গঙ্গা এবার শেষ অনুরোধ করলেন পুরাতন প্রণয়ীর কাছে। বললেন–অস্ত্রবিদ্যা এবং রাজধর্ম সব যাকে সযত্নে শেখানো হয়েছে, তোমার সেই বীর পুত্রকে তুমি এবার গ্রহণ করো আমি তাকে তোমার হাতে সমর্পণ করছি, তুমি তাকে রাজধানীতে নিয়ে যাও-ময়া দত্তং নিজং পুত্রং বীরং বীর গৃহং নয়। গঙ্গা আর উত্তরের অপেক্ষা না করে চলে গেলেন। কোন মায়ের না ইচ্ছে থাকে–সর্বগুণসম্পন্ন পুত্র রাজ্য লাভ করে সমৃদ্ধ হোক। গঙ্গাপুত্রকে শান্তনুর হাতে দিয়ে সেই ইচ্ছেই পূরণ করতে চাইলেন।
মহারাজ শান্তনু উপযুক্ত পুত্রের হাত ধরে রাজধানীতে ফিরে এলেন। রাজধানীর মন্ত্রী-অমাত্যেরা কেউ তাকে কোনও অস্বস্তিকর প্রশ্ন করল না। আমাদের ধারণা–বষ্কাল পূর্বে শান্তনু যখন রাজধানী ত্যাগ করে গিয়ে গঙ্গার সঙ্গে বাস করেছিলেন, সেই সময়ের কথা কারও অবিদিত ছিল না। রাজধানীর সকলেই জানতেন– রাজা কী করছেন অথবা কোথায় আছেন। শান্তনুকে তাই রাজধানীতে এসে কোনও জবাবদিহিও করতে হয়নি।
শান্তনুর পুত্রের নাম গঙ্গাই রেখেছিলেন দেবব্রত। আদরের ছেলে, পিতার সঙ্গ পায় না। তাই সকলে তাকে গাঙ্গেয় বলেও ডাকে। মায়ের নামেই তার বেশি পরিচয়। পিতা শান্তনু দীর্ঘদর্শন এই পুত্রটিকে রাজ্যপ্রান্ত গঙ্গার তীরভূমির আবাস থেকে রাজভবনে নিয়ে এসে জ্ঞাতিগুষ্টি, মন্ত্রী-অমাত্য–সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। পুত্রের প্রতি সমস্ত বাৎসল্য প্রকাশ করে শান্তনু নিজেকে পিতা হিসেবে যেমন সফল মনে করলেন, তেমনই আরও একটি কাজ তিনি করে ফেললেন প্রখর বাস্তববোধে। এতকাল এই পুত্র রাজভবনের বাইরে ছিল, এখন যদি পুরু-ভরতবংশের লতায়-পাতায় জন্মানো জ্ঞাতিগুষ্টির মধ্যে তার রাজ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে? তাই খুব তাড়াতাড়ি পৌরব-বংশে আপন পুত্রের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দেবব্রত গাঙ্গেয়কে তিনি যুবরাজ-পদে মনোনীত করলেন সমস্ত পৌরবদের আহ্বান করে-পৌরবে ততঃ পুত্রং রাজ্যার্থ…অভ্যযযচয়ৎ।
গুণবান পুত্রকে পুরু-ভরতবংশের পরম্পরায় স্থাপন করে শানুর আপন কর্তব্য পালন করার সঙ্গে সঙ্গে গাঙ্গেয় দেবব্রতও তার যুবরাজ-পদের সার্থকতা প্রমাণ করলেন আপন গুণে। তার অপূর্ব ব্যবহারে পিতা শান্তনু যেমন নন্দিত হলেন, তেমনই কিছুদিনের মধ্যে দেবব্রতর গুণে রাজ্যের প্রবাসী জনপদবাসীরা তার প্রতি অনুরক্ত হয়ে উঠল-রাষ্ট্রঞ্চ রঞ্জয়ামাস বৃত্তেন ভরতষভ। তখনও শান্তনুর কোনও পত্নী রাজরানী হয়ে সিংহাসনে তার পাশে বসেননি, কিন্তু অসাধারণ মেধাবী পুত্রকে নিয়েই শান্তনুর দিন কাটতে লাগল। অল্পদিন নয়, চার-চারটি বছর এইভাবে কেটে গেল–বর্তয়ামাস বর্ষাণি চত্বৰ্য্যমিতবিক্রমঃ।
.
৫৩.
এর আগে আমরা মহারাজ সংবরণের পুত্র কুরুর নাম করেছি। সেই কুরুরাজ, যার নামে মহাভারতের কুরুক্ষেত্র এবং কুরুজ্জাঙ্গল প্রদেশ। মহারাজ কুরুর চারটি পুত্র সুধম্বা, জহু, পরীক্ষিত এবং অরিমেজয়। এঁদের মধ্যে পরীক্ষিত, যাকে আমরা প্রথম পরীক্ষিত বলতে চাই, তিনিই হস্তিনাপুরে কুরুবংশের প্রধান রাজ-পরম্পরা রক্ষা করছিলেন। দেখা যাচ্ছে, এখানে জ্যেষ্ঠ পুত্র হওয়া সত্ত্বেও কুরুপুত্র সুধম্বা পিতৃরাজ্য পাননি। পেয়েছেন তৃতীয় পুত্র পরীক্ষিত। এটা অবশ্য খুব স্বাভাবিক যে, ক্ষত্রিয়ের রাজবংশে জন্মে জ্যেষ্ঠ সুধবা কনিষ্ঠের রাজ্যে বসে নিজের অঙ্গুলি-চোষণ করছিলেন না। তিনি তার ভাগ্য অন্বেষণ করতে বেরিয়েছিলেন অন্যত্র। এমন হতেই পারে যে, তিনি যুদ্ধ জয় করে কোন রাজ্য অধিকার করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। হতে পারে–তার পুত্র এবং পৌত্রও এই চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন এবং ব্যর্থতা ছিল তাদেরও।
কিন্তু এই কুরুজ্যেষ্ঠ সুধম্বার প্রপৌত্র অর্থাৎ এই বংশের চতুর্থ পুরুষকে দেখছি–তিনি একটি রাজ্যের অধিকার পেয়েছেন। কুরুর জ্যেষ্ঠপুলের ধারায় এই চতুর্থ পুরুষের নাম বসু। কিন্তু একে কেউ বসু বলে ডাকে না। পুরাণে-ইতিহাসে সর্বত্র তার নামের আগে একটি বিশেষণ আছে। সকলে তাকে উপরিচর বসু বলে ডাকে। এমনকি তিনি নতুন যে দেশটি জয় করেছিলেন, সেই চেদি দেশও তার নামের বিশেষণে পরিণত–চৈদ্য উপরিচর বসু।
এখনকার দিনে যে জায়গাটাকে আমরা বুন্দেলখণ্ড বলি, সেকালের দিনে সেইটাই হল চেদি রাজ্য। একপাশ দিয়ে শুক্তিমতী নদী বয়ে যাচ্ছে, অন্যপাশে কালিদাসের মেঘদূত-বিখ্যাত উপলব্যথিতগতি বেত্রবতী। দুই নদীর মাঝখানের অংশটুকুই বোধহয় সেকালের চেদিরাজ্য। ভারি সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ। কুরুবংশের চতুর্থ পুরুষ বসু-রাজা প্রখর বাস্তব-বোধে হস্তিনাপুর বা পাঞ্চালদেশের দিকে হাত বাড়াননি। আপন ভাগ্যান্বেষণের জন্য হস্তিনাপুর ছেড়ে তিনি দক্ষিণ-পূর্ব রাজ্যগুলির দিকে চলে এসেছিলেন। তারপর শুক্তিমতী নদীর ওপর শুক্তির মতো এই অপূর্ব রাজ্যটিই তার পছন্দ হয়ে গেল। তিনি পিতৃ-পিতামহের যুদ্ধ-বাহিনী একত্র করে একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এই রাজ্যের ওপর। এই ঝাঁপিয়ে পড়াটা ছিল এতই আকস্মিক, এতই অতর্কিত যে অনেকটাই ছিল উড়ে এসে জুড়ে বসার মতো। হয়তো এই কারণেই তার নাম-উপরিচর বসু।
মহাভারত অবশ্য অন্য একটা খবর দিয়েছে। মহাভারত বলেছে–দেবরাজ ইন্দ্র ছিলেন বসু-মহাশয়ের বন্ধু মানুষ। প্রধানত তারই পরামর্শেই বসু-রাজ চেদিরাজ্যে নিজের আবাস স্থাপন করেন–ইন্ট্রোপদেশান্ জগ্রাহ রমণীয়ং মহীপতিঃ। দেবরাজ ইন্দ্র বসুকে কাছে ডেকে বলেছিলেন–তুমি আমার বন্ধু মানুষ–সখাভূত মম প্রিয়। আমার ইচ্ছে–পৃথিবীর একটি সুরম্য স্থানে তোমার আবাস হোক। আর রম্য বলতে আছে একমাত্র চেদি-রাজ্য। ধনধান্যে পূর্ণ দেশ। সরস মাটির সব গুণই এতে আছে–ভোগৈৰ্ভূমিগুণৈ-যুতঃ। দেবরাজ বললেন–শস্য আর অর্থের সম্ভাবনায় পূর্ণ এই দেশেই তুমি বসতি স্থাপন করো, আমি তাই চাই–বপূর্ণা চ বসুধা বস চেদি চেদিপ।
