রাজা কল্মাষপাদ নাকি শরি শাপে নরমাংসভোজী এক রাক্ষসে পরিণত হন এবং এই পরিণতির পর শক্ত্রিকে দিয়েই নাকি রাজা কল্মষপাদের নরমাংস ভোজনের আরম্ভ সূচিত হয়। এই উপাখ্যানের মধ্যে যে সত্য আছে, তার চেয়েও বড় সত্য হল–রাজা কল্মষপাদ মহর্ষি বিশ্বামিত্রের সহযোগিতায় বশিষ্ঠপুত্র শক্ট্রিকে অকালে বধ করেন। আসলে এটা এক ক্ষত্রিয় রাজার সঙ্গে ব্রাহ্মণ্য বিবাদের ঘটনা। মহাভারতে এই ঘটনার প্রসঙ্গও এসেছে ভার্গব ব্রাহ্মণদের সঙ্গে ক্ষত্রিয় রাজাদের বিবাদের সূত্র ধরে। রাক্ষস-টাক্ষসের উপাখ্যান থাক, কল্মষপাদ শক্ট্রিকে হত্যা করেছিলেন। পরে অবশ্য শক্ট্রির পিতা বশিষ্ঠের সঙ্গে কল্মষপাদের সুসম্পর্ক স্থাপিত হয়। কিন্তু এতদিনে আরও একটি ঘটনা ঘটে গেছে।
শক্ত্রি যখন মারা যান, তখন তার ঔরসজাত পুত্র গর্ভস্থ ছিলেন। শক্ত্রি স্ত্রীর নাম অদৃশ্যন্তী। ঋষি বশিষ্ঠ পুত্রশোকে পাগল হয়ে যান। নানাভাবে তিনি আত্মহত্যারও চেষ্টা করেন। কিন্তু সে চেষ্টা সফল হয় না। বহুকাল নানা জায়গায় ঘুরে–স গত্বা বিবিধান শৈলান্ দেশান্ বহুবিধাস্তথা। ক্লান্ত শ্রান্ত শোকাচ্ছন্ন মুনি আবার নিজের আশ্রমে ফেরার পথ ধরলেন। ঠিক এই সময়ে একটি দীনহীন বিধবা রমণী বশিষ্ঠকে অনুসরণ করে চলতে লাগল পিছন পিছন। আনমনা বশিষ্ঠের কানে হঠাৎ ভেসে এল বেদ-উচ্চারণের উদাত্ত-অনুদাত্ত-স্বরিত। মহর্ষি পিছন ফিরে অবাক বিস্ময়ে বলে উঠলেন–কে? কে আমার পিছন পিছন আসছে? বিধবা রমণী বললেন–আমি। পিতা আমি আপনার পুত্রবধূ অদৃশ্যতী। বশিষ্ঠ বললেন– তাহলে কার মুখে এই বেদধ্বনি উচ্চারিত হতে শুনলাম। এই ধ্বনি এই স্বর। এ যে আমার বহুপূর্ব-পরিচিত। আমার মৃত পুত্র শস্ত্রির মুখে আমি ঠিক এই স্বর, এই উচ্চারণ শুনেছি– পুরা সাঙ্গস্য বেদস্য শক্রেরিব ময়া ক্ষতঃ।
অদৃশ্যন্তী সলজ্জে বললেন–পিতা! আমার গর্ভে একটি পুত্র রয়েছে। আপনার পুত্র শক্ট্রির ঔরসেই এই পুত্রের উৎপত্তি। এখন তার বার বৎসর বয়স। সে গর্ভস্থ অবস্থাতেই সাঙ্গ বেদ উচ্চারণ করছে। এটি সিদ্ধান্তবাগীশের বঙ্গানুবাদের ভাবমাত্র। আমাদের বিশ্বাস বশিষ্ঠ পুত্রশোকে পাগল হয়ে বঙ্কাল আশ্রমের বাইরে ছিলেন। হয়তো তিনি যখন ফিরে এসেছেন, তখন শন্ত্রিপুত্রের বার বছর বয়েস হয়ে গেছে। মায়ের কাছে, মায়ের অনুশাসনে, একমাত্র মায়েরই অঞ্চলছায়ায় তিনি এত বছর ধরে বড় হয়েছেন বলেই হয়তো এই গর্ভাবাসের কল্পনা। সংস্কৃত শ্লোকটি থেকেও এই কথাই প্রমাণ হয়। সেখানে বলা আছে আমার গর্ভ থেকেই এই পুত্রের জন্ম। আপনার পুত্র শক্তির পুত্র এই বালক। ছোটবেলা থেকে বেদ্যাভ্যাস করতে করতে এই ছেলের এখন বার বছর বয়স হল–সমা দ্বাদশ অস্যেহ বেদান্ অভ্যস্যতো মুনে।
অদৃশ্যন্তীর মুখে এই কথা শুনে বশিষ্ঠ আহ্লাদিত হলেন। শক্ত্রি বেঁচে নেই, তবে তাঁর পুত্র তো আছে–অস্তি সন্তানম, ইত্যুত্বা-বংশের ধারাটি তো অবিচ্ছিন্ন রইল। বশিষ্ঠ পুত্রবধূর সঙ্গে আশ্রমে ফিরে চললেন। শক্ত্রির পুত্র–সে যেন শক্ত্রিরই অন্য এক রূপ, অন্য এক জীবন–পরাসু। পর-অন্য। অসু-প্রাণ, জীবন। অথবা পরাসু অর্থাৎ নিণভাবে যে এতকাল বর্তমান ছিল, শক্ত্রির সেই পুত্রের নাম তাই পরাশর।
পরাশর অদৃশ্যন্তীর সামনেই পিতামহ বশিষ্ঠকে ‘বাবা’ ‘বাবা’ বলে ডাকতেন। স্নেহময় বশিষ্ঠ তাতে বাধা দিতেন না। ভাবতেন–আহা! পিতা নেই, অন্যদের দেখে দেখে কাউকে পিতা বলে ডাকতে কোন বালকের না ইচ্ছা করে। পুত্রের এই ব্যবহারে মাতা অদৃশ্যন্তী বড় অস্বস্তিতে পড়তেন। কিছু লজ্জাও হত বুঝি। তা একদিন পরাশর বশিষ্ঠকে বাবা-বাবা’ করছেন, এই অবস্থায় অদৃশ্যণ্ডী পুত্রকে বললেন-বাছা! তুমি তোমার ঠাকুরদাদাকে এমন ‘বাবা-বাবা বলে ডাক কেন। এমন কোরো না-মা তাত তাত তেতি ক্ৰহ্যেনং পিতরং পিতুঃ। বনের ভিতর তোমার পিতাকে এক রাক্ষস খেয়ে ফেলেছে।
পরাশরের ক্রোধ উদ্দীপ্ত হল। তিনি রাক্ষসবধের জন্য রাক্ষসমেধ যজ্ঞ আরম্ভ করলেন। দলে দলে রাক্ষস এসে যজ্ঞের আগুনে পুড়ে মরতে লাগল। উপাখ্যান অনুযায়ী মহর্ষি অত্রি, পুলহ এবং রাক্ষসদের মূলপিতা পুলস্ত্যও পরাশরের ক্রোধ শান্ত করার জন্য যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হলেন। তারা সকলে একবাক্যে নিরীহ রাক্ষসদের বধ না করার জন্য পরাশরকে অনুরোধ করলেন। পরাশর সঙ্গে সঙ্গে তার প্রদীপ্ত রোষ সম্বরণ করলেন। তিনি যজ্ঞ বন্ধ করে দিলেন। তদা সমাপয়ামাস সত্রং শাস্ত্রো মহামুনিঃ।
রাক্ষসবধের জন্য নির্দিষ্ট কোনও যজ্ঞে পর পর রাক্ষস-বধ চলছিল কিনা, তা বলা সম্ভব নয়। তবে ব্রাহ্মণ-পরাশরের সঙ্গে অনাচারী রাক্ষসদের যে একটা তুমুল বিবাদ আরম্ভ হয়েছিল, সে কথা না বললেও চলে। অনুমান করা যায়–রাক্ষস-পক্ষপাতী পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু ইত্যাদি খ্যাতনামা মুনিদের হস্তক্ষেপে পরাশর যজ্ঞ বন্ধ করে দিলেন। পরাশরকে মুনিরা বলেছিলেন–ক্রোধ নয়, শান্তিই ব্রাহ্মণের ধর্ম। পরাশর শান্ত হলেন।
পরাশরের এই ক্রোধশান্তির ব্যাপারে অন্যান্য মুনি-ঋষিদের তর্ক-যুক্তির অবদানই বেশি বলে মহাভারতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বিষ্ণুপুরাণে দেখেছি–পরাশরকে তার পিতামহ বশিষ্ঠই শান্ত করেছিলেন। পরাশরকে তিনি বুঝিয়েছিলেন–আমার এবং আমার পুত্রের কোনও অপকার যারা করেনি, সেই নিরীহ রাক্ষসদের অগ্নিদগ্ধ কোরো না–অলং নিশাচরৈন্ধৈ-দীনৈরনপারিভিঃ। পিতামহের অনুনয়ে পরাশর তৎক্ষণাৎ আরব্ধ যজ্ঞ বন্ধ করেন এবং তখনই রাক্ষস-সমাজের মূল জনক পুলস্ত্য তাকে আশীর্বাদ করে বললেন–তীব্র বৈরভাব থাকা সত্তেও তুমি যে গুরুজনের কথায় এইভাবে ক্ষমা অবলম্বন করেছ, তাতে আমার আশীর্বাদ তুমি সমস্ত শাস্ত্রে প্রবীণ হবে। আরও বড় কথা, তুমি একটি পুরাণ-সংহিতার কর্তা হবে-পুরাণসংহিতাকর্তা ভবান্ বৎস ভবিষতি। আমরা জানি বিষ্ণুপুরাণের সংকলক স্বয়ং পরাশর।
