পুলোমা অগ্নিকে এবার তার শেষ সিদ্ধান্ত জানালেন। বললেন–সুন্দরী পুলোমা আমারই স্ত্রী হবেন বলে সম্পূর্ণ নির্ধারিত ছিল। সেখানে মাঝখান থেকে ভূগু যে তাকে বিয়ে করে ফেলেছেন–এতে আমি নিশ্চয়ই খুব পুলকিত বোধ করছি না–অসম্মতমিদং মে’দ্য। তুমি জেনে রেখ, আগুন! আজ আর আমি ছাড়ব না, আজকে তারই আশ্রম থেকে তার স্ত্রীকে হরণ করব আমি।
ঠিক কথাটি বলবার জন্য অর্থাৎ সুন্দরী পুলোমা ন্যায়ত তারই স্ত্রী, নাকি ভৃগুর–এই শঙ্কা নিবারণের জন্য রাক্ষস পুলোমা অগ্নিকে যেভাবে বলেছিলেন তাতে মহাভারত যদি বেদ হত, তাহলে এতক্ষণ আমরা একটি অগ্নিসূক্ত শুনতে পেতাম। বৈদিকরা অগ্নিকে দেবতাদের মুখ বলেই কল্পনা করেছেন, কারণ মানুষের দেওয়া আহুতি-দ্রব্য দেবতারা অগ্নির মুখ দিয়েই গ্রহণ করেন–অগ্নির্বৈ দেবানাং মুখম্–এবং রাক্ষস পুলোমাও তাই বলেছে। অগ্নি মানুষের সমস্ত পাপ-পুণ্যের সাক্ষী, সর্বজ্ঞ এবং তিনি সমস্ত মানুষের প্রাণজ্যোতি–বৈদিকরা এই ভাবেই অগ্নির কল্পনা করেছেন যার শেষ পরিণতি–আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে এ জীবন পুণ্য কর। রাক্ষস পুলোমার মুখে বৈদিক ঋষির অগ্নি-স্তুতি শুনে মহাভারতের মধ্যে যেমন বেদের প্রতিষ্ঠা দেখতে পেলাম, তেমনই রাক্ষসদের সম্বন্ধে আমাদের চিরাচরিত ধারণাটাও বা কিছু ঠিক হল। অর্থাৎ বৈদিক রীতি-নীতি রাক্ষসদের কিছু অজানা ছিল না।
পুলোমা রাক্ষস যেভাবে অগ্নিকে সাক্ষী ঠাউরেছেন, তাতে এখন অগ্নি-দেবতাকে ভাবতে এবং দেখতে লাগছে ঠিক মানুষের মতোই। মহামতি যাস্ক, যিনি প্রথম বৈদিক অভিধানকার বলে চিহ্নিত, তিনি অবশ্য অনেকের মত সংকলন করে বলেছেন–দেবতাদের বুঝি বা মানুষের মতোই দেখতে–পুরুষবিধাঃ স্য। মানুষের হাত-পা, চোখ-মুখ, গায়ের রং–সবই বৈদিক দেবতাদের মধ্যেও দেখেছেন। এখানে তো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই নয় শুধু, আমরা অগ্নিকে রাক্ষস পুলোমার দুঃখে দুঃখিতও হতে দেখছি–তস্যৈত বচনং ত্বা সপ্তাৰ্চিদুঃখিতো শম্। রাক্ষস পুলোমা যে বঞ্চিত হয়েছেন, সে কথা অগ্নি মনে মনে মানেন ঠিকই, কিন্তু এই যে ভৃগুমুনি–আগুন থেকেই যাঁর জন্ম এবং যিনি স্বয়ং ভগবানের বুকেও পদচিহ্ন এঁকে দিয়েছেন–সত্যি কথা বললে তাঁর ক্রোধ থেকে নিস্তার পাবেন কী করে?
এদিকে মিথ্যা কথা বলার ভয়, অন্যদিকে ভূণ্ডর অভিশাপের ভয়–অতএব দুই দিক রক্ষা করেই অগ্নি বললেন–দানব! তুমিই যে আগে এই সুন্দরী পুলোমাকে স্ত্রী হিসেবে বরণ করেছিলে, সে কথা আমি জানি; কিন্তু বিধি অনুসারে মন্ত্রপাঠ করে তুমি তো এই মেয়েকে। বিয়ে করনি–কিং ত্বিয়ং বিধিনা পূর্বং মন্ত্রবন্ন বৃতা ত্বয়া। অন্যদিকে এই কন্যার পিতা পুলোমাকে বৈদিক বিধি অনুসারে মন্ত্রপাঠ করে ভৃগুর হাতে সম্প্রদান করেছেন। হ্যাঁ, জানি, পুলোমার পিতার এখানে স্বার্থ ছিল। তিনি ভেবেছিলেন–মেয়েকে ভৃগুর হাতে দিয়ে তিনি ভৃগুর কাছ থেকে বর-লাভ করবেন এবং সেই আশাতেই তোমার হাতে তিনি মেয়ে দেননি–দদাতি ন পিতা তুভ্যং বরলোভান্মহাযশাঃ।
জেনে রাখা ভাল, ভারতে বিবাহের বিধি চিরকাল, একরকম থাকেনি। পরবর্তী কালের স্মৃতিশাস্ত্রেও এই নিয়ে ঘোর বিবাদ আছে। কেউ বলেন–সম্প্রদান-মন্ত্রেই বিবাহ সম্পন্ন হয়, কেউ বলেন, পাণি গ্রহণ হলে তবেই বিবাহ সম্পন্ন হবে, আবার কেউ বা সপ্তপদী-গমনের পক্ষে রায় দিয়েছেন। এখানে সেই তর্ক তোলার প্রয়োজন নেই। এবং তর্ক বাদ দিয়েও এটা বোঝা যাচ্ছে–পুলোমা সেকালের দিনের এক অতীব প্রার্থনীয়া রমণী। একদিকে এক রাক্ষস তাঁকে মনে মনে বরণ করেছেন, আর এক দিকে এক ঋষি-চূড়ামণি এই রমণীকে লাভ করার জন্য কন্যার পিতাকে বর দিতে চেয়েছেন। পুলোমার পিতা কী বর পেয়েছিলেন মহাভারতের কবি তা স্পষ্ট করে বলেননি, কিন্তু রাক্ষস পুলোমা অগ্নির কথায় তার আপন বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া মাত্রই ভৃগুপত্নীকে তুলে নিয়ে গেলেন আশ্রম থেকে। অপহরণ, পরের স্ত্রীকে নিজের ভেবেই অপহরণ করলেন।
ভৃগুপত্নী পুলোমা গর্ভবতী ছিলেন। রাক্ষসের দ্রুততা এবং নিজের ভয়–এই দুয়ে মিলে পথের মধ্যেই তার গর্ভচ্যুত হল। গর্ভচ্যুত হয়ে জন্মাবার ফলেই তার পুত্রের নাম হল চ্যবন। রাক্ষস পুলোমা চ্যবনের অদ্ভুত তেজে ভস্মীভূত হলেন–এই অলৌকিক কথা আপনারা বিশ্বাস করুন বা না করুন–সেটা মহাভারত-কথার বড় কোনও অঙ্গ নয়। এমনকি ভৃগুপত্নী সপুত্রক বাড়ি ফিরে এলে ভৃগুমুনি সব শুনে অগ্নিকে ‘সর্বভুক’ হওয়ার অভিশাপ দিয়েছিলেন সেটাও খুব বড় কথা নয়। বড় কথা হল–উগ্রশ্রবা সৌতি এর পর চ্যবন মুনির নাতি রুরুর যে কাহিনী বলবেন–তার মধ্যেও সেই সাপে কাটার ঘটনা আছে। রুরু এবং প্রমদ্বরার প্রেমকাহিনী নিয়ে সুবোধ ঘোষ মশাই ভারত-প্রেমকথায় অমর চিত্রকল্প তৈরি করেছেন। কিন্তু তার মধ্যে সর্পদংশনের ব্যাপারটা ঐতিহাসিক কোনও গুরুত্ব লাভ করেনি। কিন্তু তারও একটা গুরুত্ব আছে। সে কথায় পরে আসছি।
মহাভারতে দেখা যাবে–রুরু-প্রমদ্বরার কাহিনীর শেষে নৈমিষারণ্যের কুলপতি শৌনক এবার সোজাসুজি রাজা জনমেজয়ের সর্প-যজ্ঞের কাহিনী শুনতে চাইলেন। কিন্তু তার আগে ভৃগুবংশের কাহিনী শুনতে চেয়ে শৌনক যে শুধু সৌতি উগ্রশ্রবার বাচন-ক্ষমতা যাচাই করে নিলেন–তাই শুধু নয়, এর পিছনে অন্যতর এক উদ্দেশ্যও ছিল। জনমেজয়ের পিতা পরীক্ষিতের সর্পদংশনে মৃত্যু হয়েছে–এই কথার প্রসঙ্গেই তিনি ভৃগুবংশের কথা শুনতে চেয়েছেন এবং তার কারণ ভৃগুবংশের অধস্তনদের মধ্যেও এই সর্পদংশনের ঝামেলা গেছে। সর্পদ্রষ্টা প্রিয়া পত্নীকে নিজের অর্ধেক আয়ু দিয়ে ফিরে পাবার পরেও রুরুর ক্রোধ শান্ত হয়নি। তিনি যেখানেই সাপ দেখতেন, মেরে ফেলতেন। তার এই সর্পহত্যার আক্রোশ অবশেষে এক মুনির প্রযত্নে শান্ত হয়। জনমেজয়ের আক্রোশও শান্ত হয় আস্তীক-মুনির প্রযত্নে। ঘটনার এই সমতার জন্যই শৌনক ভৃগুবংশের পুরাতন আক্রোশ এবং দুঃখকে জনমেজয় রাজার সঙ্গে একাত্মতায় স্মরণ করেছেন।
