বস্তুত জরাসন্ধ মগধদেশে রাজত্ব করছিলেন বটে, কিন্তু তার প্রতিপত্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, পূর্ব ভারতের মগধরাজ্যকে তিনি সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিলেন। লক্ষ্য করে দেখুন ভারতবর্ষের মানচিত্রে মথুরা-শূরসেন, হস্তিনাপুর, এবং পাঞ্চাল ছাড়া দক্ষিণে, উত্তরে এবং পূর্বে সর্বত্রই তখন জরাসন্ধের লোকজনেরাই রাজত্ব করছেন। দক্ষিণে এবং উত্তর ভারতের মৎস্য দেশের আগে যেহেতু যাদবদেরই একচ্ছত্র অধিকার ছিল অতএব যাদবদের প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়ালেন জরাসন্ধ। যাদবরা জরাসন্ধের অগ্রগতি রোধও করতে পারেননি, তাঁর সঙ্গে সন্ধিও করতে পারেননি। অন্যদিকে জরাসন্ধ মথুরা-শূরসেনের অর্থাৎ যাদবদের মূল ঘাঁটিতে ঢুকতে চাইছিলেন, কিন্তু ওই একটি জায়গায় যাদবদের অধিকার অত্যন্ত দৃঢ়পোথিত থাকায় জরাসন্ধ সোজাসুজি সশস্ত্র আক্রমণের মধ্যে যাননি। তিনি উপায় খুঁজছিলেন, যে উপায়ে সুদূর মগধরাজ্য থেকে কোনও আক্রমণ না চালিয়েও মথুরা-শূরসেনে নিজের শাসন কায়েম রাখা যায়।
মহারাজ উগ্রসেনের পুত্রসংখ্যা কম নয়। সব মিলে তাঁর নয়টি পুত্র। এদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ হলেন কংসনবোগ্রসেনস্য সুতাস্তেষাং কংসস্তু পূর্বজঃ। অন্য পুত্রদের নাম নগ্রোধ, সুনামা, কঙ্ক, সভূমিপ, শঙ্কু, রাষ্ট্রপাল, সুনু, অনাবৃষ্টি এবং পুষ্টিমান। কংস যদিও উগ্রসেনের একান্ত আত্মজ বলে পরিচিত, তবুও এই ছেলেটি তার আপন ঔরসজাত কিনা, সে সম্বন্ধে সন্দেহ আছে। পৌরাণিক্রো কংসকে কৃষ্ণের শত্রুপক্ষে স্থাপন করে, কে রাক্ষস, দানব- যা ইচ্ছে তাই বলেছেন। কিন্তু কংস রাক্ষসও নন, দানবও নন। তবে তার জন্মের মধ্যে কিছু রহস্যও আছে, কলঙ্কও আছে। পুরাণকারেরা কৃষ্ণ-সমর্থিত উগ্রসেনের মাহাত্ম্য স্থাপনের জন্য সেইসব পারিবারিক কলঙ্কের কথা প্রায় উল্লেখই করেননি। একমাত্র হরিবংশের একটি কাহিনীতে দেখা যাচ্ছে সহজ দাম্পত্যসুখে কংসের জন্ম হয়নি, তাঁর জন্ম হয়েছে উগ্রসেনের স্ত্রীর গর্ভেই, কিন্তু অন্যকৃত ধর্ষণে।
শোনা যায়, মহারাজ উগ্রসেনের স্ত্রী একবার রাজবাড়ির বউ-ঝিদের সঙ্গে পর্বতের শোভা দেখার জন্য কৌহলী হয়ে সুমুন পর্বতের উপত্যকায় বেড়াতে গিয়েছিলেন-প্রেক্ষিতুং সহিতা স্ত্রীভি গত বৈ সা কুতুহলাৎ। সুযামুন পর্বত যমুনা নদীর তীরবর্তী কোনও ক্ষুদ্র পর্বত ছাড়া আর কিছুই নয়, কেন না এই নামে কোনও পাহাড়ের নাম আমরা শুনিনি। যাই হোক, মথুরাপুরীর অন্তর্গহের অবরোধ থেকে মুক্তি পেয়ে উগ্রসেনের গৃহিণী পরমানন্দে চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। একবার পাহাড়ে উঠছিলেন, একবার নদীর তীর বেয়ে উচ্ছলভাবে ছুটে যাচ্ছিলেন, কখনও বা পর্বতকন্দরে বসে বসে প্রাকৃতিক শোভা দেখছিলেন–চচার নগশৃঙ্গেযু করে নদীযু চ। প্রাকৃতিক পরিবেশও ছিল বড় মধুর। পৌরাণিকদের চিরাচরিত বর্ণনা অনুযায়ী ময়ূর, ভ্রমর কিংবা নাগকেশর ফুলেরও কোনও অভাব ছিল না সেখানে। সমীরণ-মথিত কদম্ব-পুষ্পের সর্বত্র মধুকরের আভরণ। নীচে পাচারের ভূমি নবতৃণচ্ছন্ন। বসন্তের ঋতুস্নাতা সমগ্র পার্বত্য বনাঞ্চলের শোভা যেন ঋতুস্নাতা যৌবনস্থা বনিতার মতো।
চিরাচরিত এই বর্ণনার মধ্যে আমরা যেতাম না, যদি না আমরা উগ্রসেনের পত্নীকে এই বাসন্তিক শোভায় বিহ্বলা না দেখতাম। প্রকৃতির বিহ্বলতায় আতুরা রমণীর মনে এই মুহূর্তে আমরা পুরুষের সঙ্গকামনার উৎস দেখতে পাচ্ছি। তিনি মহারাজ উগ্রসেনের কথা ভাবছিলেন, তাকে কাছে পেতে চাইছিলেন–স্ত্রীধর্ম অভিরোচয়ৎ। ঠিক এই মুহূর্তে, মহারাজ উগ্রসেন নয়, আরও একটি মানুষকে সেই সুমুন পর্বতের উদ্ধত ভূমিতে রথ থেকে অবতরণ করতে দেখছি। হরিবংশ ঠাকুর আমাদের পৌরাণিক কল্পনাপুষ্ট করে এই পুরুষটিকে ‘দানব’ বলে ডেকেছেন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাকে সৌভপতি বলে চিহ্নিত করে এই পুরুষটির মনুষ্য-পরিচয়ও আচ্ছন্ন করেননি–অথ সৌভপতিঃ শ্রীমান্ দ্রুমিলো নাম দানবঃ।
সৌভপতি দ্রুমিল। সেই রথচারী পুরুষের নাম। হরিবংশের কম্বক ঠাকুর যই বলুন দ্রুমিল দানব বিমানে চড়ে মনোরথগতিতে এসে নামলেন সেই পর্বত্রে শিখরে, আমরা জানি সৌভদেশটার ভূগোল জানলেই আর কোনও দানবের গোল থাকবে না এই কাহিনীর মধ্যে। বস্তুত সৌভপুর বলে এষ্টা জায়গা আছে যেখানে শাম্বরা থাকতেন। মহাভারতে এক শাম্ব রাজার সঙ্গে ভীষ্মের এবং অন্য এক শাত্ব রাজার সঙ্গে কৃষ্ণের যুদ্ধ হয়েছিল। এই শা রাজারাই সৌভদেশে থাকতেন। শাম্ব শব্দটা একটি মানুষের নামমাত্র নয়, এটি একটি জাতির নাম, যাঁদের রাজধানী ছিল সৌভপুর।
পারজিটার লিখেছেন- শাল্ব-রাজারা থাকতেন রাজস্থানের আবু পাহাড়ের কাছাকাছি। অন্যেরা বলেন শাম্বরা যমুনা থেকে সিন্ধু নদীর তীর পর্যন্ত মোটামুটি ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রাচীন ব্রাহ্মণ-গ্রন্থগুলিতে অবশ্য যমুনা নদীর তীরেই শাহুদের নিবাস নির্ণীত হয়েছে। মহাভারতে শাশ্ব-মৎস্যদের দ্বন্দ্ব সমাস (শা-মৎস্যাস্তথা) দেখে মনে হয় শাদের সঙ্গে মৎস্য-দেশের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ছিল। সে যাই হোক, যমুনাপারের দেশই হোক আর রাজস্থানের কোনও জায়গার মানুষই হোন সৌভপতি মিল যমুনা নদী বা হরিবংশ কথিত সুমুন পর্বতের থেকে বহু দুরে। কোথাও থাকতেন না। অন্যদিকে মৎস্যদেশে আলোয়ার বা আবু-পাহাড়ের কাছাকাছি যেহেতু মগধরাজ জরাসন্ধের আত্মীয়-পরিজনেরাই রাজত্ব করতেন, তাই আমাদের দৃঢ় অনুমান এই সৌভপতি জরাসন্ধেরই অনুগত কেউ। রাজা বলে তাকে প্রথমে ডাকা হয়নি, কারণ তিনি রাজা ছিলেন না। আমদের এই অনুমান আরও সুদৃঢ় হবে যখন পরে আমরা জরাসন্ধের সঙ্গে শাব রাজার প্রগাঢ় বন্ধুত্বের প্রমাণ দেব। মহাভারতের শাল্বকেই সৌভপতি বলা হয়েছে কাজেই হরিবংশে যে সৌভপতি দ্রুমিলকে এক্ষুণি সুযামুন পর্বতে এসে পৌঁছতে দেখলাম, তিনি অবশ্যই শাল্বরাজের লোক ওরফে জরাসন্ধের লোক
