পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী দানব দ্রুমিল একচারিণী উগ্রসেন-পত্নীকে পর্বতের শোভা-বিবর্তের মধ্যগত অবস্থায় নিরীক্ষণ করে রূপমুগ্ধ হলেন এবং তিনি নাকি ধ্যানযোগে জানতে পারলেন যে, রমণী উগ্রসেনের পত্নী। সৌভপতি তখন উগ্রসেনের রূপ ধরে সামা সেই রমণীর সঙ্গে সুরত-ক্রীড়ায় মত্ত হলেন। উগ্রসেনের পত্নী প্রথমে কিছুই নাকি বোঝেননি, তারপর দানব দেহের অতিরিক্ত ভারে তিনি সচেতন হন এবং সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, ধৃষ্ট নায়ক উগ্রসেন নন।
আমাদের ধারণা–এ সব কথা উগ্রসেনের পত্নীর সতীত্ব রক্ষার জন্যই ব্যবহৃত। নইলে সৌভপতি পর্বত-বন-বিহারিণী একাকিনী রমণীকে ধর্ষণ করেছেন সুযোগ বুঝে এবং উগ্রসেনের পত্নী তা মেনে নিয়েছেন নিরুপায় এবং বাধ্য হয়ে। ঘটনা যা ঘটার ঘটে গেল। ধর্ষিতা উগ্রসেনপত্নী স্বামী ছাড়া অন্য মানুষের দ্বারা ধর্ষিত হলেন এবং ধর্ষণ একান্তভাবেই দানবোচিত বলেই তিনি দানবরাজ দ্রুমিল। যাই হোক, উগ্রসেনের পত্নী সক্রোধে বলে উঠলেন–তুই কে? এমন করে আমার স্বামীর রূপ ধারণ করে আমার সতীত্ব নষ্ট করলি? আমার আত্মীয়-স্বজন এখন আমাকে কীই বা না বলবে এবং সেইসব নিন্দাবাদ শুনে কীভাবেই বা আমি বেঁচে থাকব–কিং মা’ বক্ষ্যন্তি রুষি বান্ধবাঃ কুলপাংসনীম?
সৌভপতি অনেকক্ষণ গালাগালি শুনলেন, তারপর এক সময় ধৈর্য হারিয়ে বলে উঠলেন– দেখ রমণী। অনেকক্ষণ তুমি বিজ্ঞের মতো কথা বলছ-মুড়ে পণ্ডিতমানিনি। আমি সৌভপতি দ্রুমিল, এমন কিছু হেঁজি-পেজি লোক নই আমি যে এত বকতে হবে। দেবতা-দানবদের সঙ্গে একটু ব্যভিচার করলে তোমার মতো মানুষের এমন কিছু দোষ হয়ে যায়না। এই রকম ব্যভিচারের ফলে কত কত মানুষী রমণীর গর্ভে কত শত নামকরা দেবতার মতো ছেলে হয়েছে শুনেছি। সেখানে তুমি এমন করে চুল-ফুল-কাঁপিয়ে ঘৃতশুদ্ধ সতীত্বের বড়াই করছ যেন কীই না কী ঘটে গেছে– শুদ্ধা কেশান্ বিধুম্বন্তী ভাষণে য যদিচ্ছসি? আমি বলি কি, ওগো বড়ো মানুষের মেয়ে! তুমি যে আমাকে বড় মুখ করে জিজ্ঞাসা করলে-স্য তুং- তুই কার ছেলে, এর থেকেই তোমার ছেলের নাম হবে কংস।
হরিবংশে অন্যত্র উগ্রসেনের নয় ছেলের লিস্টি দেবার সময় কংসের নাম করে আলাদাভাবে বলেছেন- কংসন্তু পূর্বজঃ। এখন এই পূর্বজ’ মানে সবার আগে জন্মানো জ্যেষ্ঠ পুত্রও যেমন হতে পারে তেমনই হতে পারে-কংস অন্য সময়ে অন্যভাবে আগে জন্মেছিলেন। দাম্পত্য সরসতার ফল তিনি নন, তিনি উগ্রসেনের ক্ষেত্রজ পুত্রমাত্র। কংসের নিজের মুখ দিয়েই এ কথা পরে বেরিয়েছে ক্ষেত্রজোহং সুতস্তস্য উগ্রসেনস্য হস্তিপ।
সেকালের দিনে পত্নীগর্ভজাত এইরকম ক্ষেত্ৰজ পুত্রকে ত্যাগ করার রীতি ছিল না। বরং সে পুত্রকে সাদরে মানুষ করার মধ্যেই বংশের সম্মান ছিল। কিন্তু কংস বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে সেইসব দুর্লক্ষণ প্রকাশ পেতে আরম্ভ করল, যা একজন বড় বংশের ছেলের মানায় না। অত্যাচার এবং রাজ্যকামিতা তাকে পেয়ে বসল। আমাদের ধারণা, তার জন্মদাতা। সৌভপতির সঙ্গে কংসের যোগাযোগ নাই থাক, কিন্তু মগধরাজ জরাসন্ধের সঙ্গে তার দৃঢ় যোগাযোগ ছিল। হয়তো কংসের আনুক্রমিক দুর্ব্যবহারে তার মাতা-পিতাও তার প্রতি বিদ্বিষ্ট হয়ে পড়েন। তারা সাময়িকভাবে তাদের জ্যেষ্ঠপুত্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেন। কংস নিজেই এক সময় এ কথা বলেছেন–আমি নিজের ক্ষমতায় বড় হয়েছি, বাপ-মা আমাকে কোনও সুযোগ দেননি, তাঁরা আমায় ত্যাগ করেছেন- মার্তৃভ্যাং সত্যক্তঃ স্থাপিতঃ স্বেন তেজসা।
উগ্রসেনের সঙ্গে তার ক্ষেত্রজ পুত্রের তিক্ত সম্পর্কের সম্পূর্ণ সুযোগ নেন মগধরাজ জরাসন্ধ। কংসের সঙ্গে তিনি আত্মসম্পর্ক গড়ে তোলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। জরাসন্ধের দুটি মেয়ে ছিল। তাদের নাম অস্তি আর প্রাপ্তি। মথুরা-শূরসেন অঞ্চলে উঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরবার জন্য তিনি এই মেয়ে দুটির বিয়ে দেন কংসের সঙ্গে। কংস জরাসন্ধের এই ব্যবহারে ধন্য হয়ে যান। বলা বাহুল্য, কংসের এই বিবাহ হয়েছিল পিতা-মাতার বিনা অনুমতিতে। জামাই কংসকে জরাসন্ধ এরপর রাজনৈতিক মদত দিতে থাকেন, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে মধুরা-শূরসেনের রাজনৈতিক পরিবর্তনে।
কংস জরাসন্ধের সাহায্যে নিজ পিতা উগ্রসেনকে সিংহাসন থেকে হঠিয়ে দিয়ে নিজে মথুরার সিংহাসন দখল করেন। এর মধ্যে যে জরাসন্ধের সাহায্য বহুল পরিমাণে ছিল, তার প্রমাণ আছে মহাভারতের সভাপর্বে, যেখানে জরাসন্ধবধের পরিকল্পনা করার সময় বাসুদেব কৃষ্ণ নিজ মুখে যুধিষ্ঠিরকে জানিয়েছেন–বাহদ্রথ কুলে জাত জরাসন্ধের দুই মেয়ে অস্তি এবং প্রাপ্তিকে বিয়ে করে শ্বশুরের বলে বলীয়ান হয়ে কংস আমাদের যাদবকুলের আত্মীয়-জ্ঞাতিদের দলিত পিষ্ট করে ছেড়েছিল- বলেন তেন স্বজ্ঞাতী অভিভূয় বৃথামতিঃ।
পিতা উগ্রসেনকে সিংহাসনচ্যুত করেই কংস নিশ্চিন্ত থাকেননি। তিনি তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করেছিলেন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে। আমরা আগেই বলেছি– যাদবদের রাজ্য ছিল প্রধানত সংঘনির্ভর অলিগার্কি-গোছের। অন্ধক, কুকুর, বৃষ্টি, শৈনেয়- এইভাবে অন্তত আঠারটা সংঘের কথা আমরা কৃষ্ণের মুখে পরবর্তীকালে শুনব। উগ্রসেন যদি কারাগারের বাইরে থাকেন, তবে যদি তিনি যদু-বৃষ্ণি সংঘের সকলকে একত্রিত করে কংসের বিরুদ্ধে প্রত্যাক্রমণ রচনা করেন, তবে যে স্বনিযুক্ত মথুরাধিপতি কংসের সমূহ বিপদ হবে, সে কথা কংস খুব ভাল করেই জানতেন।
