ছবি। পেজ ৩৮০।
খেয়াল রাখতে হবে–যদুবৃষ্ণি সংঘের যারা প্রধান ছিলেন, তাদের ব্যবহার ছিল অনেকটা সুলতানি আমলের আমির-ওমরাহদের মতো। উগ্রসেন যেমন এঁদেরই মদতে নেতা নির্বাচিত হয়েছিলেন, তেমনই রাজা হওয়ার পর কংসেরও প্রধান কাজ ছিল– এইসব সংঘমুখ্যের মদত সংগ্রহ করা। আমরা সময়মতো প্রমাণ করে দেখাব যে অন্ধকসংঘ, কুকুরসংঘ, বৃষ্ণিসংঘ, পৃঞ্চিসংঘ, ভোজসংঘ, শিনিসংঘ–এইসব যদুসংঘের বেশিরভাগ প্রধান পুরুষেরাই সাময়িকভাবে কংসের রাজসভা অলঙ্কৃত করেছেন। অর্থাৎ ভয়েই হোক অথবা ঝামেলা এড়ানোর জন্য সংঘমুখ্যরা অনেকেই কংসকে মদত দিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু রাজসভার অলংকার হলেও এঁদের মধ্যে কেউ কেউ নিশ্চয়ই ছিলেন যারা সামনাসামনি কংসের মন যুগিয়ে চললেও আড়ালে সিংহাসনচ্যুত রাজা উগ্রসেনের জন্য কাজ করে যাচ্ছিলেন এরকমই একজন সংঘমুখ্য হলেন কৃষ্ণের পিতা বসুদেব।
এই তালিকাটি সম্পূর্ণ নয়। একেবারে নির্ভুলও নয়। তবে এটা থেকে যদুবৃষ্ণিদের সংঘ-মুখ্যদের একটা আঁচ পাওয়া যাবে। এঁদের মধ্যে বয়সেরও সমস্যা আছে। সমসাময়িক হলেও কেউ বয়োজ্যেষ্ঠ, কেউ বা বয়ঃকনিষ্ঠ।
০৫৫. বার্হদ্রথ জরাসন্ধ
৫৫.
বার্হদ্রথ জরাসন্ধ এখন কেবলই মগধে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। পূর্বভারতে কৌরব বংশধারার বীজ তখন কেবলই উপ্ত হয়েছে মাত্র। তখনও সমগ্র ভারত জরাসন্ধের পরাক্রমে পর্যদস্ত হয়নি। হস্তিনাপুরের যুবরাজ শান্তনুর সঙ্গে গঙ্গার চঞ্চল সাক্ষাৎকার কেবলই সমাপ্ত হয়েছে। মথুরা ভূখণ্ডে তখন আপুত্র উগ্রসেন আপন অধিকার কেবলই বিস্তারিত করছেন। আনুমানিক ঠিক সেই সময়ের এক গোধুলিবেলায় আধুনিক মিরাটের পশ্চিম দিকে যেখানে যমুনা নদী বয়ে যাচ্ছে, সেই যমুনা নদীর তীর ঘেঁষে একটি নৌকা দাঁড়িয়েছিল। যাতে নদীতে ভেসে না যায়, সেইজন্য একটি নির্মিত রঞ্জুর একদিকে একটি খুঁটি বেঁধে সেটি যমুনার তীরভূমিতে আটকানো রয়েছে। রঞ্জুর অন্য প্রান্ত নৌকার সঙ্গে বাঁধা।
নৌকাটি জলের ওপর ভাসছিল। নদীর কৃষ্ণবর্ণ জলতরঙ্গগুলি ছলাৎ ছলাৎ করে তীরের ওপরেও যেমন সামান্য আছড়ে পড়ছিল, তেমনই নৌকার তলদেশেও সেই তরঙ্গের অভিঘাত টের পাওয়া যাচ্ছিল। নৌকাটি একটু-আধটু দুলছে আর সেই ঈষদুচ্চলিত নৌকার হালের পিছনে একটি রমণীকে বসে থাকতে দেখা গেল। রমণী অতিশয় সুন্দরী। কিন্তু তার গায়ের রঙ ঘন কৃষ্ণবর্ণ। লোকেও তাঁকে কালী বলে ডাকে।
কালো যমুনার জলের ওপর নৌকার প্রান্তদেশে নিষগ্না কৃষ্ণবর্ণা এই রমণী চিত্রার্পিতের মতো দিগন্তের শোভা বর্ধন করছিলেন। তার কেশরাশি মাথার ওপর চূড়া করে বাঁধা। আতা ওষ্ঠাধারের মধ্যে মুক্তাঝরানো হাসি। রমণীর উত্তমাঙ্গের বস্ত্র পৃষ্ঠলম্বী গ্রন্থিতে দৃঢ়নিবদ্ধ। আর অধমাঙ্গের বস্ত্র কিছু খাটো। নৌকার ত্রিকোণ প্রান্তের ওপর বসে রমণী পা-দুটি নিবদ্ধ অবস্থায় নৌকার কাষ্ঠ-স্তরের ওপর ছড়িয়ে দেবার ফলে কদলীস্তম্ভ-সদৃশ তার পা-দুটি উরু পর্যন্ত প্রায়
আপনি সাধারণ মানুষ হোন অথবা জিতেন্দ্রিয় সিদ্ধ মহাপুরুষ, নীলোর্মিচঞ্চল যমুনার জলে একটি নৌকার ওপর এমন একটি স্বভাবসুন্দর প্রত্যঙ্গমোহিনী রমণীমূর্তি দেখতে পেলে যোগী-ধ্যানী-কারও ধৈর্য স্থির থাকবে না-অতীবরূপসম্পন্নাং সিদ্ধানামপি কাঙ্ক্ষিতা। নদীর তীরভূমিতে এইমাত্র যে এক মহর্ষি এসে পৌঁছলেন, তিনি নদীর পরপারে যাবার জন্যই এসেছিলেন। মহর্ষি তীর্থ-পরিক্রমায় বেরিয়েছেন। হয়তো যমুনা পার হয়ে মথুরা-শূরসেন অঞ্চলের কোনও তীর্থে যাবেন তিনি, হয়তো বা মৎস্যদেশের কোনও তীর্থে যাবার ইচ্ছে আছে তাঁর।
এই অঞ্চলে যমুনা কিঞ্চিৎ শীর্ণতোয়া। ফলে নদী পারাপারের জন্য এইখানেই সকলে আসে। মহর্ষিও তাই এসেছেন। অন্য সময়েও তিনি এখানে যমুনা পার হয়েছেন এবং একটি পুরুষকেই তিনি নদী পার করে দিতে দেখেছেন। কিন্তু আজ এই গোধূলিবেলায় সূর্যের শেষ অস্তরাগ যখন নীল যমুনার জলে মাখামাখি করে এই নিকষা-কালো রমণী দেহের ঊরুদেশের ওপর বিচ্ছুরিত হল, তখন এই মহামুনির মনেও জেগে উঠল আকস্মিক আসঙ্গ-লিঙ্গা, লালসা–
দৃষষ্ট্রৈ চ তাং ধীমাংশ্চকমে চারুহাসিনীম্।
দিব্যাং তাং বাসবীং কন্যাং রাস্তারুং মুনিপুঙ্গবঃ।
তবে মনে মনে লালসা-তাড়িত হলেও সঙ্গে সঙ্গে মুনি তা প্রকাশ করলেন না। ক্রোধ, লোভ, লালসা স্তম্ভন করার অভ্যাস তার আছে। অতএব তিনি সামান্য সংযত হয়ে মৃদুহাসিনী সুন্দরীকে বললেন–হ্যাগো মেয়ে! এখানে যে চিরকাল নৌকা পারাপার করে, আমাদের সেই পরিচিত নাইয়াটি কোথায় কর্ণধারো যেন নীয়তে ক্ৰহি ভামিনি? রমণী বলল–আমার পিতার কোনও পুত্র সন্তান নেই, মহর্ষি। তাঁর যাতে বেশি কষ্ট না হয়, সেইজন্যই এই নৌকা। নিয়ে আমিই খেয়া পারাপার করি। লোক বেশি হলেও আমাকে বাইতে হয় এই নৌকা-নৌময়া বাহ্যতে দ্বিজ। মহর্ষি বললেন–সে তো খুব ভাল কথা, তাহলে আর দেরি কিসের? আমাকে নিয়ে চলো ওপারে। হয়তো আমিই তোমার শেষ আরোহী–অহং শেষো ভবিষ্যামি নীয়তামচিরেণ বৈ। নীল যমুনার জলবাহিনী নৌকার ওপরে মধুহাসিনী নাইয়া নৌকা বেয়ে চলল। আরোহী একা মহর্ষি। সে দিনের শেষ আরোহী।
এই মুনির পরিচয় আর না দিলে নয়। সূর্যবংশের বিখ্যাত পুরোহিত বশিষ্ঠের নাম আপনারা শুনেছেন। এই মুনি তার নাতি। বিশ্বামিত্র মুনির সঙ্গে বশিষ্ঠের যে দীর্ঘদিনের বিবাদ চলেছিল, তাতে বশিষ্ঠের জ্যেষ্ঠ পুত্র শক্তি মারা গিয়েছিলেন। মারা গিয়েছিলেন মানে, তাকে মেরে ফেলা হয়েছিল। পুরাণ-ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ী সূর্যবংশের রাজা কল্মষপাদের পুরোহিত-পদবী লাভের জন্য বিশ্বামিত্র এবং বশিষ্ঠ দুজনেরই কিছু প্রতিযোগিতা ছিল। এই অবস্থায় বশিষ্ঠপুত্র শক্তির সঙ্গে কল্মষপাদের বিবাদ বাধে একটি পথের অধিকার নিয়ে। রাজা শক্ট্রিকে অপমান করেন। শক্ট্রিও ক্রুদ্ধ হয়ে রাজাকে শাপ দেন।
