৫ চৈত্যক গৃধ্রকূট ছত্রগিরি + রত্নগিরি
আমরা যে এত গুরুত্ব দিয়ে মগধের রাজধানী গিরিব্রজ অথবা বাহদ্রথপুরের ভৌগোলিক অবস্থান নির্ণয় করার চেষ্টা করছি, তার কারণ একটাই। বসুপুত্র মহারাজ বৃহদ্রথ তার নিজের নামে এমনই একটি বংশ-পরম্পরা তৈরি করেছিলেন ব্রাহ্মণ্য আচারভূমির বাইরে, যা হস্তিনাপুরের মহারাজ শান্তনুর সম-সময়েই এক প্রবল পরাক্রান্ত রূপ ধারণ করেছিল। একথা ঠিক যে বৃহদ্রথের পুত্র-পৌত্র-প্রপৌত্ররা সকলেই খুব নামী রাজা ছিলেন না এবং তাদের সবার নামও সঠিকভাবে পাওয়া যায় না। কিন্তু বৃহদ্রথের পাঁচ-সাত পুরুষ পরেই এই বংশে যিনি জন্মগ্রহণ করলেন, তার জন্য এই অনার্যপ্ৰায় জনপদ ভারতবর্ষের সবচেয়ে নামী জনস্থানে পরিণত হল। মগধের রাজ-সিংহাসনে যেদিন মহারাজ জরাসন্ধের রাজ্যাভিষেক হল, সেদিন। কেউ ভাবেনি যে, ভারতবর্ষের সমস্ত রাজা মগধের অনুশাসনে আবর্তিত হবে। জরাসন্ধ এমনই এক রাজা যিনি সমগ্র পূর্ব-ভারতকে এক বিশাল মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেন। প্রখর রাজনৈতিক বুদ্ধি এবং পরাক্রমশালিতার মিশ্রণে জরাসন্ধের ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়েছিল। ভারতবর্ষের আর্যস্থানে তখন এমন কোনও আর্য রাজা ছিলেন না, যিনি মাগধ জরাসন্ধের সঙ্গে পাঞ্জা কষতে পারেন। তার একটা সুবিধে ছিল—চেদি, করূষ অথবা কৌশাম্বীতে তার নিজের জ্ঞাতি-গুষ্ঠিরাই অধিষ্ঠিত ছিলেন। কিন্তু এঁরা যেমন জরাসন্ধের অনুসরণ করতেন আত্মীয়তার কারণে, তেমন অনাত্মীয় যারা, তারা জরাসন্ধের অনুগমন করতেন ভয়ে, শাস্তির ভয়ে।
আশ্চর্য ব্যাপার হল, জরাসন্ধ হস্তিনাপুরবাসী কৌরবদের সঙ্গে কখনও নিজে থেকে শত্রুতা আচরণ করেননি। হয়তো এর পিছনে তার বংশমূল কুরুরাজার পূর্ব-স্মৃতি কাজ করেছে। কিন্তু জরাসন্ধের মনের গভীরে যদি বা এই ভাবনা-গৌরব কিছু থেকেও থাকে, কৌরব শান্তনু বা মহামতি ভীষ্ম সে কথা মনে রেখেছিলেন বলে মনে হয় না। হস্তিনাপুরের মহারাজ শান্তনুর সঙ্গে যখন গঙ্গার দেখা হল, তখনও জরাসন্ধের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস আমরা কিছু শুনতে পাইনি বটে, কিন্তু তিনি তখন জন্মেছিলেন নিশ্চয়ই। অন্যদিকে এই অনুমান অবশ্যই সার্থক যে, মহামতি ভীষ্ম যখন যৌবনে পদার্পণ করেছেন, তখন জরাসন্ধ শুধু পূর্বভারত নয়, প্রায় সমস্ত ভারতবর্ষের সবচেয়ে বিক্রান্ত রাজা। এই অনুমানের প্রমাণ একটাই। মথুরা শূরসেনের রাজা কংস, যিনি যাদব-কুলপতি উগ্রসেনের পুত্র ছিলেন, তিনি ছিলেন মগধরাজ জরাসন্ধের জামাই। পরিষ্কার বোঝা যায়, মথুরাধিপতি উগ্রসেন, মগধরাজ জরাসন্ধ এবং হস্তিনাপুরের বৈধ রাজপুত্র শান্তনব ভীষ্ম ছিলেন পরস্পর পরস্পরের ছোট-বড় সমসাময়িক, যাকে ইংরেজি ভাষায় বলি younger বা older contemporaries.
.
৫৪.
হস্তিনাপুরে মহারাজ শান্তনু যখন রাজত্ব করছেন, পাঞ্চালে যখন দ্রুপদ-পিতা পৃষতের অধিকার চলছে অথবা মগধে জরাসন্ধ যখন যৌবনে পদার্পণ করেননি, তখনও কিন্তু রাজনৈতিকভাবে যাদবদের অবস্থা খুব ভাল। আমরা আগেই জানিয়েছি– যাদবদের মধ্যে কার্তবীর্য অর্জুন অথবা তারও আগে শশবিন্দুর মতো বিরাট পুরুষ জন্মেছিলেন। মহারাজ সত্ব বা সাত্বত জন্মানোর পর যাদবদের বিশাল বংশ খানিকটা খণ্ডিত হল বোধহয়। সাত্বতের প্রত্যেকটি পুত্ৰই এত বিখ্যাত ছিলেন যে, সেই সময় থেকে বংশ-পরম্পরায় একজনকে রাজা বানিয়ে দেওয়াটা খুব কঠিন ছিল। সাত্বত্ত-পুত্রদের একেক জন পুরুষ থেকে একেকটি প্রখ্যাত বংশধারার সূত্রপাত হয়। ভোজ, অন্ধক, ভজমান, বৃষ্ণি–এঁদের মধ্যে কাকে ছেড়ে কাকে ধরবেন? এঁরা প্রত্যেকেই খ্যাতিমান পুরুষ।
আবারও এঁদেরও পুত্র-পৌত্রদের মধ্যে এত বিখ্যাত মানুষ আছেন, যাতে যে কোনও একজনকে সিংহাসনে বসিয়ে দিয়ে আর সবাই তার মত মেনে চলবেন- এমন কল্পনা করাটা যেমন অসম্ভব, তেমনই অবাস্তব। যদুবংশের অধস্তনরা, বিশেষত সাত্বতবংশীয়রা যথেষ্ট বুদ্ধিমান ছিলেন, তারাওঁ ব্যাপারটা বুঝতেন। অতএব রাজ্য শাসনের জন্য সেইকালেই তারা এক অভিনব উপায় সৃষ্টি করেন। সাত্বতের পুত্রেরা বৃষ্টি, অন্ধক, ভোজেরা প্রত্যেকেই তাদের পুত্র-পরিবার সহ একেকটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে যান, যে গোষ্ঠীর নাম ছিল সংঘ। যেমন ভোজসংঘ, বৃষ্ণিসংঘ, অন্ধক-সংঘ।
মনে রাখা দরকার, এই ‘সংঘ’ শব্দটি আমাদের স্বকপোলকল্পিত কোনও শব্দমাত্র নয়। খোদ মহাভারতের শান্তিপর্বেই যাদবদের নানা গোষ্ঠীর সম্বন্ধে সংঘ শব্দটি প্রযুক্ত হয়েছে এবং ভগবান নামে চিহ্নিত সেই কৃষ্ণকে সংঘমুখ্য’ বলে ডাকা হয়েছে—সংঘমুখ্যো’সি কেশব। মহামতি কৌটিল্যও অর্থশাস্ত্র রচনার সময় যদু-বৃষ্ণি-সংঘের কথা উল্লেখ করেছেন। বস্তুত ভোজ-বৃষ্ণি-অন্ধকেরা সংঘ-নায়ক হিসেবে এতটাই প্রসিদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন যে, খ্রিস্টপূর্ব শতাব্দীগুলিতে বৈয়াকরণ পাণিনি থেকে আরম্ভ করে পতঞ্জলির সময় পর্যন্ত তাদের অধস্তন বিশাল ব্যক্তিত্বদের নামের পরে কী ধরনের তদ্ধিত প্রত্যয় ব্যবহার করা হবে তাই নিয়ে চিন্তা ভাবনা করতে হয়েছে- ঋষ্যদ্ধবৃষ্ণি-কুরুভ্যশ্চ।
পণ্ডিতেরা কৌটিল্য এবং পাণিনির শব্দচয়ন মাথায় রেখে অন্ধক-বৃষ্ণিদের গোষ্ঠীগুলিকে ‘রিপাবলিক’ বা ‘কর্পোরেশন’ নামে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। অন্যেরা বলেন, এগুলি ‘রিপাবলিক’ ঠিক নয়, বরং এগুলিকে ‘অলিগার্কি’ বলাটা বেশ যুক্তিসঙ্গত। আমরা এইসব মতের কোনওটাই অস্বীকার করছি না। কেন না, ‘রিপাবলিক’ বলুন, ‘কর্পোরেশন’ বলুন, অথবা ‘অলিগার্কি’ই বলুন-যদু-বৃষ্ণিদের শাসনতন্ত্র আধুনিকনামা এই সমস্ত তন্ত্রেরই মিশ্রণ, যে নামেই ডাকুন খুব একটা অসঙ্গত হবে না।
