পরাশর বিষ্ণুপুরাণ রচনা করেছিলেন কিনা, অথবা তিনি বার বৎসর বয়সের মধ্যেই সাঙ্গ বেদ অধিগত করেছিলেন কিনা, সেটা ভিন্ন প্রশ্ন। আমরা এই উপাখ্যানের অবতারণা করেছি একটিমাত্র কারণে। পরাশর কত শীঘ্র ক্রোধ প্রশমন করতে পারেন। শাস্ত্রকারেরা বলেছেন কাম এবং ক্রোধের জন্ম হয়েছে একই উৎস থেকে। উভয়েই রজোগুণের আত্মজ-কাম এবং ক্রোধ এষ রজোগুণসমূদ্ভবঃ। যিনি এক মুহূর্তের মধ্যে নিজের উদ্যত ক্রোধকে বশীভূত করতে পারেন সেই পরাশর মুনিকেই একটু আগে আমরা যমুনার তীরে এসে দাঁড়াতে দেখেছি। খেয়াতরীর নাবিকের অনুপস্থিতিতে তার মেয়ে নৌকা নিয়ে বসে আছে ঘাটে। মুনি তার উদ্ভিন্ন যৌবন নিরীক্ষণ করেছেন, তার কালো রূপের মধ্যে আলো দেখতে পেয়েছেন তিনি।
কিন্তু মহাভারতের অন্যান্য নরনারীর মধ্যে একবারের দর্শনমাত্রেই যে কামভাব লক্ষ্য করেছি, এখানে মুনির মনেও সে কামভাব আছে, কিন্তু তার মধ্যে পরিশীলনও আছে। আর আছে কবির মতো সেই ভাষা–আমি তোমার দিনশেষের শেষ যাত্রী হব, বাসবী। আমাকে নিয়ে চল যমুনার পরপারে–অহং শেষো ভবিষ্যামি নীয়তা অচিরেণ বৈ।
‘বাসবী’! এই শব্দের অর্থ এই রমণী বোঝে। তবে মুনি তাকে কেন বাসবী’ বলে ডাকলেন, তার কারণ জানার জন্য মনে মনে এই রমণীর আগ্রহ জেগে রইল। তবে আপাতত মুনির মন টলিয়ে কালী তার নৌকায় শেষ যাত্রীকে তুলে নিলেন। নৌকা বাইতে আরম্ভ করলে হালের টানের সঙ্গে তার রমূণী-শরীরের বিভঙ্গও একাকী সেই যাত্রীর চোখে পড়ল। মুনি তার দিকে নির্নিমেষে তাকিয়ে রইলেন। কালো মেয়ে সব বুঝে ফেলল এক লহমায়। খানিকটা সপ্রতিভ হওয়ার চেষ্টা করে সে বলল–লোকে আমাকে মৎস্যগন্ধা বলে ডাকে। আমি ধীবররাজ দাশের কথা কন্যা। বাস্তবে আমার পিতা-মাতা যে কে, তা ঠিক জানি না। সেজন্য আমার দুঃখও আছে যথেষ্ট।
মুনি রমণীকে নিরীক্ষণ করছেন অপলকে, কিন্তু সে সম্বন্ধে কোনও কথা না বলে, কেন তিনি তাকে ‘বাসবী’ বলে ডেকেছেন, তার কারণ জানার ইচ্ছেটাই সাময়িকভাবে বড় হয়ে উঠল। পরাশর যা বললেন, অথবা মহাভারতে যেমন বলা আছে, তাতে এই রমণী সেই বিখ্যাত চৈদ্য রাজা উপরিচর বসুর কন্যা বলে প্রমাণিত। কিন্তু এ প্রমাণ মহাকাব্যের উপাখ্যানশৈলীতে সঠিক বলে মনে হলেও বাস্তবে তা হতে পারে না। উপাখ্যানে আছে–উপরিচর বসু তার স্ত্রী গিরিকার সঙ্গে মিলিত হওয়ার আশায় বসেছিলেন। ঋতুস্নাতা গিরিকাও প্রস্তুত হয়ে ছিলেন মিলন কামনায়। কিন্তু এই অবস্থায় রাজাকে পিতৃপুরুষের আদেশে পিতৃযজ্ঞের জন্য মৃগবধের উদ্দেশে চলে যেতে হয় আকস্মিকভাবে।
মৃগয়ায় রাজার মন বসল না। সুন্দরী গিরিকার কথা বারবার তার মনে পড়ল–চকার মৃগয়াং কামী গিরিকামেব সংস্মরন্। রাজার মন মানল না, কামনার তেজবিন্দু তিনি ধারণ করলেন পত্রপুটে।
তারপরের ঘটনা সবার জানা। সেই তেজবিন্দু রাজা পাঠিয়ে দেন গিরিকার কাছে, এক বাজপাখির পায়ে বেঁধে। পথিমধ্যে অন্য একটি বাজপাখির আক্রমণে এই তেজ পতিত হয় যমুনা নদীতে। সেখানে শাপগ্রস্ত অঙ্গরা অদ্রিক মৎসী হয়ে বিচরণ করছিলেন। উপরিচর বসুর তেজ সেই মৎসী ভক্ষণ করে এবং গর্ভবতী হয়। এক সময়ে যমুনা নদীতে জাল ফেলে ধীবরেরা এই মৎসীকে দৈবাৎ ধরে ফেলে। ধীবরেরা এই মৎসীর গর্ভ থেকে একটি স্ত্রী এবং একটি পুরুষ শিশু দেখতে পায়। এই আশ্চর্য ঘটনা ধীবরেরা দেশের রাজা উপরিচর বসুর কাছে নিবেদন করে। সব দেখে শুনে চৈদ্য পুরুষ শিশুটিকে গ্রহণ করেন এবং মহাভারত বলেছে–রাজার এই পালিত পুত্র ভবিষ্যতে মৎস্য নামে একটি ধার্মিক রাজা বলে পরিচিত হন–স মৎস্যো নাম রাজাসীদ ধার্মিকঃ সত্যসঙ্গরঃ। শিশুকন্যাটিকে রাজা ধীবরদের হাতেই দিয়ে দেন এবং বলে দেন। শিশুটিকে যেন তারাই মানুষ করে। মৎস্যঘাতীদের আশ্রয়ে থাকায় এই মেয়েটি মৎস্যগন্ধা নামে পরিচিত হন–সা কন্যা দুহিতা তস্যা মৎস্যা মৎস্যসগন্ধিনী। তার অপর নাম সত্যবতী এবং তার ডাকনাম হয়তো কালী।
এই উপাখ্যানের অলৌকিকতার খোলস থেকে প্রকৃত সত্য উদ্ধার করা যথেষ্টই কঠিন এবং অসম্ভবও বটে। উপরিচর বসুর বংশ-পরম্পরা বিচার করলে কোনওভাবেই তিনি মৎস্যগন্ধা সত্যবতীর পিতার সমবয়সী হতে পারেন না। সত্যবতী, ব্যাসদেব, ভীষ্ম এবং শান্তনুর সঙ্গে উপরিচর বসুর সমসাময়িকতা মাথায় রাখলে কোনওভাবেই সত্যবতী উপরিচরের কন্যা হতে পারেন না। কারণ, উপরিচর বসু অনেক আগের মানুষ। তবে এখানে একটা কথাই খেয়াল করার মতো। পরাশর মৎস্যগন্ধা কালীকে ডেকেছিলেন ‘বাসবী’ বলে। আমরা পূর্বে মহাভারতের মধ্যেই দেখেছি উপরিচর বসুর সব পুত্রকে একসঙ্গে ‘বাসব’ বলে ডাকা হয়–বাসবাঃ পঞ্চ রাজানঃ পৃথশোস্ট শাশ্বতাঃ। আমাদের অনুমান-মৎস্যগন্ধা বসুরাজের। পুত্র কোনও ‘বাসব’ রাজার বংশে জন্মেছেন। সেই কারণেই পরাশর তাঁকে ডেকেছেন বাসবী বলে।
আমাদের আরও একটা অনুমানের কথা বলি। আমরা পূর্বে জানিয়েছি–উপরিচর বসুর পঞ্চম পুত্র ‘মাবেল্ল’ হয়তো বসুরাজের অধিকৃত মৎস্যদেশের রাজা ছিলেন। কিন্তু বায়ু পুরাণে দেখছি–উপরিচর বসুর পুত্রসংখ্যা পাঁচ নয়, সাত জন এবং তার সপ্তম পুত্রের নামই মৎস্য অথবা মৎস্যকাল-মাথৈল্যশ্চ (মাবেশ্চ) ললিথশ্চ মৎস্যকাল সপ্তমঃ। সংস্কৃত পংক্তিটিতে ললিখ বলে যাদের বলা হয়েছে পণ্ডিতেরা তাদের রাজপুত লাঠোরদের পূর্বপুরুষ মনে করেন। আর আগেই আমরা জানিয়েছি যে, তখনকার মৎস্যদেশ হল এখনকার রাজপুতনার জয়পুর-ভরতপুর এবং আলোয়ার অঞ্চল। অর্থাৎ ললিখ এবং মৎস্য–এঁরা দুজনেই রাজপুতনা বা মৎস্যদেশের অধিবাসী ছিলেন।
