্তনুর পুত্রকে নিজে নিয়ে গিয়েছিলেন মানুষ করার জন্য। আর এদিকে মহামুনি পরাশর নিজ পুত্র দ্বৈপায়ন ব্যাসকে নিয়ে গেলেন নিজের কাছে মানুষ করার জন্য। শান্তনু তবু নিজের ঔরসজাত পুত্রটিকে ফিরে পেলেন গঙ্গার কাছ থেকে। কিন্তু ব্যাস তার মাতা সত্যবতীকে জানিয়ে গেলেন–আপনার প্রয়োজন হলে আমাকে স্মরণ করবেন। সঙ্গে সঙ্গেই আমি আপনার কাছে উপস্থিত হল।
সমস্ত মহাভারত জুড়ে যে ভীষ্মের অবস্থিতি, যিনি ভবিষ্যতে পিতার বিবাহ দিয়ে প্রসিদ্ধ কুরুবংশের সন্তান-পরম্পরা রক্ষা করবেন তাদেরও মৃত্যু পর্যন্ত বেঁচে থেকে, সেই ভীষ্ম হস্তিনাপুরে পৌঁছেছেন আগেই। আর যিনি কুরুবংশের ইতিহাস রচনা করবেন, যিনি ভবিষ্যতে কুরুবংশের সন্তানবীজ বপন করবেন নির্বিকারভাবে, তিনি নির্বিকার ঐতিহাসিকের মতো, পড়ে রইলেন এক দ্বীপে। কৌরব-পাণ্ডববংশের অগাধ ঘটনাধারা তার চারপাশে বয়ে চলবে আর তিনি মাঝখানে বসে থাকবেন দ্বীপের মতো। মহান ভারতবর্ষের সমসাময়িক ঘটনাবলীর উষ্ণ-শীতল জলস্পর্শ চারদিক থেকে তার গায়ে লাগবে, লাগবে মনে, বুদ্ধিতে। কিন্তু কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস চতুরন্ত জলধির মধ্যে জেগে থাকবেন অবিকারী দ্বীপের মতো। নির্বিকারভাবে তিনি ভারতের ইতিহাস শোনাবেন, যে ইতিহাসের মধ্যে তার আপন হৃদয়ের মমতা মাখানো আছে, যে ইতিহাসের মধ্যে তার আপন শোণিত বিন্দু ক্ষরণ হবে প্রতি পলে পলে। অবিকারী দ্বীপের মতে নির্বিকার এক ঐতিহাসিকের ভূমিকা পালন করার সময় তার কবিহৃদয়ের ব্যথা-বেদনা সেই ইতিহাসকে মহাকাব্যে উত্তরিত করবে। ঐতিহাসিকের দৃষ্টি থাকা সত্ত্বেও কেন এই মহাকাব্যের উচ্চাবছ আনন্দ-বেদনার তরঙ্গ তিনি এড়াতে পারেন না, তার কারণ একটাই–তিনি শুধুদ্বীপজ দ্বৈপায়ন ব্যাসই নন, দ্বীপের সমস্ত সান্ধতা স্মরণে রেখেও তার বিচার করতে হবে কৌরব-পাণ্ডবের জন্মদাতা পিতার হৃদয় ব্যাখ্যা করে। তিনি যখন নির্বিকার দ্বীপের মতো ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতে মহাভারতের ইতিহাস বর্ণনা করবেন, তখনই তাকে জন ডানের সেই বিখ্যাত উক্তি মনে করিয়ে দিতে হবে মহাকাব্যের প্ররোচনা মিশিয়ে–
No man is an island, entire of itself; each is a piece of the continent, a part of the main; if a clod bee washed away by the sea, Europe is less, as well as if a promontory were, as well as if a Mannor of your friends or of your own were; any man’s death diminishes me, because I am involved in mankind; and therefore never send to know for whom the bell tolls; it tolls for thee. (পুরাতন ইংরেজি শব্দ কথঞ্চিৎ আধুনিকভাবে রূপান্তরিত)
.
৫৬.
মহামুনি পরাশরের সংস্পর্শে এসে তথাকথিত কৈবর্তপল্লীর রমণী মৎস্যগন্ধা গন্ধবতী’ সত্যবতীতে পরিণত হলেন। তিনি যেখানে উপস্থিত থাকতেন, সেখান থেকে দূর দূরান্তে তার অঙ্গের সৌরভ ছড়িয়ে পড়ত, আমোদিত হত দিগদিগন্ত। আমরা এই পৃষ্পমোদের অর্থ অন্যরকম বুঝি। আমরা বুঝি–কৈবর্তপল্লীতে মানুষ হওয়া এই রমণী মহামুনি পরাশরের। সংস্পর্শে আসার সঙ্গে সঙ্গে তার পূর্বতন পালক-পিতার জাতিসংস্কার কাটিয়ে উঠে ব্রাহ্মণ্য সংস্কার লাভ করেছিলেন। তার সুনাম-সৌগন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে। হয়তো সেই কারণেই এবার গঙ্গার তীর ছেড়ে যমুনা পুলিনে এসেছিলেন শান্তনু। হস্তিনাপুরের মহারাজ। শান্তনু।
শান্তনু যমুনার তীরে এসে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, আর তখনই তার নাকে ভেসে এল মধুর গন্ধ-বসন্তের বাতাসটুকুর মতো। গন্ধের উৎস খুঁজতে খুঁজতে তিনি দেখতে পেলেন স্বর্গসুন্দরীর মতো সেই রমণীকে, যার নাম সত্যবতী, গন্ধবতী, যোজনগন্ধা। এতই তার নামের প্রচার যে একটি মাত্র নামে তাকে ডাকাও যেন সঙ্গত হয় না। দেবরূপিণী কন্যাকে দেখেই শান্তনু তাকে জিজ্ঞাসা করলেন–তুমি কে? কার মেয়ে? তুমি কী করছ এখানে-কস্য ত্বমসি কা বাসি কিঞ্চ ভীরু চিকীর্ষাস। কন্যা বলল–আমি দাসরাজার কন্যা। তিনি বলেছেন, তাই আমি তার নৌকাখানি বেয়ে খেয়া পারাপার করি।
গঙ্গাতীরবর্তিনী গঙ্গার পরে যমুনাতীরবর্তিনী সত্যবতী। কত কাল পরে এমন এক সর্বাঙ্গসুন্দরী রমণীকে দেখে মুগ্ধ হলেন শান্তনু। সেই সম্ভোগসুখের কথা মনে পড়ল। মনে পড়ল–গঙ্গা কীভাবে তাকে সুখী করার জন্য কত চেষ্টাই না করেছেন। নৃত্য-গীত লাস্য কীই না প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু তিনি নিজেও রইলেন না শান্তনুর গৃহবধু হয়ে অথবা তাকে রাজধানীতে নিয়ে যাবার মতো গৃহিণীর সুস্থ সত্তাও তার মধ্যে ছিল না। অধুনা শান্তনু তার ঔরসজাত পরম প্রিয় পুত্র দেবব্রতকে ফিরে পেয়েছেন বটে, কিন্তু সুচিরকাল স্ত্রী সঙ্গহীন এক রাজার দিন-রাত কাটে শুধু রাজকার্যে আর পুত্রস্নেহে। বসন্তের জ্যোৎস্নায়, শরতের প্রভাতে অথবা বর্ষার মেঘমেদুর সুনীল ছায়ায় তার অনেক কিছু বলার থাকে, বলা হয় না, অনেক কিছু শোনার থাকে, শোনা হয় না। শান্তনু তাই যমুনাপুলিনে এসেছেন নিঃসঙ্গতা এড়াতে। আর ঠিক সেই সময় তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল দাসেয়ী গন্ধবতীর সঙ্গে।
