দেবরাজ নাকি তার বন্ধুত্বের স্মৃতি হিসেবে বসুরাজকে একটি দিব্য বিমান দিয়েছিলেন। এই বিমানে চড়ে রাজ্যের ওপর দিয়ে ঘুরে বেড়াতেন বলেই তিনি উপরিচর বসু-চরিষ্যসি উপরিস্থাে দেবো বিগ্রহবানিব। নতুন রাজ্যের অধিপতিকে বরণ করে দোজ বসু-মহাশয়ের গলায় পদ্মফুলের জয়মাল্য পরিয়ে দিয়েছিলেন। দেবরাজের আন্তরিক ইচ্ছায় সুরম্য জনস্থান চেদিরাজ্যের ভার নিলেন বসুরাজ-সম্পূজিতো মেঘবতা বসুশ্চেদীশ্বরো নৃপঃ।
মহাভারতের এই বর্ণনায় বসুরাজের সঙ্গে ইন্দ্রের বন্ধুত্ব, তার দেওয়া দিব্য বিমান এবং অম্লান পঙ্কজের মালাখানির কথা কোথা থেকে এসেছে তা বুঝতে আমাদের সময় লাগে না। আসল কথা–খোদ ঋগবেদের দানস্তুতির মধ্যে আমরা জনৈক ‘কশু চৈদ্যে’র নাম পাই। তার প্রশংসাও শুনতে পাই ভূরি ভূরি। চেদির রাজা এই কশু চৈদ্য’ই মহাভারতীয় নামে চৈদ্য বসু হয়েছেন বলে ঐতিহাসিকদের ধারণা, অন্তত র্যাপসন এই মতই পোষণ করেন। আমরা এই নামের বিপর্যয়ের কথাটা যথেষ্টই বুঝি। কিন্তু সবচেয়ে বড় যেটা বোঝার ব্যাপার, সেটা হল খোদ ঋগবেদের মধ্যে কশু চৈদ্যের এত প্রশংসা আছে বলেই মহাভারতে বসু চৈদ্যের সঙ্গে বৈদিক দেবতা ইন্দ্রের এত বন্ধুত্ব, এত দানাদানের কথা কষ্মিত হয়েছে।
তবে বিমানে চড়ে বসুরাজ যতই ‘উপরিচর’ হোন, আমাদের গভীর বিশ্বাস–বসু মহাশয় ভাগ্যন্বেষণে এসে এই মনোরম রাজ্যটির ওপর অতর্কিতে অর্থাৎ যেন উপর থেকে হানা দিয়েছিলেন। সেই জন্য চেদি-দেশের এই বিখ্যাত রাজার নাম হয়ে গেল চৈদ্য উপরিচর বসু। চেদি দেশের রাজা বলে এই যে ‘চৈদ্য’ নামের বিশেষণটি পেলেন বসু-মহাশয়, তারপর থেকে এই দেশের রাজারা নিজেদের ‘চৈদ্য’ বলতেই বেশি পছন্দ করতেন। পরবর্তী সময়ে মহাভারতখ্যাত শিশুপালকে অন্তত একশবার চৈদ্য নামে ডাকা হবে। আরও কিছুদিন পর আমরা খারবেল নামে ইতিহাসপ্রসিদ্ধ:যে কলিঙ্গ-রাজার নাম পাব, তার বহুপূর্ব পিতামহরা বোধহয় এই দেশের লোক ছিলেন। খারবেল যে বংশে জন্মেছিলেন তার নাম চেত-বংশ। রমাপ্রসাদ চন্দ দেখিয়েছেন-’চেত’ রাজপুত্রেরা আসলে চেদিদেশের লোক। বৌদ্ধ উপাখ্যান বেসন্তর জাতকে সেইরকমই বলা আছে।
আমরা বলি–এত কল্পনার দরকারই নেই কোনও। বৌদ্ধগ্রন্থ মিলিন্দপহোতে (রাজা মিনান্দারের প্রশ্ন) এক ‘চেত’ রাজার নাম করা হয়েছে, তাঁর নাম ‘সুর’ অথবা ‘শূর পরিচর’। এবার ভাবুন, এই শূর পরিচর নামটির সঙ্গে কোনওভাবেই কি আমাদের চৈদ্য রাজার বসু উপরিচরের পার্থক্য নির্ণয় করা যায়? স্টেন কোনো সাহেব আবার সামান্য একটু বাগড়া দিয়ে বলেছেন–কলিঙ্গরাজ বারবেল চেত-বংশে নয়, তিনি চেতি-বংশে জন্মেছিলেন, সাহেব খেয়াল করলেন না ‘চেতি’ বলার ফলে চৈদ্য-রাজাদের কথা আরও বেশি করে প্রমাণিত হয়। কেন না, বৌদ্ধ জাতকমালায় একটি জাতকের গল্পের নামই হল চেতিয় জাতক এবং এই। জাতকে এক চৈদ্য রাজার বংশকাহিনী উদ্ধার করা হয়েছে–যে রাজার নাম উপচর।
দেখা যাচ্ছে-উপরিচর বসু-মহাশয়কে কোনও বৌদ্ধগ্রন্থ বলছে–পরিচর, কোনটি বলছে উপচর। তাতে প্রমাণ হয়ে যায় কুরুবংশের প্রথম গৌরব কুরুর জ্যেষ্ঠপুত্র সুধম্বা হস্তিনাপুরে রাজ্য না পেলেও তার প্রপৌত্র উপরিচর বসু চেদিরাজ্যে নিজের অধিকার কায়েম করে কতটা হই-হই ফেলে দিয়েছিলেন সেকালে। আমাদের ক্ষুদ্র দৃষ্টিতে আর্যস্থান রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ। আর পাঞ্জাব ছেড়ে পূর্বভারত এবং দক্ষিণে কুরুবংশের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন এই উপরিচয় বসু। দুর্ভাগ্যের বিষয়, হস্তিনাপুরের মহারাজই কুরুবংশের ধুরন্ধর পুরুষ হিসেবে পরিচিত হয়ে রইলেন, আর উপরিচর বসু নিজ পরাক্রমে রাজ্য দখল করে নিজের নামেই বিখ্যাত হলেন। কথায় বলে–স্বনামা পুরুষো ধন্যঃ পিতৃনামা তু মধ্যমঃ। অতএব উপরিচর বসু সেই স্বনামধন্য ব্যক্তি, যার কথা উচ্চারণ করলে আর তার পূর্বপুরুষ কুরুর নাম স্মরণ করতে হয় না। ঋগবেদ থেকে আরম্ভ করে খারবেলের বংশ পর্যন্ত তিনি একভাবে উপস্থিত আছেন–স্বমহিমায় স্বপরাক্রমে। কুরুর নাম বাদ দিয়ে উপরিচর বসুর নামেই তাঁর পরবর্তী বংশধারা চলেছে, যার নাম বাসব (বসু+ঞ্চ) বংশ–বাসবাঃ পঞ্চ রাজানঃ পৃথবংশাশ্চ শাশ্বতাঃ।
নতুন দেশ জয় করে উপরিচর বসু চেদিরাজ্যের রাজা হয়ে বসলেন, কিন্তু এখনও তার কোনও রানী নেই। তিনি আর্যাবর্ত ব্রহ্মাবর্তের রাজা নন, কাজেই কাশী-কোশল বা অযোধ্যা-শূরসেন থেকে কোনও পতিংবরা কন্যা তাকে বরণ করেননি। আর ওই সব দেশের জামাতা হিসেবে বৃত হওয়ার জন্য কোনও চেষ্টাও বোধহয় তার ছিল না। মহাভারতে বসুরাজের বিবাহ নিয়ে একটি কল্পকাহিনী আছে। বলা হয়েছে–চেদিরাজ্যের কোল-ঘেঁষা শুক্তিমতী নদীকে সেই রাজ্যের এক পর্বত আটকে রেখেছিল আপন করে–পুরোপবাহিনীং তস্য নদীং শুক্তিমতীং গিরিঃ অরৌৎসীৎ চেতনাযুক্ত…. পর্বতটির নাম কোলাহল। বীরবাহিনী শুক্তিমতী নদীকে দেখে পর্বতপুরুষ কোলাহল মুগ্ধ হয়ে নির্জনে উপভোগ করতে চেয়েছিলেন–কামাৎ কোলাহলঃ কিল।
মহারাজ উপরিচর বসুর কাছে এই ধর্ষণের সংবাদ অচিরেই পৌঁছল। তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে পদাঘাত করলেন পর্বতের দেহে। পদাঘাতের ফলে পর্বত-পুরুষ শুক্তিমতী নদীকে ছেড়ে দিল বটে, কিন্তু ততক্ষণে যা হবার হয়ে গেছে। শুক্তিমতীর কোলে ততক্ষণে যমজ পুত্র-কন্যার জন্ম হয়েছে এবং অলৌকিকভাবে তারা বড়ও হয়ে গেছে। বলাকারী পর্বতের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ায় শুক্তিমতী এতই খুশি হয়েছিলেন যে, তিনি বসু মহারাজকে বললেন–এই কন্যাটি তোমার পত্নী হবে, আর আমার এই পুত্র তোমার সেনাপতির কাজ করবে। বসুরাজ শুক্তিমতীর অনুনয় মেনে নিলেন।’শুক্তিমতীর পুত্রটিকে সেনাপতিত্বে নিযুক্ত করে, কন্যাটিকে তিনি বিবাহ করলেন। কন্যার নাম গিরিকা।
