কীকট সম্বন্ধে বেদের ঋমন্ত্র এবং যাস্কের বিরুদ্ধ মত থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় বৈদিক কালে এই দেশের আর্যায়ণ সম্পন্ন হয়নি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যখন পূর্বভারতের অনেকাংশেই আর্যদের অধিকার ছড়িয়ে পড়েছে, তখনও কীকটদেশের অস্পৃশ্যতা ঘোচেনি। বৃহদ্ধর্ম পুরাণে কীটদেশের অন্তর্গত কয়েকটি পূণ্যস্থানের মহিমা কীর্তিত হলেও বলা হয়েছে এখানকার রাজা কাককর্ণ অত্যন্ত ব্রাহ্মণ-দ্বেষী মানুষ এবং এ জায়গায় কেউ মারা গেলেও বলতে হবে সে পাপ-ভূমিতেই মারা গেল–কীকটেষু মতো’প্যেষ পাপভূমৌন সংশয়ঃ/ অথচ আশ্চর্য, একই নিঃশ্বাসে উচ্চারিত কীটদেশের ‘গয়া’ জায়গাটা কিন্তু পিতৃপুরুষের স্বর্গদায়ী এক পুণ্যদেশ। ঐতিহাসিকেরা বৃহদ্ধর্ম কথিত কাককর্ণ রাজাকে শৈশুনাগ-বংশীয় কাক-বর্ণের সঙ্গে অভিন্ন বলে মনে করেন।
কিন্তু শৈশুনাগ বংশের কাহিনী তো অনেক পরে। আমরা যে সময়ের কথা বলছি, সে সময়ে কীট-দেশের আর্যয়ণই সম্পূর্ণ হয়নি। কীট-দেশই যে মগধ, সে কথা অভিধানচিন্তামণির মতো প্রাচীন গ্রন্থেই বলা আছে-কীটা মগধাদ্বয়াঃ যদিও মগধ নামটা আমরা প্রথম পাই অথর্ববেদে। আর্যায়ণের প্রথম কল্পে যে সমস্ত ব্রাহ্মণ মগধরাজ্যে বসতি। স্থাপন করেন, তাদেরও ভাগ্যে সুখ ছিল না। ব্রাত্য, ব্রহ্মবন্ধু এই সমস্ত অনাচারীর সঙ্গে তারা একই সগন্ধতায় উচ্চারিত। তবে মগধ সম্বন্ধে এই সমস্ত নিন্দাবাদের কারণ একটাই, মগধে আর্যদের অধিকার সহজে প্রোথিত হয়নি।
এ হেন মগধ-দেশে সাহস করে যিনি প্রথম কুরুবংশের অঙ্কুর প্রোথিত করে নিজের ছেলেকে সিংহাসনে বসালেন, তিনি হলেন উপরিচর বসু। কুরুবংশের পূর্বগন্ধ নিয়ে তার অবশ্য মাথাব্যথা ছিল না। তিনি আপন শক্তিতে রাজ্যের অধিকার পেয়েছিলেন, অতএব তার পুত্র বৃহদ্রথও হস্তিনাপুরে প্রতিষ্ঠিত কুরুবংশের মূলধারার সঙ্গে একাত্ম হতে চেষ্টা করেননি কখনও। বৃহদ্রথের স্বাতন্ত্র্যবোধ ছিল অন্যরকম। মগধদেশে তার নিজের নামে একটি স্বতন্ত্র নগরও প্রতিষ্ঠিত হয়, যার নাম বৃহদ্রথপুর-বাৰ্হস্রথপুরং প্রতি। অবশ্য বৃহদ্রথপুর নামটি শুধু রাজা বৃহদ্রথের জায়গা বা সামান্যভাবে মগধ রাজ্য বলে মনে করলেও কোনও অসুবিধা নেই। কারণ, মগধের রাজা বৃহদ্রথের রাজধানী ছিল গিরিব্রজ।
হস্তিনাপুরের রাজা বলুন, মথুরা-শূরসেনের অধিপতি বলুন অথবা সরযুপারে অযোধ্যার রাজার কথাই বলুন, মগধের রাজধানী গিরিব্রজের মতো সুরক্ষিত রাজধানী কোনও রাজারই ছিল না। দক্ষিণ বিহারের পাটনা আর গয়া জেলা নিয়েই ছিল তখনকার গিরিব্রজের ভৌগোলিক স্থিতি। গিরিব্রজ আপনা আপনিই এক দুর্গের মতো, যার উত্তরে এবং পশ্চিমে দুই মহানদী–গঙ্গা এবং শোন। পশ্চিমে বিন্ধ্য পর্বতমালার ছিন্নাংশ আর পূর্বে আছে চম্পা নদী। এ হল মগধের সাধারণ অবস্থিতি। এর মধ্যে আবার স্বয়ং বৃহদ্রথ যে জায়গায় নিজের আবাস-গৃহটি বানিয়েছিলেন, সে জায়গাটা ছিল একটি আদর্শ গিরিদুর্গের মতো।
মনু মহারাজ রাজাদের বাসের জন্য যে সমস্ত দুর্গের কথা বলেছেন, তার মধ্যে আদর্শ হল গিরিদুর্গ। তিনি বলেছেন, রাজা যদি নিজের রাজধানীর চারপাশে পাহাড়ের সুবিধা পান, তাহলে তার মতো সুবিধে আর কিছুতে হয় না-এষাং হি বাহুগুণেন গিরিদুর্গং বিশিষ্যতে। মহাভারতের কবি মহারাজ বৃহদ্রথের রাজধানীকে বাইদ্রথপুর বলবার আগে তার নামকরণ করেছেন গিরিব্রজ অথবা রাজগৃহ। পাঁচটি পর্বতের দ্বারা রাজগৃহ সুরক্ষিত। আমাদের মনে হয় রাজগৃহকে হয়তো বা রাজগিরিও বলত কেউ কেউ, যার ফলে আজকের অপভ্রংশে রাজগির শহরটিকে পেয়েছি আমরা। অবশ্য রাজগৃহ শব্দ থেকেও রাজগির শব্দের উৎপত্তি সম্ভব।
যাইহোক মহাভারতে দেখতে পাচ্ছি–বার্হদ্রথপুরের চারদিকে যে পাহাড়গুলি আছে তাদের প্রথমটির নাম হল বইহার। মহাভারতের কবি এই শব্দটার বানান করেছেন ঐকার দিয়ে–বৈহার। সংস্কৃতের ব্যুৎপত্তি নির্ণয় করে শব্দটাকে আগে আমি বিহার’ শব্দ থেকে উৎপন্ন বলে ভাবতাম। কিন্তু বিভূতিভূষণের মহাকাব্যে লবটুলিয়া-বইহারের কথা পড়ার পর আমরা ‘বৈহার’ শব্দটিকে ভেঙে বইহারই বলতে ভালবাসি। এখানে এটাও অবশ্য জানিয়ে দিতে হবে যে, মহাভারতের কবিও ‘বৈহার’ বিহার শব্দজাত কোনও নিষ্পন্ন শব্দ হিসেবে ব্যবহার করেননি। বৈহার তাঁর মতে আলাদা একটি শব্দ, যেটা বিপুল-বৈহার বলে একটি পাহাড়ের নামও যেমন হতে পারে, তেমনি এই শব্দের মানে হতে পারে একটি বড় পাহাড়, কবি যাকে বলেছেনবৈহারো বিপুলঃ শৈলঃ।
মহাভারতের বর্ণনায়–বৈহার, বরাহ, বৃষভ, ঋষিগিরি এবং চৈত্যক–এই পাঁচটি পাহাড়ের নামে পাঠভেদ আছে। তবে প্রাচীন বৌদ্রগ্রন্থ মঝিমনিকায় এবং আধুনিক রাজগিরে প্রচলিত আধুনিক নামগুলির মঙ্গে মহাভারতোক্ত নামগুলির তুলনামূলক বিচার করে পণ্ডিতেরা সিদ্ধান্ত করেছেন যে বাহদ্রথপুরের চারপাশের পাহাড়গুলি এইভাবে সাজানো যায়–
মহাভারত মঝঝিমনিকায় আধুনিক
১ বিপুল বৈহার বেপুল বিপুলগিরি
২ বরাহ বৈভার বৈভার
৩ বৃষভ পাণ্ডব সোনাগিরি
৪ ঋষিগিরি ইসসিগিল্লি উদয়গিরি
