মহাভারতের উপাখ্যানে সত্যবতীর জননীকে যেভাবে এক মৎসীর রূপ দেওয়া হয়েছে এবং সত্যবতীর আপন ভ্রাতার নামেই যেহেতু মৎস্যদেশের প্রতিষ্ঠা, অপিচ এই মৎস্যও যেহেতু একজন বাসব রাজা, তাই আমরা অনুমান করি সত্যবতী মৎস্যদেশীয় কোনও রমণী ছিলেন। অথবা তত্রস্থ মৎস্যরাজার সঙ্গে তার আত্মসম্বন্ধ ছিল বলেই মহাভারত তাকে মৎস্যা মৎস্যগন্ধিনী’ বলেছে। সংস্কৃতে সগন্ধ’ শব্দের অর্থ আত্মীয় অর্থাৎ নিজের জাত। গান্ধার দেশের মেয়ে যদি গান্ধারী হতে পারেন, মদ্রদেশের মেয়ের নাম যদি মাদ্রী হয়, তবে মৎস্যদেশের মেয়েই বা মৎসী বা মৎস্যগন্ধা হবেন না কেন? অবশ্য এমন হতেই পারে সত্যবতীর জন্মের মধ্যে গৌরব ছিল না তত। আমরা উপরিচর বসুর পট্টমহিষী গিরিকার জম্মেও তেমন গৌরব কিছু দেখিনি। মহাভারতে যমুনানদীর অন্তরচারিণী যে মৎসীকে আমরা উপরিচর বসুর তেজবিন্দু ভক্ষণ করতে দেখেছি, আমাদের ধারণা, তিনি বসুরাজের পূর্বাধিকৃত মৎস্যদেশের কোনও রমণী। হয়তো সেই মৎস্যদেশীয় কোনও রমণীর বংশধারাতেই সত্যবতীর জন্ম, যার জন্মদাতা স্বয়ং কোনও বাসব বা বসুবংশীয় কোনও রাজা।
এমন হতেই পারে–সেই রমণীর কুলশীল আর্যজনের বিগর্হিত ছিল এবং সত্যবতী পালিত হয়েছেন কোনও ধীবরপল্লীতে। কিন্তু, এই ধীবর শব্দটি মহাভারতের উপাখ্যানে এসেছে শুধুমাত্র ‘মৎস্য’ শব্দের সূত্র ধরে। আমরা মনে করি, মৎস্যগন্ধার পিতা সেই ধীবররাজ আসলে মৎস্যদেশের রাজা। সত্যবতী ধীবররাজ ওরফে মৎস্যরাজের কন্যা ছিলেন বলেই তার গায়ে আঁশটে গন্ধ ছিল,–এটা যেমন আমাদের কাছে উপাখ্যানমাত্র, তেমনই তার পিতা নৌকা পারাপার করেন–এই কাহিনীও আমাদের কাছে উপাখ্যানমাত্র। খেয়াপারের নাবিকের অনুপস্থিতিতে তার কন্যা সহস্র মানুষকে পারাপার করাচ্ছে-রমণীর শরীরে কি এতও সয়। তবে হ্যাঁ, এটা স্বীকার করি এবং স্বীকার করতে পছন্দ করি যে সেদিন সেই গোধূলিবেলায় মৎস্যরাজের কন্যা একটি ডিঙি নৌকায় একা বসেছিলেন সবিভঙ্গে, ক্ষণিকের অবসর অথবা বিনোদনে। আর সেই সময়েই মহামুনি পরাশর এসে বলেছিলেন- আমি তোমার শেষ যাত্রী হব।
নৌকার ওপরে পরাশর সপ্রেম দৃষ্টিপাতে রমণী যখন কিঞ্চিৎ আপ্লুতা বোধ করছেন, তখনই তিনি জানিয়েছেন–আমি ধীরাজার মেয়ে, আমার পিতা-মাতা কেউ নেই সেজন্য আমার মনে কষ্ট আছে জেনোজন্মশোকাভিতায়াঃ কথং জ্ঞাস্যসি কথ্যতা। সত্যবতী যদি উপরিচর বসুর মেয়েই হবেন, তবে মাতৃপিতৃহীন বলে তার শোকাতুরা হবার কোনও কারণ। নেই। তিনি আরও জানিয়েছেন–আমি দাশরাজার মেয়ে; লোকে আমাকে মৎস্যগন্ধা বলে ডাকে। বস্তুত তিনি মৎস্যরাজের মেয়ে বলে তাকে মৎস্যগন্ধা বলে ডাকে, আর তার মায়ের ব্যাপারে কোনও গৌরব না থাকায় ‘বাসব’ মৎস্যরাজ তাকে ঘরে রাখেননি। কিন্তু মহামুনি পরাশর তার জন্ম-কর্মের খবর রাখেন এবং জানেন–মৎস্যগন্ধা আসলে বসুবংশেরই মেয়ে—‘বাসবী’ যিনি মানুষ হয়েছেন, মৎস্য দেশের কোনও অপাংক্তেয় মানুষের কাছে, যার নাম অবশ্যই দাশ।
পরাশর কোনও অসভ্য ভণিতার মধ্যে যাননি। একবারও মৎস্যগন্ধার অপার রূপরাশি বর্ণনা করে তার স্তন-জঘনের প্রত্যঙ্গশোভায় মন দেননি। তিনি পরিষ্কার জানিয়েছেন বাসবী। আমি তোমার কাছে একটি পুত্র চাই, তাই তোমার সঙ্গে আমি মিলন প্রার্থনা করি। মৎস্যগন্ধা সলজ্জে জানিয়েছেন-যমুনার ওপারে ঋষি-মুনিদের দেখা যাচ্ছে–পশ্য ভগবন্ পরপারে স্থিতান্ ঋষী–এই অবস্থায় কীভাবে আপনার সঙ্গে মিলন সম্ভব? সবাই যে দেখছেন আমাদের–আবয়ো-দৃষ্টয়োরেভিঃ কথং নু স্যাৎ সমাগমঃ। পরাশরের অলৌকিক মহিমায় কুয়াশার সৃষ্টি হল মিলনপিয়াসী দুই নর-নারীর চতুর্দিকে। নাকি, গোধুলির শেষ লগ্নে অন্ধকারের ছায়া নামছিল প্রেম-নত নয়নের দীর্ঘচ্ছায়াময় পল্লবের মতো। সেটাই হয়তো অলৌকিক সেই নীহারিকা।
ঘন-সন্ধ্যার প্রায়াচ্ছন্ন অন্ধকারে কামপ্রবৃত্ত পরাশরের সামনে প্রখর বাস্তব বিদ্ধ করল কুমারী সত্যবতীকে। তিনি বললেন–মুনিবর! আমি যে কুমারী। আমার পিতা কি বলবেন? আমার কুমারীত্ব দূষিত হলে আমি ঘরে ফিরব কী করে, ঘরে থাকবই বা কী করে–গৃহং গন্তুষে চাহং ধীমন্ ন স্থাতুমুৎসহে। পরাশর প্রখর ব্যক্তিত্বময় মহামুনি। তিনি জানেন-তিনি যদি এই কুমারীর কুমারীত্ব হরণ করেও পশ্চাদজাত পুত্রের পিতৃত্ব স্বীকার করেন, তবে এই রমণীর অসুবিধে কিছু হবে না। তখনকার সমাজে এই ঘটনা দূষণীয়ও ছিল না। অতএব তিনি। আশীর্বাদের ভঙ্গি মিশিয়ে কুমারীকে বললেন– তুমি আমার প্রিয় কার্য সম্পাদন কর। তুমি আবার তোমার কন্যাভাব ফিরে পাবে। আমি সন্তুষ্ট হয়েছি, তুমি যে বর চাও তাই পাবে।
মৎস্যগন্ধা বললেন–আমার গায়ের মৎস্যগন্ধ দূর হোক, সৌগন্ধে প্রসন্ন হোক আমার শরীর। আমরা পূর্বে এই মৎস্যগন্ধের কথা বিশ্বাস করিনি, এখনও করি না। বস্তুত যে জম্মদাতা মৎস্যরাজ তার জন্ম দিয়েও তার পিতৃত্ব স্বীকার না করে তার পালনের ভার দিয়েছিলেন। অন্যের ওপর, পিতৃমাতৃহীন অভিমানিনী সেই রমণী মৎস্যরাজের সন্ধতা অথবা আত্মীয়তা অস্বীকার করলেন প্রথম সুযোগে। পরাশরের আশীর্বাদে তাঁর রমণীশরীরে পদ্মের সৌগন্ধ এসে তিনি ‘যোজনগন্ধা’ বা ‘গন্ধবতী’তে পরিণত হলেন কিনা তা জানি না, তবে এই মুহূর্ত থেকেই যে তার নাম সত্যবতী হল, সে কথা আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
