মহাভারতের এই কল্পকাহিনীর মধ্যে গভীর এক বাস্তব লুকিয়ে আছে। আমরা গভীরভাবে বিশ্বাস করি–উত্তরভারতের কোনও আর্যা রমণীর পাণিগ্রহণে আগ্রহ দেখাননি মহারাজ উপরিচর বসু। বরং তার রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা এতটাই প্রখর যে, তিনি যে রাজ্যে ‘উপরিচর’ হয়ে জুড়ে বসেছিলেন, যে রাজ্যে আপন অধিকার কায়েম করেছিলেন, তিনি সে রাজ্যেরই নদী-পর্বতের গন্ধমাখা এক রমণীকে বিবাহ করেছিলেন। হয়তো চেদিরাজ্যের পুরাতন আবাসিনী সেই রমণীর নাম গিরিকা।
ভূগোলের সামান্য জ্ঞান থাকলেই বোঝা যায়–শ্রীময়ী শুক্তিমতী, যাঁকে আধুনিকেরা কেন বলে ডাকেন, সেই নদীটি বেরিয়েছে কোলাহল পর্বত থেকে। কোলাহল পর্বত এখনকার বুন্দেলখণ্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত বন্দেইর পর্বত বলে চিহ্নিত হয়েছে। শুক্তিমতীর উৎসভূমি এই পর্বত। বসুরাজের মহিমা বর্ধন করার জন্যই কোলাহল পর্বতের শিলা-বাহুর আলিঙ্গন থেকে অবরুদ্ধা শুক্তিমতীর ধারামুক্তির কল্পনা। এই কল্পনার অবসান ঘটে কোলাহল-শুক্তিমতীর ভূমিকন্যা গিরিকার সঙ্গে চৈদ্য উপরিচর বসুরাজার মিলনের পর। লক্ষণীয় বিষয় হল, পৌরাণিক তালিকায় অপ্সরাসুন্দরীদের অনেক নামের মধ্যে আমরা গিরিকার নামও পেয়েছি। মহাভারতে পদাবন্ধে এও দেখেছি যে, মহারাজ বসু যখন বিমানে চড়ে ঘুরে বেড়াতেন, তখন গন্ধর্ব-অপ্সরারা অনেকেই তাকে ঘিরে থাকতেন। কাজেই শুক্তিমতীর নদীর তীরবাসিনী কোনও দেশজা রমণীকে দেখেই মহারাজ হয়তো মুগ্ধ হয়েছিলেন। হয়ত তার পিতৃনাম-মাতৃনাম কোনও পরিশীলিত ব্যক্তিত্বের মর্যাদা বহন করে না। হয়তো বা এই রমণী কোনও স্বেচ্ছাবিহারিণী নদীর মতোই উচ্ছল। কিন্তু তবু বসু চৈদ্যের মনে সে দোলা দিয়েছিল; দেশজা সাধারণী গিরিকা তাই রাজরানী হলেন চেদিরাজ্যে।
উপরিচর বসুর কথা আবারও আসবে পরে। অন্য প্রসঙ্গে। তার আগেই জানাতে হবে যে, এই গিরিকার গর্ভে বসুরাজের পাঁচটি মহাবলশালী পুত্র হয়। তাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ হলেন বৃহদ্রথ। দ্বিতীয় পুত্র প্রত্যগ্রহ, তৃতীয় কুশাম্ব, চতুর্থ যদু এবং পঞ্চম মাবেল্ল। মহারাজ বসু এই পঞ্চ পুত্রের জন্ম দিয়েই বসে থাকেননি, তিনি পুত্রদের ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তা করেছিলেন যথেষ্ট। হয়তো তার মনে ছিল তার প্রপিতামহ কুরুপুত্র সুধকে পিতৃরাজ্যের অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছিল। মনে মনে তিনি এও জানতেন যে, তার মৃত্যুর পর তার চেদিরাজ্যটি নিয়ে ভাই-ভাই বিবাদ বাধতে পারে। অথবা এক পুত্র পৈতৃক রাজ্য পেলে অন্যের মন খারাপ হয়ে যেতে পারে। ফলত নিজের জীবৎকালেই তিনি রাজ্যবিস্তারে মন দিয়েছিলেন। চেদিরাজ্যের ভূমিলগ্ন অন্যান্য অনেক রাজ্যই তিনি আপন বাহুবলে অধিকার করে নিয়েছিলেন। এগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল মগধ।
পূর্বভারতের মগধরাজ্যের তখন সেরকম কোনও আভিজাত্য ছিল না। উত্তরভারতের আর্যায়ণের পরেও মগধের দিকে আর্যরা তেমন মিন্ধ চোখে তাকিয়ে দেখেননি কোনওদিন। সেকালের দিনে যে পাঁচটি জায়গায় এলে আর্যদের প্রায়শ্চিত্ত করতে হত, তারমধ্যে চারটি দেশই পূর্বভারতে অবস্থিত। অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ এবং মগধ–এইসব রাজ্যের মৃত্তিকার মর্যাদা ছিল অত্যন্ত লঘু। অন্তত উত্তরভারতের তুলনায় তাই। মহারাজ উপারচর বসু এই মগধ রাজ্য জয় করে সেখানে তার জ্যেষ্ঠপুত্র বৃহদ্রথকে বসিয়ে দিলেন এবং এই বৃহদ্রথের নামেই মগধে বাহদ্রথ বংশের সূচনা হল। বসুরাজের দ্বিতীয় পুত্র প্রত্যগ্রহ পৈতৃক রাজ্যের অধিকার পেলেন। চেদিদেশেই তৃতীয় পুত্র কুশাম্ব নিজের নামেই কৌশাখী নগরী স্থাপন করলেন। রাজপুত্র কুশাম্বকে লোকে মণিবাহন বলেও ডাকত। চতুর্থপুত্র যদু রাজ্য পেলেন করূষ দেশে, যার আধুনিক নাম বাঘেলাখণ্ড। আর সর্বশেষ মাবে–অথবা বিভিন্ন পুরাণ অনুসারে এই পঞ্চম পুত্রটির নাম মাথৈল্য, এমনকি মারুতও হতে পারে–তিনি রাজত্ব পেলেন মৎস্যদেশে, যা এখনকার রাজস্থানের ভরতপুর-জয়পুর-আলোয়ার অঞ্চল। এই পঞ্চম পুত্রটিকে নিয়েও পরে কথা আসবে।
চৈদ্য উপরিচর বসু আপন বাহুবলে পাঁচ রাজ্য জয় করে তার পাঁচ পুত্রকে সেই সব রাজ্যের সিংহাসনে বসিয়েছিলেন–নানারাজ্যেষু চ সুতান্ স সম্রাড়ভ্যষেচয়ৎ। আগেই বলেছি–এই সব রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল মগধ, যেখানে রাজা হয়েছিলেন বাসব-জ্যেষ্ঠ বৃহদ্রথ। উপরিচর বসু স্বয়ং এই মগধদেশ জয় করেছিলেন বলেই হয়তো এই দেশের আরেক নাম বসুমতী। খোদ বাশ্মীকি রামায়ণেও মগধকে বসুমতী বলেই চিহ্নিত করা হয়েছে। আসলে মগধের নাম আগে মগধও ছিল না, বসুমতীও ছিল না। এই দেশের নাম আগে ছিল কীট-দেশ। ঋগবেদে কীটদেশের এক জননেতার নাম পাচ্ছি বটে, কিন্তু নিরুক্তকার যাস্কের মত বৃদ্ধ বৈদিক লিখেছেন কী-দেশ হল অনার্যদের বাসস্থান ককটা নাম দেশো’নার্যনিবাস। এদেশে গোমাতার মর্যাদা নেই, এখানকার লোকেরা ধর্মাচার মানে না-নাশিরং দুহেন তপত্তি ধর্ম-ঝগবেদের এই পংক্তি উল্লেখ করে মহামতি যাস্ক কীটদেশের নেতাটির নামও বলে দিয়েছেন। সেই নেতার নাম প্রমগন্দ। যাস্কের মতে মগন্দ মানে কুসীদজীবী, মহাজন। আর প্রমগন্দ মানে কুসীদী-কুলীন অপবিত্র ব্যক্তিটি। ভাষাতাত্ত্বিকরা কী বলবেন জানি না, তবে বেদে উল্লিখিত মগন্দ শব্দটা থেকেই মগধ শব্দটা আসেনি তো?
