তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে একটি সম্পূর্ণ রাষ্ট্র ব্যবস্থা যদি কতিপয় সংঘমুখ্যের বিবেচনায় চলে, সেখানে বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের মধ্যে বিরোধ ঘটাটাও খুব স্বাভাবিক। হস্তিনাপুরের শান্তনুর সময়ে আমরা যাদবদের শাসন ব্যবস্থার যা পরিমণ্ডল লক্ষ্য করেছি, তাতে অন্ধক-কুকুর বংশের ধারার প্রধান পুরুষটিকেই সকলে মিলে রাজা হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। হস্তিনাপুরের মহারাজ শান্তনুর সম-সময়ে যিনি অন্ধক-বৃষ্ণিদের সর্বসম্মত সংঘমুখ্য বা রাজা হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন তাঁর নাম আহুক। আহুকের পিতার নাম অভিজিৎ এবং আহুক নিজে এতই বিখ্যাত ছিলেন যে তার বোনের নামও হয় তাঁরই নামে– আহুকী।
আমরা পূর্বে পৌরাণিকদের সঙ্কলিত গাথার মাহাত্ম কীর্তন করেছি। পুরাণের মধ্যে যেখানে গাথা বলে কারও কথা উলেখ করা হয়, বুঝতে হবে সেই অংশ পুরাণ-রচনার পূর্বে মানুষের শ্রুতি-পরম্পরায় সেই কথা এসেছে। আহুকের উৎসাহ এবং উদ্যম ছিল বেগবান অশ্বের মতো। তিনি যখন সপরিবারে কোথাও যেতেন, তখন অন্তত আশি জন মানুষ তার সিংহাসন বয়ে নিয়ে যেত। যে মানুষের পুত্রসন্তানের জনক হওয়ার ভাগ্য নেই, যে মানুষ অন্তত একশ জন ব্রাহ্মণকে দক্ষিণা দেননি, যে মানুষ শুদ্ধ যজ্ঞাদির অনুষ্ঠান করেননি তেমন মানুষ কোনও দিন আহুকের ধারেকাছে যেতে পারতেন না।
আহুকের গুণকীর্তন করে যে গাথা তৈরি হয়েছে, তার আশয় থেকে বোঝা যায়, সেকালের দিনের নিরিখে যাদের খুব সংস্কৃতিসম্পন্ন বলে মনে করা হত, আহুকের সাঙ্গোপাঙ্গ ছিলেন তারাই। আহুকের রাজোচিত আড়ম্বরও কম ছিল না। দশ হাজার হাতির সওয়ার আর দশ হাজার সপতাক রথে চড়ে তার সৈন্যবাহিনী তাকে অভিনন্দন জানাত। এটা মার্চ পাস্টে ‘স্যালুট’ নেবার মতো কোনও ব্যাপার। এর পরেই বলা হচ্ছে–ভোজবংশীয় সমস্ত রাজাই তাকে সবসময় অভ্যর্থনা জানাতেন এবং মহারাজ আঙ্ক বোধহয় সমস্ত যদু-বৃষ্ণি সংঘকে নিজের আয়ত্তে আনার জন্য মথুরা-শূরাসেনের পূর্ব এবং উত্তরদিকে কিছু কিছু যুদ্ধযাত্রাও করেছিলেন পূর্বস্যাং দিশি নাগাং ভোজস্য প্রতিমোভবৎ।
বিভিন্ন পুরাণ এবং হরিবংশে আহুকের সম্বন্ধে যে গাথাগুলি প্রচলিত আছে, সেগুলির মধ্যে বিস্তর পাঠভেদ আছে। এগুলির বাংলা অনুবাদেও কোনও সমতা নেই, কোথাও কোথাও তা উদ্ভটও বটে। তবে সমস্ত শ্লোকের মর্মার্থ বিবেচনা করে যা বোঝা যায়, তাতে মথুরা শূরসেনের পূর্ব এবং উত্তরদিকে যে সব ভোজ-যাদব ছিলেন তাদের তিনি আপন ব্যক্তিত্বে একত্র করতে পেরেছিলেন হয়তো। তবে আহুকের পরে যাদব-ভোজদের এই রাজনৈতিক বন্ধন সামান্য শিথিল হয়েছিল বলে মনে হয়।
আহুকের বিয়ে হয়েছিল কাশীর রাজার মেয়ের সঙ্গে এবং তার গর্ভে আহুকের দুটি পুত্র হয়। তাদের নাম হল দেবক এবং উগ্রসেন। মহাভারত এবং পুরাণগুলির বক্তব্য থেকে দেবককেই আহুকের জ্যেষ্ঠ পুত্র বলে মনে হয়। কিন্তু জ্যেষ্ঠপুত্র হওয়া সত্ত্বেও কেন তিনি রাজা হননি, সে কথা কোথাও বলা নেই। আহুকের পরে উগ্রসেনই রাজা হন এবং তিনি ভালই রাজত্ব চালাতে থাকেন। এমন কি উগ্রসেনের জন্য অন্ধক-কুকুরের বংশধারার সুনামও হয় যথেষ্ট। পতঞ্জলির মতো বিশালবুদ্ধি বৈয়াকরণ সামান্য একটা তদ্ধিতপ্রত্যয়ের উদাহরণ দিতে গিয়ে উগ্রসেনের সঙ্গে তার বংশেরও নামোল্লেখ করেছেন– অন্ধকে নাম উগ্রসেনঃ। স্বভাবতই বোঝা যায় যাদবদের মধ্যে তিনিই নেতা নির্বাচিত হয়েছিলেন। অন্ধকেরা তো বটেই ভোজ, বৃষ্ণি, কুকুর, শর–এইসব ছোট ছোট যাদব গোষ্ঠীর নেতারা সকলেই উগ্রসেনকে নেতা হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। রাজ্যও ভাল চলছিল।
হস্তিনাপুরের অধিপতি শান্তনুর সঙ্গে যাদবদের যেহেতু সরাসরি কোনও বিবাদ হয়নি, অতএব যাদবরা এবং কৌরবরা পাশাপাশি ভালই ছিলেন। কিন্তু কুরুপুত্র সুধর বংশধর জরাসন্ধ, যিনি মগধে রাজা হয়েছিলেন, তার সঙ্গে যাদবদের সম্পর্ক মোটেই ভাল রইল না তার কারণও আছে যথেষ্ট। সুধম্বার চতুর্থ পুরুষ উপরিচর বসু, যিনি হঠাৎ চড়াও হয়ে চেদিরাজ্য দখল করে নিয়েছিলেন, সেই চেদি কিন্তু পূর্বে যাদবদের অধিকারে ছিল।
আমরা ইতঃপূর্বে যাদব রাজা জ্যামঘর কথা বলেছি। সেই জ্যামঘ, যিনি যুদ্ধ জয় করে এক রমণীকে রথে চড়িয়ে নিয়ে এসেছিলেন এবং স্ত্রীর কাছে ভয়ে ভয়ে নিবেদন করেছিলেন এই রমণী তোমার পুত্রবধু হবে। এই জ্যামঘ কিন্তু প্রথম শুক্তিমতী নদীর তীরভূমি থেকে আরম্ভ করে নর্মদা নদীর তীরভূমি পর্যন্ত জয় করে নেন। চেদি, বিদর্ভ এই সমস্ত নগরের পত্তন করেন যাদবরাই এবং এইসব জায়গায় জ্যামঘের বংশধরেরাই রাজত্ব করছিল। পুরাণ অনুসারে বিদর্ভ জ্যামঘের পুত্র এবং বিদর্ভের অধস্তন ক্ৰথ-কৈশিকের অন্যতম কৈশিকের পুত্র হলেন চেদি, যাঁর নামে তার বংশধরেরা চৈদ্য নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন-চেদিঃ পুত্রঃ কৈশিকত্স্য তস্মাচ্চৈদ্যা নৃপাঃ স্মৃতাঃ।
যাদব চৈদ্যদের ওপর চড়াও হয়ে যিনি চেদি রাজ্য দখল করে নিলেন, তিনিই তো উপরিচর বসু চৈদ্য। শুধু চেদি কেন উপরিচর বসুর পাঁচ ছেলে যখন পাঁচ জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলেন তখন চেদি, কারুষ, মগধ (বুন্দেলখণ্ড, বাঘেলাখণ্ড, এবং গয়া-পাটনা)- এগুলি তো মগধরাজ জরাসন্ধের অধিকারে বা আয়ত্তে ছিলই, এমন কি মৎস্য দেশও (জয়পুর+ভরতপুর +আলোয়ার) যখন জরাসন্ধের শাসনে নাই হোক অনুশাসনে এসে গেছে। মহাভারতের মধ্যে যেসব জায়গায়—‘চেদি-মৎস্য-কারুষাশ্চ’ কিংবা চুদি-মৎস্যানাম বলে দ্বন্দ-সমাস করা হয়েছে, সেইসব জায়গাতেই বাহদ্রথ পরিবার জরাসন্ধের সাম্রাজ্যবাদ অনুস্মৃত হয়েছে,
